fa
Feedback
Iftekhar Jamil

Iftekhar Jamil

رفتن به کانال در Telegram

একজন তালিবে ইলমের দিনলিপি-মুজাকারা-রিভিউ

نمایش بیشتر
9 291
مشترکین
اطلاعاتی وجود ندارد24 ساعت
-197 روز
-4430 روز
آرشیو پست ها
এই কনফারেন্সে আমি একটা গবেষণা পেশ করবো। শিরোনাম: 'Grey Areas Between Orthodoxy and Disbelief: Legal and Parental Perspectives
এই কনফারেন্সে আমি একটা গবেষণা পেশ করবো। শিরোনাম: 'Grey Areas Between Orthodoxy and Disbelief: Legal and Parental Perspectives'

ধর্মহীন আধ্যাত্মিকতা কিছু বামপন্থীদের ইদানীং রুহানিয়াত-আধ্যাত্মিকতা শব্দটা অনেক বেশী ব্যবহার করতে দেখি। এতে অবাক হবার কিছু নেই, নাস্তিককুল শিরোমণি স্যাম হ্যারিসও 'Waking Up: A Guide to Spirituality Without Religion' শিরোনামে একটা বই লেখেন। দেশি বাম/নাস্তিক/সেকুলারদেরকেও বৌদ্ধ দর্শন, লালন ও রবীন্দ্রনাথের গান শুনে আপ্লুত হতে দেখবেন। এগুলোর মূলকথা একই। বামপন্থা/সেকুলারিজম অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। আপনার বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটলো, আপনি মৃত্যুর মুখামুখি, গভীর রাতে ভেঙ্গে গেল ঘুম, আপনার মনে প্রশ্ন আসবে, 'why is there something rather than nothing?' ‘কেন আমার জীবনটা এত কষ্টে কাটবে, লাইফ কেন ফেয়ার হবে না?’ ধর্ম এসবের উত্তর দিতে পারে, ধর্মহীনতা এসব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অক্ষম। এমন জটিলতায় আপনার এক রকমের ভাববাদ লাগবেই। বৌদ্ধ দর্শন, লালন বা রবীন্দ্রনাথ, সেকুলার সুফিবাদ বা ধ্যানে দেশি বাম/ নাস্তিকরা অর্থহীনতা ঘুচাতে চান। পশ্চিমা বৌদ্ধ ধর্ম ও দেশি লালন চর্চায় আসলে বিশেষ পার্থক্য নেই। কষ্ট পেলে আপনার আশ্রয় দরকার, আপনি মাঝেমাঝে অর্থহীনতাতেও ভুগতে পারেন, এগুলো কিন্তু ইসলামও বলে। আপনার একজন আল্লাহ আছে, তিনি আপনার ডাকে সাড়া দেন, তিনি আপনার কেয়ার করেন। ‘হে নবী, আমার বান্দারা আপনার কাছে আমার কথা জিজ্ঞাসা করলে আপনি বলুন, আমি কাছেই আছি। আমাকে ডাকলে আমি সাড়া দেই। তাদের বলুন, তারা যেন আমার কথা মানে, আমার প্রতি ঈমান আনে। দেখবেন তারা ভালো থাকবে, সুপথে চলতে পারবে’। ইসলাম আল্লাহর কাছে আশ্রয়ের কথা বলে, আপনার কষ্টে আপনি একা নন। আল্লাহ আপনার পাশেই আছেন। এটাই মোটাদাগে ভাববাদিতা, আপনি শতবার গুনাহ করেন, তাওবা ভঙ্গ করেন, তাওবার দরজা কিন্তু খোলা। তবে ইসলাম ঈমান ও আমলের শর্তও আরোপ করে। বৌদ্ধ ধর্ম বা লালনবাদে এসব শর্ত নেই। তারা ধর্মহীন ভাববাদিতা কায়েম করতে চান। আধুনিক মানুষের মনে অহংকার অনেক, সে কীভাবে অলৌকিক সত্ত্বার কাছে নতজানু হতে পারে, সে কীভাবে নিজের বুদ্ধি-প্রবৃত্তির শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার ছাড়তে পারে? চিন্তার শিরিকির চেয়ে বড় শিরিকি আর নাই। তলিয়ে দেখলে বুঝবেন, ঈমান-আমল ছাড়া আধ্যাত্মিকতা হতেই পারে না। ঈমান ছাড়া মনে স্থিরতা আসে না। মুজাদ্দিদে আলফে সানি বলেন, আমল ছাড়া আধ্যাত্মিকতা করলে সেটা দর্শনে পরিণত হয়ে যায়। যদি দর্শনই করেন, তবে আধ্যাত্মিকতার কেন দরকার হবে? আল্লাহ আপনার পাশে আছেন, আপনাকে তিনি দেখে রাখছেন সবসময়। আপনাকে ছাড়তে হবে অহংকার, আল্লাহর কাছে করতে হবে আত্মসমর্পণ। গুনাহ করলে তওবা করবেন, বিপদে পড়লে আল্লাহর আশ্রয় চাইবেন, ধর্মহীন আধ্যাত্মবাদ আপনাকে আত্ম ও প্রবৃত্তি পূজা থেকে মুক্তি দিবে না। ধর্মহীন আধ্যাত্মিকতা আপনাকে আরও বেশী অর্থহীন, আশ্রয়হীন করে তুলবে

