সর্বশেষ বিশিষ্ট দায়ী ও যুগের অন্যতম সচেতন আলেম মাওলানা মঞ্জুর নোমানী রহ.-এর একটি ঈমানী আহবান দিয়েই আলোচনাটি শেষ করছি। তিনি তার বিখ্যাত বই ‘দ্বীন ও শরীয়ত’ তে লেখেন, “বর্তমান যুগে ইউরোপের প্রভাব মানুষকে পূর্ববর্তী যুগের শিরক থেকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে; কারণ, পূর্ববর্তী শিরকের মূলভিত্তি ছিলো নিছক নফসের পূজা এবং মূর্খতার ঘোঁড়ামি। বর্তমান যুগে পড়ালেখা করেছে এমন প্রত্যেক লোক—যদি তার ভেতর নূন্যতম অনুভূতি থাকে এবং পড়ালেখা করার কারণে কোনো বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করতে শিখেছে—সে মূর্তিপূজা, নক্ষত্র, বৃক্ষ এবং নদীর পূজা, অনুরূপ পশুদের পূজা করাকে সর্বোচ্চ স্তরের বোকামি এবং নির্বুদ্ধিতা মনে করবে। যদিও রীতি-নীতি হিসেবে অথবা সমাজের সাংস্কৃতির অংশ মনে করে সে নিজেই এসবের পূজা করে, তবুও ভেতরে ভেতরে সে এগুলোর প্রতি ঘৃণাই রাখে। কিন্তু সমস্যা হলো, ইউরোপের প্রভাবে পৃথিবীর বুকে পুরোনো ও সেকেলে সেই মূর্তির পরিবর্তে নতুন কিছু মূর্তি মাথা নাড়া দিয়ে উঠেছে। আজকাল এগুলোরই পূজা করা হচ্ছে। এ মূর্তিগুলোর নাম হলো— জাতী, দেশ, জাতীয় স্বার্থ, দেশের স্বার্থ, উদর, সম্পদ, শাসন ক্ষমতা ইত্যাদি ইত্যাদি।
বাস্তব কথা হলো, স্বজাতী এবং স্বদেশের প্রতি টান ও ভালোবাসা থাকা মোটেই মন্দ বিষয় নয়; বরং এটি স্বভাবগত বিষয়। আর নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত এব্যাপারে আদেশও করা হয়েছে। অনুরূপ জাতীয় স্বার্থ এবং স্বদেশের স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং বসবাস নিয়ে চিন্তা-ফিকির করা, পৃথিবীর বুকে স্বাচ্ছন্দ্য ও সম্মানের সাথে জীবন যাপন করার আকাঙ্খা রাখা দোষনীয় নয়—যদি হালাল-হারাম যাচাই করে এবং অন্যের হক ঠিক রেখে চলা হয়। এভাবে কোনো সৎ উদ্দেশ্য পূর্ণ করা যেমন, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার জন্য অথবা আল্লাহর মাখলুকদের খেদমত করার নিয়তে শাসন ক্ষমতা অর্জনের চিন্তা করা এবং এর পেছনে শ্রম ব্যয় করাও ভুল কাজ নয়। আম্বিয়া কেরাম এগুলো থেকে বিরত থাকেন নি। (বরং এগুলো কীভাবে করবে) সে ক্ষেত্রে বিধি বিধান দিয়ে গিয়েছেন।
কিন্তু আমাদের বর্তমান সময়ে এসব বিষয় এতো উচ্চ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, এগুলো মা’বুদ (উপাস্য) এবং তাগুতের স্থান দখল করে নিয়েছে। বর্তমান সময়ে জাতী-রাষ্ট্রের কল্যান ও স্বার্থে সবকিছু করা একধরণের মূলনীতি এবং বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে (জাতী ও রাষ্ট্রের স্বার্থে) যত ধরণেরই বে-ইনসাফি করা হোক, অন্যের উপর যত জুলমই হোক না কেন, সেগুলো দেখার বিষয় নয়। এভাবে পেট পূজা ও সম্পদ পূজা এবং শাসন ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্খার ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধি বিধানকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়; যেনো পেট হলো তার মা’বুদ (উপাস্য), তাই তার পূজা করতে যা করা হবে তাই সঠিক, এবং সম্পদ ও রাজত্ব হলো এমন এক দেবী, যার জন্য ধর্ম ও সকল প্রকার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য বিসর্জন দিতে কোনো সমস্যা নেই। আজকাল অনেক মানুষই এসকল বস্তুকে নিজেদের মা’বুদ বানিয়ে নিয়েছে, পুরো বিশ্বই এভাবে চলছে।
এই দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ, পেট পূজা, সম্পদ পূজা, শাসন পূজা, বর্তমান সময়ের এক নতুন শিরক। ইসলামের মধ্যে এর কোন স্থান নেই। এ সকল বিষয় থেকে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যেভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন সেটি কুরআনে কারীমে বিবৃত হয়েছে,
ﵟإِنَّا بُرَءَٰٓؤُاْ مِنكُمۡ وَمِمَّا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ ﵞ [الممتحنة: 4]
আমরা তোমাদের থেকে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে মা’বুদ রূপে গ্রহণ কর তাদের তেকে সম্পূর্ণ পৃথক। (মুমতাহিনা: ৪)
বস্তুত এসব মিথ্যা পূজার মূলে রয়েছে নফসের পূজা/খায়েশাত। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার বিধি বিধান বাদ দিয়ে যা সামনে আসে, এবং যা মন চায় তা করা। এটিই হচ্ছে প্রতিটি শিরক বরং সকল মন্দ কাজ ও সমস্যার মূল। তাই বলা যায় সবচেয়ে বড়ো মূর্তি হলো নফস।’’
প্রবন্ধ: জাতীয়তাবাদ; জাহিলিয়াতের নতুন রূপ
পশ্চিমা সভ্যতা নিয়ে প্রকাশিতব্য বই থেকে
(সকলের কাছে বিশেষ দোয়া চাই, আল্লাহ যেনো কাজটিকে পূর্ণ করার তাওফিক দেয় এবং উম্মাহের জন্য ব্যাপক উপকারী হিসেবে কবুল করে বইটিকে।)