বকলম খানের বন্ধু দিগম্বর সেনের কথা আপনাদের আগে বলা হয়নি। ভদ্রলোকের বয়স ৫০ এবং তাকে দেখলে মনে হয় আরো ৫০ বছর বাঁচবেন। বাহ্যত বকলম খানের সাথে তার কোনো মিল নেই কারণ দিগম্বর সেন পেশায় একজন পরিবেশকর্মী। পরিবেশকর্মী বিষয়টা একটু খুলে বলা যাক। কোথাও পরিবেশ দূষণ না হলে পরিবেশকর্মীর কোনো কাজ থাকে না, ফলে কাজের স্বার্থেই পরিবেশ দূষণ নিশ্চিত করতে হয়। দিগম্বর সেন ত্রিশ বছর ধরে কাজটি গুরুত্বের সাথে করে আসছেন। বকলম খান চিন্তিত শিশুদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে, দিগম্বর সেন চিন্তিত পরিবেশ দূষণ নিয়ে। কিন্তু দুজনের চিন্তা এসে এক বিন্দুতে মিলিত হয়, তা হলো কুরবানি। কুরবানির পশু জবাই থেকে উদ্ভূত দুটি সমস্যা নিয়েই তাদের কাজকারবার।
দিগম্বর সেনের দৈনিক রুটিন বেশ সরল। সকালে উঠে তিনি নদীর পাড়ে ওয়াকওয়ে ধরে হাঁটেন। এটি বানানো হয়েছে বছর কয়েক আগে, নদীর জায়গা কিছুটা ভরাট করে। দিগম্বর সেন নিজেকে সান্ত্বনা দেন , উন্নয়নের জন্য কিছুটা মূল্য দেয়া খারাপ নয়। শহরের বেশিরভাগ ফ্যাক্টরির বর্জ্য এসে নদীতে পড়ছে। নদীর পানি কালো হয়ে উঠছে গত ক'বছরে। শোনা যায় এখন নাকি নদিতে মাছই নেই। ‘পলিসি ফেইলিউর' আপনমনে ভাবেন দিগম্বর সেন।
দিগম্বর সেন একবার পাহাড়ে গিয়েছেন বেড়াতে। দেখলেন পাহাড় আগের মত নেই। বন কেটে উজাড়। মাটি কেটে সমতল করে ফেলা হয়েছে অনেক জায়গায়। সেদিন তিনি ফেসবুকে লিখেছিলেন, প্রকৃতির প্রতি আমাদের সংবেদনশীল হতে হবে। কদিন আগে পত্রিকায় পড়লেন ঢাকার বায়ু এখন বিশ্বের অন্য যে কোনো শহর থেকে বেশি দূষিত থাকে। আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে, সেদিন রাতে বন্ধুদের আড্ডায় বলেছিলেন তিনি।
তবে সারাবছর কোনোভাবে কেটে গেলেও জিলহজ মাস এলেই দিগম্বর সেন মাঠে নেমে পড়েন। কুরবানির কথা শোনামাত্র তিনি আঁতকে উঠেন। তার চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। তার ভাব দেখে মনে হয় তিনি একাই যেন পৃথিবীর শেষ অক্সিজেন সিলিন্ডার পাহারা দিচ্ছেন।
প্রায়ই তিনি ফেসবুকে লেখেন, কুরবানি? উফ, রক্ত আর রক্ত। পুরো শহরে হাজার হাজার মৃত গরু। দেখার কেউ নেই। রক্ত, বর্জ্য, দুর্গন্ধে শহরে চলা যায় না। এই দূষণের কারণেই এন্টার্কটিকায় বরফ গলছে। অবিলম্বে এটি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঈদের সকালে গরু দেখলেই তার চেহারায় এমন বেদনা ফুটে ওঠে, যেন জাতিসংঘের মহাসচিব তাকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে বলেছেন, ওরে দিগম্বর, পৃথিবী আর বাঁচলো না।
তিনি ফেসবুকে প্রায়ই লেখেন, মানুষ প্রকৃতির ভাষা ভুলে গেছে। সাধারণত তিনি এই পোস্ট দেন গাড়ির ভেতরে বসে, এসি চালিয়ে, প্লাস্টিকের কাপে কোল্ড কফি খেতে খেতে।
একবার তিনি এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন যে একটি গরুর সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলেছিলেন, আই অ্যাম সরি…’ । দুঃখের বিষয় হলো, গরুটি তখন সম্পূর্ণ নির্লিপ্তভাবে ঘাস চিবাচ্ছিল। দিগম্বর সেনের ভেতরে একধরনের সিনেম্যাটিক পরিবেশবাদ কাজ করে। তিনি চান পৃথিবী বাঁচুক, কিন্তু এমনভাবে বাঁচুক যেন ইনস্টাগ্রামে ভালো লাগে। অর্থাৎ গরু থাকবে, সবুজ মাঠ থাকবে, পেছনে কোথাও হালকা টুং টাং শব্দ হবে। কোথাও কোনো গরু জবাই হবে না।
দিগম্বর সেনের সবচেয়ে বড় প্রতিভা হলো, যে কোনো সাধারণ বিষয়কে তিনি আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ দিতে পারেন। একবার গরুর হাম্বা শুনে তিনি বলেছিলেন, দেখেছো? এ হচ্ছে সাফারিংয়ের ভাষা। পাশে দাঁড়ানো গরুর মালিক বললো, না ভাই, ও খড় চাচ্ছে। এই এক বাক্যে দুটি সভ্যতার মাঝে সংঘর্ষ বেঁধে গেলো।
দিগম্বর সেনের কথা পরিষ্কার। তিনি স্টেক পছন্দ করেন, কাচ্চি খেতে চান। কালোভুনা আর লালভুনা খেতেও আপত্তি নেই তার। শর্ত হলো কোথাও কোনো গরু জবাই হতে পারবে না।
তিনি এমন এক খাদ্যচক্রের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে গরুগুলো সকালে ঘুম থেকে উঠে স্বেচ্ছায় নিজেদের বিরিয়ানি বা কাচ্চিতে রূপান্তর করবে।