তালিবদের সফলতার রহস্য তালিবানদের সাংগঠনিক সফলতার একটা বড় কারণ তাদের ইলমি চর্চা। নতুনদের অবশ্যই মৌলিক ধর্মীয় শিক্ষাগ্রহণ করতে হয়। শিক্ষা চলতে থাকে, ক্রমশ নতুনরা প্রশিক্ষকে পরিণত হন। সিনিয়র সদস্যরা তরুণ প্রশিক্ষকদের উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সর্বোচ্চ নেতাদের দরসে বসেন সিনিয়র নেতারা। এভাবে ক্রমধারায় সবাই ইলমের সাথে সংযুক্ত থাকেন। কঠিন যুদ্ধের মধ্যেও তারা ইলমি চর্চায় অবহেলা করেন না। যারা মৌলিক শিক্ষাগ্রহণে ব্যর্থ হয়, তাদেরকে সংগঠন থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। তালিবানদের সাংগঠনিক কাঠামো এভাবে উস্তাদ-শাগরিদদের মিথস্ক্রিয়ায় পরিচালিত হয়। ছোটরা বড়দের সম্মান করেন, বড়রা ছোটদের দেখেন ছাত্র হিসেবে। তালিবানদের সফলতা থেকে যদি শুধু একটি বার্তা নেওয়া যায়, তবে সেটি হল সবাইকে মৌলিক ধর্মীয় শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। সাধারণরা তো আছেনই, বিশেষত যারা রাজনীতি ও প্রশাসনের সাথে যুক্ত হবেন, তাদেরকে অবশ্যই ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করতে হবে, সবসময় কোন একভাবে ইলমের সাথে যুক্ত থাকতে হবে। প্রত্যেককেই ইসলামি বিশ্বদৃষ্টি সম্পর্কে জানতে হবে। ভুল করলে না হয় তাওবা করে নিলেন, ভুল যে করছেন, সেটা অন্তত জানা থাকুক, মনে আসুক অনুতাপ। ইলম চর্চা শুধু জানার জন্য নয়, এটা এক বিশেষ লাইফস্টাইল। তৎকালীন তালিবান শীর্ষ নেতা ও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আবদুস সালাম জাইফ মন্ত্রীত্ব ছেড়ে মসজিদের ইমামতি-শিক্ষকতার জীবন বেছে নেন।

