মুহতারাম আবদুল মালেক হাফিযাহুল্লাহ আজ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন। অল্প সময়ে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে হযরত অত্যন্ত জামে-মানে ইলমী আলোচনা করেছেন আজ। হযরতের আলোচনা থেকে আজ উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ দশটি নুকতা। খুব সংক্ষেপে নিচে উল্লেখ করছি:
১. প্রথমেই আজকে মুসাফাহার বিষয়ে আলোচনা করেন। মুসাফাহা করার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়া। এটা অবশ্যই মুহাব্বতের কারণে হয়ে থাকে। হযরত বলেন, আমি আপনাদের মুহাব্বতকে মূল্যায়ন করি; কিন্তু এভাবে মুহাব্বত প্রকাশ করাটা সুন্নত মোতাবেক নয়; বরং এটা সুন্নত পরিপন্থী, এটা মহব্বতের সঠিক প্রকাশ নয়।
২. হযরত আজকের আলোচনার প্রাসঙ্গিক আয়াত তেলাওয়াত করেন—
يا ايها الذين امنوا اتقوا الله وقولوا قولا سديدا يصلح لكم اعمالكم ويغفر لكم ذنوبكم ومن يطع الله ورسوله فقد فاز فوزا عظيما
তরজমা: হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বলো; তিনি তোমাদের আমলগুলোকে সংশোধন করবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করবেন। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, সে প্রকৃত সাফল্য অর্জন করবে। [সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৭০-৭১]
হযরত বলেন, মানুষের সবচেয়ে বেশি গুনাহ হয় জবান দ্বারা। জবান ঠিক রাখার চেষ্টা করলে আল্লাহ তোমাদের অন্যান্য আমল ঠিক করে দেবেন। তোমরা আল্লাহর হুকুমে শরীয়তের অনুসরণে জবান নিয়ন্ত্রণ রাখো। আয়াতটি পুনরায় তিলাওয়াত করে হযরত বলেন, এই আয়াতে তাকওয়ার নির্দেশ এবং সঠিক কথা বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৩. সঠিক কথার সংজ্ঞা কী? সঠিক কথা কাকে বলে? যে কথায় মিথ্যার মিশ্রণ নেই এবং ভুলের মিশ্রণ নেই, সেটাই সঠিক কথা। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হযরত হাদীসের বাণী পেশ করেন—
من كان يؤمن بالله واليوم الاخر فليقل خيرا او ليصمت
তরজমা: যার আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান আছে, সে কল্যাণকর কথা বলুক অথবা চুপ থাকুক। (বুখারী ও মুসলিম)
৪. হযরত পাঠ করেন—
ولا تقف ما ليس لك به علم
"যে বিষয়ে তোমার ইলম নেই, তার পেছনে চলো না।" [সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩৬]
হযরত বলেন, যে বিষয়ে তোমার ইলম নেই, সে বিষয়ের পিছে পড়ো না। যে বিষয়ে তুমি বিশেষজ্ঞ, সে বিষয়েই কথা বলো; যেটা তোমার সাবজেক্ট নয়, সে বিষয়ে কথা বলতে যেও না। এরপর হযরত বর্তমান সময়ের সাংবাদিকদের অপপ্রচারের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। হযরত বলেন, সূরা আহযাবের আয়াতের আলোকে বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়াগুলোকে বিচার করুন। সঠিকভাবে জবানের ব্যবহার করলে অনেক সওয়াব হবে। জবানের সঠিক ব্যবহার আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে আর বেঠিক ব্যবহার আমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে।
৫. আপনি নিজে বলেন বা শোনান— দুইটার দায় আপনাকে বহন করতে হবে। এই মর্মে দলিল হিসেবে হযরত হাদিস পেশ করেন—
كفى بالمرء كذبا ان يحدث بكل ما سمع
"এক ব্যক্তির জন্য মিথ্যা বলা যথেষ্ট যে সে যা শোনে, তা-ই বলে বেড়ায়।" [সহিহ মুসলিম]
من حدث عني حديثا يرى انه كذب فهو احد الكاذبين
তরজমা: "যে আমার থেকে এমন কোনো হাদীস বর্ণনা করে, যা সে মিথ্যা মনে করে, সে অবশ্যই মিথ্যাবাদীদের একজন।" [সহীহ মুসলিম]
৬. বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়াতে মহিলারা সব দেখতে পারবে, পুরুষরা সব দেখতে পারবে— বিষয়টা কি এমন? এই মর্মে জবাব হিসেবে হযরত এই আয়াত পেশ করেন—
ان السمع والبصر والفؤاد كل اولئك كان عنه مسؤولا
তরজমা: "নিশ্চয়ই কান, চোখ, এবং অন্তর— এদের প্রত্যেকটির ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে।" [সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩৬]
৭. তথ্য শেয়ার: তথ্য শেয়ারের ক্ষেত্রে অনেক সতর্কতার পরিচয় দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমার পরিভাষা সিস্টেম যতই পরিবর্তন হোক, বিধান সব এক জায়গায়।
كفى بالمرء كذبا ان يحدث بكل ما سمع
"এক ব্যক্তির জন্য মিথ্যা বলা যথেষ্ট যে সে যা শোনে, তা-ই বলে বেড়ায়।" [সহিহ মুসলিম] সুতরাং যেকোনো তথ্য শেয়ারের ব্যাপারে শরীয়ত বলে তোমাকে আগে তথ্যটার ব্যাপারে বিচার করতে হবে— তথ্যটা সঠিক কিনা।
৮. সব তথ্য সঠিক হলেও শেয়ার করা উচিত নয়। একটা বাস্তবসম্মত কথা সঠিক হলেই সবাইকে জানাতে হবে— শরীয়ত এমনটা বলে না; বরং দেখতে হবে এতে সাধারণের ফায়দা আছে কিনা।
৯. যার জবান থেকে এবং হাত থেকে অপর মুসলিম ভাই নিরাপদ থাকে, সেই প্রকৃত মুসলিম। হাদীসে এরশাদ হয়েছে—
المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده
"প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি যার জবান ও হাত থেকে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে।" [বুখারী ও মুসলিম] হাত দ্বারা মানুষকে কষ্ট দেওয়ার কয়েকটি প্রকার তুলে ধরেন যেমন: জুমার দিন পরে এসে সামনের কাতারে যাওয়ার জন্য মানুষকে কষ্ট দেওয়া, কলম দ্বারা অন্যায় কিছু লিখে কষ্ট দেওয়া, কারো নামে অপপ্রচারমূলক তথ্য প্রচার করে কষ্ট দেওয়া। মোটকথা হাত দিয়ে অন্যভাবে কলম চালানোও কষ্ট দেওয়ার শামিল।