🌸সিরিজ: রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম....
🍁পর্ব: ২.১ (রাসূল ﷺ এর সত্যবাদিতা)
বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ﷺমাত্র মদীনায় হিজরত করে এসেছেন, বদরের যুদ্ধের আগের উত্তপ্ত পরিস্থিতি। মদীনার নেতৃস্থানীয় সাহাবী হযরত সা‘দ ইবনে মুআয রা. উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় গেলেন। মক্কা-মদীনার মাঝে আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল, আসা-যাওয়া ছিল, তাদের মাঝে পরিচয়ও ছিল। সা‘দ ইবনে মুআয রা. যখন মক্কায় যেতেন তখন মক্কার সরদার উমাইয়া ইবনে খালাফের বাড়িতে মেহমান হতেন। উমাইয়া ইবনে খালাফ যখন ব্যবসার উদ্দেশ্যে শামের দিকে যেত, তখন মদীনায় এলে সা‘দ ইবনে মুআয রা.-এর বাড়িতে মেহমান হত। জাহেলী যুগ থেকেই এটা ছিল। তো সা‘দ ইবনে মুআয রা. উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় গিয়েছেন, কা‘বা শরীফ তাওয়াফ করতে হবে। কিন্তু কা‘বা চত্বরে গিয়ে তাওয়াফ করবেন কীভাবে? তাঁরা মদীনার মুসলিম। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুহাজির সাহাবায়ে কেরামকে আশ্রয় দিয়েছেন। মক্কার কাফির নেতাদের চোখে তো এরা বড় অপরাধী। উমাইয়া ইবনে খালাফ বলল, অপেক্ষা করুন, দুপুরবেলায় প্রখর রৌদ্রের কারণে লোকজন কা‘বার চত্বরে থাকে না, নিজ নিজ ঘরে থাকে। ঐ সময় কা‘বা চত্বর ফাঁকা থাকে, তখন আপনি গিয়ে তাওয়াফ করে আসবেন। সা‘দ ইবনে মুআয রা. সেভাবেই দুপুরবেলা তাওয়াফ করতে বের হলেন। গিয়েছেন নিরিবিলি তাওয়াফ করবার জন্য, তাওয়াফ করছেন, এমতাবস্থায় দেখা হয়ে গেল একেবারে আবু জেহেলের সাথে।
আবু জেহেল সা‘দ ইবনে মুআয রা.-কে দেখে বলে উঠল-
কে রে এখানে কা‘বার তাওয়াফ করে?
সা‘দ ইবনে মুআয রা. বললেন-
আমি সা‘দ।
আবু জেহেল বলল, -উত্তেজিত হয়ে- বাহ! কী নিরাপদে কা‘বা শরীফের তাওয়াফ করছ! অথচ তোমরা মদীনার লোকেরা মুহাম্মাদ ﷺ ও তার সঙ্গীদের আশ্রয় দিয়েছ!
এভাবে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে গেল। উমাইয়া ইবনে খালাফ সা‘দ ইবনে মু‘আয রা.-কে থামাতে চেষ্টা করে আর বলে-.
সা‘দ! আবুল হাকামের আওয়াজের উপরে তোমার আওয়াজ উচুঁ করো না। তিনি এই মক্কা উপত্যকার সরদার! একটু আস্তে কথা বল। আস্তে কথা বল।
কয়েকবার যখন উমাইয়া হযরত সা‘দ রা.-কে থামাবার চেষ্টা করল, সা‘দ রা. বিরক্ত হলেন। বিরক্ত হয়ে উমাইয়া ইবনে খালাফকে লক্ষ করে বললেন_
এখন আবুল হাকামের পক্ষ নিচ্ছ? কুফরের এই নেতার পক্ষে ওকালতি করছ? এই পথে তোমার পরিণাম কী হবে সেটা চিন্তা করেছ? আমি তো মুহাম্মাদ ﷺ কাছে শুনেছি যে, তিনি তোমাকে হত্যা করবেন।
এই কথা শুনে উমাইয়া ইবনে খালাফ আতঙ্কিত হয়ে বলে উঠল-
আমাকে?