কাবুল বিজয়ের পাঁচ বছর দুই হাজার এক ও তিন সালে আফগান ও ইরাকের পতনে অনেকের ঈমানে টান পড়েছিল। যদি আল্লাহ সর্বশক্তিমান হন, যদি ইসলামই হয় সত্য ধর্ম, তবে শুধু মুসলমানরাই কেন বিপর্যয়ের শিকার হবে—অনেকেই এমন কথা ভেবেছেন ও বলেছেন। সর্বশেষ রোহিঙ্গা গণহত্যায় আমাদের দেশে ব্যাপক হতাশার জন্ম হয়। রাবেয়া স্কয়ারের কথা না বললেই নয়, দুই হাজার তেরো সালের চৌদ্দই আগস্ট মারা যান কয়েক হাজার মানুষ। আসমা বেলতাগির কথা হয়তো মনে আছে অনেকের, কিশোরী মেয়েটার হাসিমাখা মুখ—অনেকে প্রশ্ন করতে থাকেন, আল্লাহ কি এসব দেখেন না? আফগান ও ইরাক যুদ্ধের সময় আমরা ছোট ছিলাম। মাত্রই পত্রিকার শিরোনাম পড়তে শিখেছি। বাবা ফজরের নামাজে কুনুতে নাজেলা পড়তেন। নিয়মিত। মাঝেমাঝে মুসুল্লিরা হাউমাউ করে কান্না করতো। আন্তর্জাতিক পাতায় দেখতাম শুধু নির্যাতন, মৃত্যু, ধ্বংসের খবর। আমরা বড় হয়েছি এসব পরাজয় দেখতে দেখতে। আমরা ভাবতাম, এগুলো কি আমাদের পাপের ফসল, অন্য জাতিগুলো তো আরও বেশী পাপে লিপ্ত, বিপদ কেন আসবে শুধু মুসলমানের মাথায়? ইকবালের ভাষায়, There are other communities too. There are sinners in them too/ There are weak, wretched ones. There are those intoxicated with the wine of pride. Your mercies are on the houses of the Others/When lightning falls, then it's on the poor Muslims! ইকবাল বিপর্যয়ের ব্যাখ্যা দানের চেষ্টা করেছেন। আমি-আপনিও সে ব্যাখ্যাগুলো জানি। বাস্তবতা হচ্ছে, ব্যাখ্যায় সবসময় মন ভরে না। মানুষ চোখে ও চেখে দেখতে আগ্রহী। আফগানিস্থানের বিজয় সাধারণ মুসলমানদের আত্মিক শান্তি দিতে পেরেছে, এটুকুই অনেক। আফগানিস্থান বাংলাদেশ থেকে বহুদূরে অবস্থিত। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও অনেক ভিন্ন। বাংলাদেশের মানুষ আসলে বিশেষ কিছু চায় না। তারা দেখতে চায় মুসলিম দেশগুলো ভালো থাকুক। আফগানিস্থানে বন্ধ হোক যুদ্ধ। বিরাজ করুক রাজনৈতিক সন্ধি, ঐক্যমত। আগামীকাল সকালে বাবা শিশু সন্তান নিয়ে রাস্তায় বের হোক নিরাপদে, নারীরা হিজাবে শিক্ষা ও কাজে যোগ দিক, পশতুনরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোক তাজিকদের সাথে, আবার খুলুক মাদরাসাগুলো। বিকেলবেলায় নালার পাশে কিশোররা লেখুক কুরবানি, স্মৃতি, শোক ও প্রেমের কবিতা।

