পরিভাষার অজ্ঞতা; পশ্চিমের ইসলামি করণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার
দুনিয়ার সকল জ্ঞানশাস্ত্রের নিজস্ব পরিভাষা রয়েছে, এবং প্রতিটি জ্ঞানশাস্ত্রকে তার সে পরিভাষার প্রকৃত মর্ম ছাড়া উদ্ধার করা সম্ভব নয়। ভিন্ন ভাষার পরিভাষাগুলো বুঝার ক্ষেত্রে প্রচলিত একটি পদ্ধতি হলো নিজস্ব ভাষায় সে পরিভাষার সামর্থবোধক শব্দ খোঁজা বা শাব্দিক অর্থ বের করে বুঝা। কিন্তু পরিভাষার মর্ম উদ্ধারের এই পদ্ধতি অগ্রহণযোগ্য একটি পদ্ধতি। কেননা প্রতিটি পরিভাষার তৈরির—চাই তা ইসলামি হোক বা অনিসলামি—নির্দিষ্ট ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক পটভূমি থাকে। আর সেগুলোর জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology), অস্তিত্বতত্ত্ব (Ontology), সৃষ্টিতত্ত্ব (Cosomology) ও অদিবিদ্যা (Metaphysics) থেকে তৈরি হয়। পরিভাষা শুধুই অন্যের কাছে নিজের চিন্তা পৌছানোর মাধ্যম শুধু নয়, বরং তা একটি জাতীর ইতিহাস ও দর্শনের আয়না। এজন্য কোনো পরিভাষার প্রকৃত মর্ম উদ্বার করা পরিভাষার পিছনের অদিবিদ্যা (Metaphysics) পটভুমি জানা ছাড়া সম্ভব নয়। এই সুক্ষ বিষয়টি একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বুঝা যাক। Dead Labour মার্ক্সবাদিদের একটি নিজস্ব পরিভাষা। যার শাব্দিক অর্থ হয় ‘মৃত মজদুর’ বা ‘মৃত শ্রমিক’। অথচ মার্ক্সবাদিদের পরিভাষায় এর মর্ম হলো ‘পুঁজি’।
একজন মুসলমান চাই সে যতই সঠিক ও মজবুত আকিদা বিশ্বাসের অধিকারী হোক না কেনো, যদি সে পশ্চিমা পরিভাষার প্রকৃত মর্ম ও বাস্তবতা না জানে, তাহলে সে পশ্চিমা মতবাদগুলোকে শুধু শাব্দিক কিছু মিলের কারণে ইসলামাইজেশন বা ইসলামিকরণ করতে থাকবে। যে সকল মডার্নিষ্টরা পশ্চিমা পরিভাষাগুলোকে ইসলামিকরণ করে তাদের একটি গোড়ার ভুল হলো, তারা পশ্চিমা পরিভাষাগুলোর বাহ্যত বা আংশিক কিছু মিল দেখেই সেগুলোকে ইসলামি বিভিন্ন পরিভাষার উপর কেয়াস করে ফেলে। এবং উভয়টি একই এমন সিন্ধান্ত দিয়ে ফেলে। যেমন ধরুন, Democracy বা গণতন্ত্র পশ্চিমের নির্দিষ্ট দর্শন থেকে উঠা আসা একটি পরিভাষা। ইসলামের শুরায়ী নেজামের সাথে এর আসমান জমিনের পার্থক্য থাকলেও কিছু আংশিক মিল দেখা যায়। এখন এই আংশিক আর বাহ্যত কিছু সামাঞ্জস্যে প্রভাবিত হয়ে গণতন্ত্রের পশ্চিমা দর্শন, ইতিহাস ও যে অতিপাকৃত বিশ্বাসের উপর তা প্রতিষ্ঠিত সেগুলোর সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তিরা গণতন্ত্রকে ইসলামিকরণ করে ফেলে। অথচ ইলমে কিয়াস সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা রাখা ব্যক্তিও জানে, একটি বিষয়কে আরেকটি বিষয়ের উপর কেয়াস করতে হলে উভয়ের মাঝে অনেকগুলো মৌলিক বিষয়ে মিল থাকতে হয়। অন্যথায় সে কেয়াস শাস্ত্রীয় বিবেচনায় কেয়াস মাআল ফারেক বলে বিবেচিত হবে। পরিভাষার এই মৌলিক ভুল ও অজ্ঞতার কারণে মর্ডানিষ্টরা পশ্চিমের অসংখ্য বিষয়কে ইসলামের মাঝে খুঁজে পায়। এবং সেগুলোকে ইসলামি করণ করে মানুষকে হয় ধোঁকা দেয় অথবা নিজেরা ধোঁকা খায়।
পরিভাষা বুঝার সঠিক পদ্ধতি
মানবতাবাদ (Humanism), যুক্তিবাদ (Rationalisom), রেনেসাঁ (Renaissance), এনলাইটেনমেন্ট (Enlightenment), ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ (Individualism), সমতা (Equality), স্বাধীনতা (freedom), পুঁজিবাদ (Capitalism)সহ পশ্চিম থেকে উঠে আসা প্রতিটি পরিভাষাকে শাব্দিকরণ ও বাহ্যত মিলের সাথে সামাঞ্জস্য করে না বুঝে সেগুলোর জ্ঞানতত্ত্ব ও যে অতিপাকৃত বিশ্বাসের উপর সেগুলো প্রতিষ্ঠিত তার আলোকে বুঝা অত্যান্ত জরুরি। তেমনিভাবে ইসলামি পরিভাষাগুলোও নিজস্ব জ্ঞানতত্ত্ব ও অতিপাকৃত কিছু বিশ্বাসের পটভুমিতে তৈরি হয়েছে। একেকটি পরিভাষায় নিজস্ব মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্ব রয়েছে। যেমন, সুন্নাত, ইজমা, ইজতিহাদ, মাকাসেদে শরয়িয়্যাহ, আজমতে সাহাবা, ফাতাওয়া, তাকলিদ, তালফিক, ইল্লত, ইবারাতুন নস, দালালাতুন নস, ইশারাতুন নস, ইকতিযায়ুন নস, ইসতিহসান, মাজাযে মুরসাল ইত্যাদি অসংখ্য পরিভাষাগুলোর গঠণ, গড়ন ও সৃষ্টি নির্দিষ্ট জ্ঞানতত্ত্ব ও কিছু বিশ্বাসের পটভূমিতেই তৈরি হয়েছে। যেগুলোর শাব্দিকিকরণ করে বুঝা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। বরং এগুলোকে বুঝতে হলে এগুলোর নিজস্ব ইতিহাস, জ্ঞানতত্ত্ব ও অতিপাকৃত বিশ্বাসগুলো জানতে হবে।
মোটকথা প্রতিটি পরিভাষার নির্দিষ্ট জ্ঞানতত্ত্ব ও অতিপ্রাকৃত (Specific Epistemological Metaphysical) পটভূমি জানা ছাড়া সম্ভব নয়।
সূত্র : লেখাটি কিছুটা পরিমার্জন, সংক্ষেপণ ও সংযোজনসহ নেয়া হয়েছে পাকিস্তানি গবেষক জাফর ইকবাল রচিত ‘ইসলাম আউর জাদিদিয়াত কা মাশমাকাশ’ (পৃ. ৭,৮,৯) গ্রন্থ থেকে।