পশ্চিমা গণতন্ত্র আমাদের মাথায় একটি মৌলিক গোমরাহি এটা প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়েছে যে, গণতন্ত্রের বিপরীত মানেইই হলো রাজতন্ত্র, আর রাজতন্ত্র মানেইই হলো স্বৈরাচার। অতচ আমাদের ইসলামি তুরাসে এমন কোনো কথা নেই।
.
গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতারা বিশেষ ফরাসি বিপ্লবের আগ মূহুর্তের দার্শনিকদের থেকে পরিবর্তি সময়ে যারা রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেছে, তারা রাজতন্ত্রকে এতটা ঘৃণিতভাবে পেশ করেছে যে, রাজতন্ত্রের মৌলিক বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করার কোনো সুযোগই দেয়নি।
.
মাওলানা মওদুদির অন্যতম শ্রেষ্ঠ গোমরাহি হলো এটাই যে, রাষ্ট্রনীতি নিয়ে তার মৌলিক পড়াশোনা যতটা না ইসলামি তুরাস থেকে হয়েছে তার থেকেও বেশি হয়েছে আধুনিক পশ্চিমা দার্শনিকদের হাত ধরে। যারফলে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ঘৃণিত মনোভাব তার মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছে। ফলে তিনি যখনই ইসলামের ইতিহাস নিয়ে বসলেন দেখতে পেলেন, রাজতন্ত্রের বাহ্যত সূচনাকারী হযরত মোয়াবিয়া রা.। বাস, আর কোনো কথা নেই। কলমের অস্ত্র নিয়ে নেমে গেলেন রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আর ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করলেন মহান সাহাবীর ইজ্জত।
.
মাওলানা মওদুদির সাহাবা সমালোচনার বিরুদ্ধে ওলামায়ে কেরমা কঠোর দমন করলেও, সমালোচনার মূল গোড়ার কারণটি অনেকেই ধরতে পারলেন না৷ যার ফলে সাহাবাদের সমালোচনা না করলেও ব্যাপকভাবে ও ঢালাওভাবে রাজতন্ত্রের বিরোধিতা একদল আলেমদের মধ্যে রয়েই গেলো।
.
আমাদের সিয়াসি তুরাছের কোথাও রাজতন্ত্রকে ঢালাওভাবে নাজায়েজ বা গোমরাহি মনে করা হয় না। আমাদের প্রায় সকল তুরাছেই এই কথা স্পষ্ট রয়েছে, নিজ সন্তানকে ক্ষমতা দিয়ে যাওয়া বাবার জন্য বৈধ।
.
ইসলামি খেলাফত সংক্রান্ত আমাদের তুরাসি পড়াশোনো একেতো কম, তার উপর আমরাও এটা ধরেই নিয়েছি, রাজতন্ত্র একটি ঘৃণিত। সুতরাং, ইসলামকে বাচাতে গিয়ে আমরাও ঢালাওভাবে রাজতন্ত্রের কঠোর বিরোধিতা করি। রাজতন্ত্রের ব্যাপারে ঢালাওভাবে বিভিন্ন অন্যায় বক্তব্য দিয়ে থাকি।
.
ইসলামি খেলাফত সংক্রান্ত একটি লেখায় আমি অনেকদিন আগে লেখেছিলাম,
//মজার কথা হলো, কুরআন থেকে রাজতন্ত্র হারামের পক্ষে কোনো দলিল দেওয়া তো অনেক দূরের বিষয় স্বয়ং কুরআনে রাজতন্ত্রের পক্ষে দলিল পাওয়া যায়। যেমন কুরআনে বিভিন্ন নবীদের ঘটনা পাওয়া যায় যারা নিজ বংশে ক্ষমতা থাকার দোয়া করেছেন আর আল্লাহ তাঁদেরকে এই ধরনের দোয়া করতে নিষেধ করেননি। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আধুনিক চিন্তাবিধরাও কিন্তু দ্বিমুখী বক্তব্য দিয়ে থাকে। তাদেরকে ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ.-র ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তারা বলে এটা খিলাফতে রাশেদার নমুনা। অথচ এই নমুনাও কিন্তু মূলত রাজতন্ত্রই ছিলো। চিন্তার বিষয় হলো, গণতন্ত্রকে এরা এতটাই উন্নত শাসনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করে যে, গণতন্ত্রের আলোকে ইসলামি গণতন্ত্র বা ইসলামি জমহুরিয়্যাহ খুঁজে বেড়ায় আর রাজতন্ত্রের ব্যাপারে সিন্ধান্ত দেয় অনৈসলামি! অথচ গনতন্ত্রের পক্ষে না শরয়ী কোনো দলিল আছে, না খিলাফতে রাশেদায় এর কোনো নমুনা আছে। বরং রাজতন্ত্রের পক্ষে শরয়ী দলিলও আছে, খাইরুল কুরুনে এর উত্তম দৃষ্টান্তও রয়েছে। এবং সকল মুসলিম রাষ্ট্রচিন্তক ইমামগনের নিকট রাজতন্ত্রের অনুমতিও আছে। ইদ্রিস কান্ধলবি রহ. বলেন, 'ইসলামের মধ্যে মৌলিকভাবে রাজতন্ত্রের অনুমতি রয়েছে। যারা বলের ইসলামে রাজতন্ত্রের অনুমতি নেই তাদের কথা অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়।’
মূল কথা হলো, রাজতন্ত্র সম্পূর্ণরূপে অনৈসলামিক কোনো পদ্ধতি নয়। হাঁ, তা অনুসরণীয় পদ্ধতিও নয়। রাজতন্ত্র খারাপ হওয়ার মূল কারণ এটা নয় যে, এখানে বংশপরম্পরায় ক্ষমতা চলতে থাকে। বরং খারাপ হলো, তার ভুল ব্যবহার। আর এই কথা শুধু রাজতন্ত্রের জন্যেই নয় বরং যেকোনো শাসনব্যবস্থার জন্যেই প্রযোজ্য। আধুনিক যুগের চিন্তাবিদরা রাজতন্ত্রকে তুলনা করে স্বৈরাশাসনের সাথে। যেখানে শাসকের হুকুমই দেশের সংবিধান বলে গন্য হয় অর্থাৎ বিধান দেওয়ার অধিকার বাদশাহের। তাদের এই ধারণাও সম্পূর্ণ ভুল। ইসলামি ইতিহাসে স্বৈরাশাসকের অস্থিত্ব থাকলেও তাদের কথাই একমাত্র আইন ও তারা যেকোনো বিষয়ে যা সিদ্ধান্ত দিবে তাই পালনীয় এমন কোনো চিত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো চলতো ধর্মীয় বিধিনিষেধনুযায়ী। যেখানে বাদশাহ নয় হাকিমিয়্যাত ছিলো আল্লাহর।//
বিস্তারিত নীচের এই পিডিএফটিতে দেখতে পারেন।
https://t.me/abdullahbinbashir/516