আধুনিকতার সমস্যা আধুনিক শিক্ষা-সভ্যতার দুটো দুর্বলতম দিক আছে—আর্থসামাজিক বৈষম্য, ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। যদি উন্নয়নের গল্প এতটাই সত্য হয়, তবে সমাজে এত বৈষম্য কেন, পাশাপাশি প্রকৃতি মানুষের ভোগবিলাসের চাপ সহ্য করতে পারছে না। বাতাস-পানি-মাটির মত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আধুনিক চিন্তা-দর্শনে এসবের সহজ কোন সমাধান নেই। কিছু বললেই তারা 'সাসটেইনেবিলিটি' তত্ত্ব ধরিয়ে দেয়, কিন্তু এর মধ্যেও লুকিয়ে আছে অর্থনৈতিক-বিলাসিতার উপাদান। আর্থসামাজিক বৈষম্য আর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভূত আধুনিক সমাজ-সভ্যতা-দর্শনকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সবাই শুধু দৌড়াচ্ছে, আপাতত সমাধান নাই কোথাও।

রাজনীতি ও শরীয়া তখন মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায়। তারা কেন দ্রুত ‘ইসলাম কায়েম’ করে ফেলছে না, সে নিয়ে আমাদের মধ্যে উত্তেজনা। আমরা ভাবছিলাম, ‘ইসলাম কায়েম’ মানে ‘ইসলামি বিধিবিধান’ সব বাস্তবায়ন করতে হবে—যেমন তালিবরা করেছিল। আমি একটা আরবি রচনা লেখে ফেললাম। শিরোনাম দিলাম, ‘ইসলামি আইন’ ছাড়া ‘ইসলামি শাসন’ কীভাবে সম্ভব? আমাদের মরহুম এক শিক্ষক লেখাটা দেখে মুখটিপে হাসলেন, কিছুই বললেন না। ব্রাদারহুড খুব বেশীদিন ক্ষমতায় থাকতে পারলো না। আমাদের প্রজন্মের সবাই একটা ধাক্কা খেলাম—কিশোর বয়সের কথা। আমার পড়াশোনা-জানাশোনার পরিধি খুবই সীমিত ছিল। আমি বিকল্প লেখকদের অনুসন্ধান করতে লাগলাম। ইতিমধ্যে একটা তত্ত্ব আমার মনে ধরলো : আলহুররিয়াতু ওয়াশশারঈয়াতু কাবলাশ শারিয়াহ। যার মর্ম হল, রাজনৈতিক বৈধতা-স্বাধীনতার দিকটা শরীয়ার আনুষাঙ্গিক বিষয়ের চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ। যদি দেশে অবৈধ শাসন চালু থাকে, সবাই রাষ্ট্রের কাছে পরাধীন থাকে, তবে শরীয়ার আনুষাঙ্গিক বিষয়দির কথা কল্পনাও করা যায় না। আপনার কাছে যদি সতর ঢাকার মত কাপড় না থাকে, তবে পাগড়ি বাঁধার কথা ভাববেন কীভাবে? বাংলাদেশে যারা বিপ্লবের পরে ‘ইসলাম কায়েমের’ আলোচনা করছেন, তাদের সাথে কিশোরবেলার স্মৃতি শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারলাম না। মনে রাখবেন, আনুষাঙ্গিক বিষয়/বিবাদের চেয়ে প্রতিবিপ্লব/জাতীয়তাবাদ ঠেকানোটা বেশী জরুরি। (এখানে কিছু রেটোরিক ব্যবহার করা হয়েছে। পূর্ণ রুপটা এমন হবে : ضروريات الشريعة أهم من تحسينياتها وجزئياتها ، فإن حفظ النفوس والنظام من مهمات الشريعة، فالشريعة في 'الحرية والشرعية قبل الشريعة' يراد بها جزئياتها. জরুরি বলেই রেটোরিক ইউজ করা হয়েছে)

যে কারণে কুরআন শরীফ বুঝা জরুরি আমরা এখন প্রচুর বিদেশি কন্টেন্ট দেখি। বই পড়ি, ভিডিও দেখি। আমাদের রুচি-আকাঙ্খা-কল্পনা পাল্টে যাচ্ছে। কুরআন-হাদিসের সাথে সম্পর্কের মাধ্যমেই নিজেদের রুচি/ফিতরত খানিকটা ধরে রাখা সম্ভব। সবচে’ ভালো হয় যদি সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলা যায়, বুজুর্গদের সাথে সম্পর্ক রাখা যায়। কারণ তারা জীবন্ত কুরআন-হাদিস।

