জাহিলিয়্যাত ও আধুনিক জাহিলিয়্যাত
কোনো বিষয় জাহিলিয়্যাত হিসেবে চিহ্নিত হলেও তার বিষয়ে আমাদের মৌলিক কয়েকটি মূলনীতি মনে রাখতে হবে।
প্রথমত, যেকোনো জাহিলিয়্যাতেরই কোনো বিশেষত্ব, বিশেষ গুণ বা উঁচু অবদান থাকা আশ্চর্যের ব্যাপার নয়। সম্ভবত কোনো জাহিলিয়্যাতই এর থেকে খালি নয়। কিন্তু তা এটা প্রমাণ করে না যে, সে জাহিলিয়্যাত সুস্থ জীবনযাপন করেছে, অথবা সে জাহিলিয়্যাত অনুসরণযোগ্য বা তার থেকে কিছু গ্রহণীয় রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, জাহিলিয়্যাতের কোনো বিশেষত্ব, উত্তম গুণ ও উন্নত অবদান থাকলেই তা জাহিলিয়্যাতের কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়ে যায় না। কেননা, তার মধ্যে এমন কিছু বিকৃতি ও ভ্রষ্টতা রয়েছে যা এসব বিশেষত্ব, গুণ ও উন্নত অবদানকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট ও ধ্বংস করে দেবে, তাতে সন্দেহ নেই।
তৃতীয়ত, এসব বিকৃতি ও ভ্রষ্টতার প্রধান কারণই হচ্ছে, জাহিলিয়্যাতগুলো সর্বদা সর্ববিষয়ে নিজ প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনা কিংবা সংকীর্ণ মানবীয় জ্ঞানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। কেননা, তা আল্লাহর হেদায়েত জানে না, চেনেও না। অথবা হয়তো চেনে ও জানে; কিন্তু তা ত্যাগ করে অন্য কিছু গ্রহণ করে।
জাহিলিয়্যাতের ব্যাপারে এই তিনটি মূলনীতি সামনে রেখে আমরা জাহিলিয়্যাতের এমন কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যের আলোচনা করব, যা ইতিহাসের প্রতিটি জাহিলিয়্যাতের মাঝে পাওয়া যায়। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি জাহিলিয়্যাতের নিজস্ব স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা তাকে অন্য জাহিলিয়্যাত থেকে আলাদা করে। কিন্তু কিছু বৈশিষ্ট্য এমন আছে, যা সব জাহিলিয়্যাতের মাঝেই পাওয়া যায়।
প্রথম বৈশিষ্ট্য: সকল জাহিলিয়্যাতের মাঝে একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, আল্লাহর ওপর সত্যিকারভাবে ঈমান না আনা। হয়তো আল্লাহর সাথে কাউকে শিরক করবে, অথবা আল্লাহকে অস্বীকার করবে, অথবা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে স্বীকার তো করবে, কিন্তু দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়ে আল্লাহর কোনো হস্তক্ষেপ নেই এমন বিশ্বাস করবে। মোটকথা, আল্লাহর তাওহীদ ও একত্ববাদের মৌলিকত্বের ওপর সঠিকভাবে ঈমান না-থাকাই হলো জাহিলিয়্যাতের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: নিজস্ব চিন্তাভাবনা, ইচ্ছা ও কামনা-বাসনার অনুসরণ করা।
এটা প্রথম বৈশিষ্ট্যের একটি অনিবার্য রূপ। হয়তো আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে হবে, যা থেকে আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পিত হওয়া এবং তারই নাজিলকৃত বিধান পালনের আবশ্যকতা সৃষ্টি হয়। অথবা জাহিলিয়্যাতকে মেনে নিতে হবে, যা মানুষের প্রবৃত্তি-ইচ্ছার অনুসরণকে আবশ্যক করে। কেননা, আল্লাহর বিধান ভিন্ন সকল বিধানই নিছক কামনা-বাসনা মাত্র।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য: সকল জাহিলিয়্যাতের মাঝে একটি বৈশিষ্ট্য হলো তাতে আল্লাহদ্রোহী তাগুত গোষ্ঠীর উপস্থিতি। তারা সর্বক্ষণ ও সর্বাত্মক চেষ্টায় থাকে, যাতে মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত থেকে এবং এক আল্লাহর দেওয়া শরিয়ত পালন থেকে বিরত রাখতে পারে; আর মানুষকে তাগুতের দাসত্ব এবং তাদের শরিয়ত পালনের দিকে ধাবিত করতে পারে। (যা তারা নিজেদের প্রবৃত্তির ভিত্তিতে রচনা করেছে)
চতুর্থ বৈশিষ্ট্য: প্রবৃত্তির চাহিদার স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া। প্রবৃত্তির কিছু চাহিদা মানুষের খুবই প্রিয় জিনিস বা তার জীবনের অংশ। এটাকে আল্লাহ মানুষের জন্য বৈধ করেছেন। কিন্তু যখনই সে চাহিদাগুলো তার বেঁধে দেওয়া সীমা ও যুক্তিসংগত পরিমাণ অতিক্রম করে, তখন তা মানুষকে পশুতে পরিণত করে এবং আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। তাই দেখা যায়, প্রতিটি জাহিলিয়্যাতের মাঝে একটি চিরাচরিত রূপ হলো, প্রবৃত্তির চাহিদার স্রোতকে জীবনের মূলধারার মাঝে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে দেওয়া। এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, দুনিয়ার কোনো জাহিলিয়্যাতই সব ধরনের অশ্লীলতা ও যিনা-ব্যভিচারকে পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেনি। তারা অশ্লীলতার বিভিন্ন রূপকে মানুষের সমাজে বাকি রেখেছে এবং সমাজের একটি অংশে পরিণত করেছে।
উপর্যুক্ত নিদর্শনগুলো থেকে ইতিহাসের কোনো জাহিলিয়্যাতই মুক্ত নয়। কিন্তু পশ্চিমা সভ্যতা পূর্বোক্ত সে জাহিলিয়্যাতকে আধুনিক ছাঁচে তৈরি করে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছে, যেগুলো স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করতে পারলে আধুনিক এই ঈমান-বিধ্বংসী জাহিলিয়্যাত বোঝা আমাদের জন্য সহজ হবে।
সে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
১. চরম বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ, যা মানুষকে আল্লাহর হেদায়েত থেকে দূরে সরানো এবং আল্লাহর সৃষ্টিকুলকে চরম দুঃখ-কষ্টে নিমজ্জিত করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
২. বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, উদ্ভাবন ও উন্নতি উৎকর্ষের নেশায় মত্ত হয়ে মানুষকে আল্লাহর মোকাবেলায় দাঁড় করানো; যেন মানুষ এই কথা মনে করে যে, বর্তমানের এই চরম উন্নত যুগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন মানুষের নেই, অথবা
মানুষ নিজেই নিজের ইলাহ হয়ে গেছে।
৩. বিভিন্ন মডার্ন বৈজ্ঞানিক মতবাদ ও মতাদর্শসমূহ, যেগুলো সমাজ, অর্থনীতি ও মনস্তত্বসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে মানবজীবনকে চরম ভ্রষ্ট, সঠিক পথবিচ্যুত ও বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।
৪. বিবর্তনবাদী দর্শন।
৫. নারীস্বাধীনতা ও নারীবাদ।