সা‘দ ইবনে মুআয রা. বললেন, হাঁ। তখন উমাইয়া ইবনে খালাফের আতঙ্কিত বাক্য-
ওয়াল্লাহ! মুহাম্মাদ যখন কিছু বলেন তা মিথ্যা হয় না।’
উমাইয়া অস্থির হয়ে বাড়ি ফিরল। বাড়ি এসে বউকে বলল, শুনেছ, আমার ইয়াসরিবী ভাই কী বলেছে? বউ বলল, কী বলেছে? উমাইয়া বলল, সে নাকি মুহাম্মাদকে ﷺ শুনেছে যে, তিনি আমাকে হত্যা করবেন। একথা শুনে স্ত্রীও বলে উঠল-
আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ কখনো মিথ্যা বলেন না। (দ্র. সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৬৩২)
আপনারা যদি বদরের যুদ্ধের ঘটনা পড়ে থাকেন তাহলে লক্ষ করেছেন যে, বদরের যুদ্ধের সময় মক্কার সর্দারেরা যখন মুসলমানদের শেষ করার জন্য প্রচণ্ড দর্পের সাথে মক্কা থেকে বের হচ্ছিল তখন উমাইয়া ইবনে খালাফের স্ত্রী স্বামীকে বলল, তুমি কি ভুলে গেছ, তোমার ইয়াসরিবী ভাই কী বলেছিল? স্ত্রীর এই কথা উমাইয়ার মনে এতই প্রভাব বিস্তার করল যে, সে নানা ফন্দি-ফিকির করতে লাগল, কোনোভাবে যদি বদরের ময়দানে না যাওয়া যায়, কোনোভাবে যদি এড়িয়ে যাওয়া যায়। অন্যরা বের হয়েছে, সে এই আসছি, এই বের হচ্ছি ইত্যাদি বলে ঘরে বসে আছে, সবাই যখন বের হয়ে গিয়েছে তখন আবু জেহেল দেখে, উমাইয়া ঘরে বসে আছে। সে এসে তাকে লজ্জা দিল, উত্তেজিত করল। নানা কথা বলার পরে উমাইয়া উত্তেজিত হয়ে মক্কা থেকে বের হল। কিন্তু বের হলেও সঙ্গে দুইটা সওয়ারি- একটাতে সে সওয়ার, আরেকটা সঙ্গে খালি। যেখানেই কাফেলা যাত্রাবিরতি করে, উমাইয়া পেছনে পেছনে থাকে এবং দ্বিতীয় সওয়ারিটা প্রস্তুত রাখে। কোনো বিপদ হলেই, যেন তাজাদম সওয়ারিতে লাফিয়ে চড়ে সোজা মক্কায় ফিরতে পারে।
কিন্তু মানুষ যতই ব্যবস্থা নিক, আল্লাহর ফয়সালা রদ করতে পারে না। দেখুন উমাইয়াও ঘরে বসে থাকতে পারেনি। সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়েছে, মৃত্যুর আশঙ্কা করেছে, মৃত্যু থেকে পলায়নের ব্যবস্থাও নিয়েছে, কিন্তু এরপরও পায়ে পায়ে মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে গেছে।
বদরের ময়দানে অধিকাংশ কাফির নেতার ধ্বংস হওয়াই ছিল আল্লাহ ফয়সালা। কাজেই ধ্বংসের জন্য তাদের এখানে আসতেই হবে। আল্লাহ পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়েছেন, ওরাও প্ররোচিত হয়ে নিজেদের ধ্বংসের দিকেই ছুটে গিয়েছে। চিন্তা করলে আল্লাহর নাফরমানদের জন্য কত বড় শিক্ষা আছে এখানে!
রাসূল ﷺ সত্যবাদিতার ব্যাপারে, তাঁর যবানে মোবারক থেকে বের হওয়া প্রতিটি বাক্যের ব্যাপারে তাঁর দুশমনেরও বিশ্বাস কীরূপ ছিল! এই তাঁর সীরাত; তাঁর জীবনটি এভাবেই কেটেছে; তাঁর কথা ও কাজ এমন ছিল যে, তাঁর জাতি তাঁর সত্যবাদিতার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিঃসংশয় ছিল। মুসলিম উম্মাহ কর্তব্য, এই বৈশিষ্ট্য অর্জনের চেষ্টা করা।