সংগ্রহ করতে পারেন।
সংগ্রহ করতে পারেন।

ইমাম ইযযুদ্দিন বিন আব্দুস সালাম ইমাম ইযযুদ্দিন বিন আব্দুস সালাম ইসলামি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ আলেম। কেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ, কয়েক শব্দে সেটা ব্যাখ্যা যাক। ক) তিনি একা ক্রুসেডার দখলদার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। খ) ক্রুসেডারদের সহযোগিতাকারী শাসকদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেছেন। গণবিপ্লবে উৎসাহ প্রদান করেছেন। গ) তিনি ছিলেন গরীব বংশের সন্তান, অনেক বড় হয়ে ধর্মীয় পড়াশোনা শুরু করেছেন এবং সমকালীন সবচেয়ে বড় আলেমে পরিণত হয়েছেন। যারা গরীব বা বয়স্ক অবস্থায় জ্ঞানঅর্জন শুরু করেছেন, তারা তাঁর থেকে উৎসাহ পাবেন। ঘ) রাজনীতি নিয়ে লেখেছেন। অনেক নীতিমালা ও সূত্র ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি যে সময়ের সন্তান ছিলেন, তখনো রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। ফলে রাজনীতিমুক্ত আলেম হওয়া তাঁর জন্য সমীচীন ছিল না। যেমন এখন সমীচীন নয়। ঙ) তাসাউফ ও মাকাসেদ নিয়ে লেখেছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতায় মানুষের দ্বীনদারিতায় ব্যাপক ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছিল, ফলে তাসাউফের কোন বিকল্প ছিল না। পাশাপাশি আলেম হিসেবে তাকে প্রায়োরিটি সেট করতে হচ্ছিল, মাকাসেদ তাকে এক্ষেত্রে বিশেষ সাহায্য করেছিল। ইমাম শাতেবি (রাহঃ) এর আগে মাকাসেদে শরিয়া বিষয়ে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। চ) দামেস্কের শাসকের বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি মিসরে চলে যান এবং বিচারিক-ধর্মীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। সেখানেও নানারকম অনিয়ম চলছিল। তিনি সমস্ত মন্ত্রী-সামন্তনেতাদের বিরুদ্ধে রায় দেন। মিসরের এলিট সমাজ এতে ক্ষেপে যায়। শায়েখ সিদ্ধান্ত নেন তিনি মিসর থেকে চলে যাবেন। তাঁর সাথে আলেমরাও চলে যাচ্ছিলেন। তখন অভূতপূর্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। মিসরের ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় পুরুষ সমাজও বেরিয়ে আসে। ঘরে বসে থাকেনি নারী-শিশুরাও। তারাও মিসর ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্তগ্রহণ করে। একপর্যায়ে বাদশা সব শর্ত মেনে নেন।

আড়িয়াল বিল আড়িয়াল বিল আমার অন্যতম পছন্দের জায়গা। আমি এই এলাকায় অন্তত কয়েকশো বার গেছি বললে মোটেই বাড়িয়ে বলা হবে না। ইদানীং বিলের মাঝ বরাবর নতুন সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। বিলের জীববৈচিত্র্যের ওপরে সড়কটার প্রভাব কেমন হবে, সেটা আসলেই দুশ্চিন্তার বিষয়। মরিচপট্টি থেকে ডুবলি, গালিমপুর থেকে জয়পাড়া, বারৈখালি থেকে হাশারা রোডের পর্যবেক্ষণ থেকে বুঝি, বিল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তবে শুধু 'বয়ান' দিয়ে 'গ্রামীণ উন্নয়ন' থামানো যাবে না। আপনারা থাকবেন ঢাকায়, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা উপভোগ করবেন, মাঝে মাঝে বিল দেখে শহরের ক্লেদ দূর করতে চাইবেন। গ্রামীণ জনপদকে কেন আপনাদের শহুরে জীবন ও দূষণের দায়ভার বহন করতে হবে? সরকার ঘোষণা করেছে, বিল এলাকায় নতুন করে বিশেষ কোন স্থাপনা বানানো যাবে না। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ আছে, সরকার সংরক্ষিত জলাভূমি হিসেবে স্বীকৃতিও দিতে চাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যাবে : গ্রামীণ মানুষরা কেন আপনাদের শহুরে 'আবদার' রক্ষা করবে? পরিবেশ-নীতিবিদ্যায় এ এক সাংঘাতিক প্রশ্ন। ঠিক এ কারণেই পরিবেশ রক্ষাকে কেবল 'বৈজ্ঞানিক' দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাই যথেষ্ট নয়। নৈতিক-আর্থসামাজিক মূল্যায়ন-সমাধান পেশ করাও সমানভাবে জরুরী। বাংলাদেশ রাষ্ট্র এক্ষেত্রে মোটামুটি ব্যর্থ।

আল জাজিরার আহমদ শারা’র দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছে। সিরিয়ান রাষ্ট্রপতির সাথে কথা বলেছেন আমার প্রিয় সাংবাদিক আলী দফিরি।
আল জাজিরার আহমদ শারা’র দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছে। সিরিয়ান রাষ্ট্রপতির সাথে কথা বলেছেন আমার প্রিয় সাংবাদিক আলী দফিরি।

ইসলামি আদালত চাই আমাদের সমাজে যে নৈরাজ্যমূলক পরিস্থিতি বিরাজমান, এর পেছনে আমাদের বিচারব্যবস্থার দায় মোটেই কম নয়। বিশেষত নিন্ম আদালতের বিচারকদের মধ্যে সদিচ্ছা-সক্ষমতার অভাবটা অত্যন্ত প্রকট। আমার ধারণা বিচারকদের অনেকেই আইন বুঝেন না—বিশেষত তাদের কয়জন আইনের ইতিহাস-দর্শন-ব্যাখ্যাতত্ত্ব বুঝেন, সে নিয়ে আমার ঘোরতর সন্দেহ আছে। পাশাপাশি, পেশাদারিত্বের অভাবটাও চোখে পড়ার মত—তাদের অনেকের আচরণ দেখলে মনে হবে তারা আইনের আওতায় পড়েন না। বিচারকের আসনে বসে যখন যেমন খুশি মন্তব্য করে বসেন, অথচ আচরণবিধি মেনে চলা সবার জন্যই অত্যন্ত জরুরী। সর্বোপরি, ভুল রায় প্রদান করলে জবাবদিহিতার জায়গাটাও অত্যন্ত সীমিত। উকিলদের মধ্যে কয়জন দক্ষ-সৎ, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। জটিল মামলা সামলানোর জন্য যেমন দক্ষতা-কর্মনিষ্ঠা দরকার, সেগুলো অধিকাংশ আইনজীবীর মধ্যে পাবেন না। এই পেশায় জবান বলে কিছু আছে কিনা সে নিয়ে আমার ঘোরতর সন্দেহ আছে। যে যত ভালো ক্যানভাসার, সে তত ভালো উকিল। ব্যতিক্রম নেই সেটা বলবো না, তবে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের নিন্মআদালতের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। উচ্চআদালতের অবস্থা হয়ত ততটা খারাপ নয়, সেখানে যোগ্য উকিলের সংখ্যাও বেশী, তবে সেসব বড়লোকদের জন্য। গরীবকে তো নিন্মআদালতেই খাবি খেতে হয়, কোন ক্রিটিকাল কেইস না হলে গরীবরা সাধারণত উচ্চআদালতে যান না। আমরা এসবের সংস্কার চাই—ব্যাংকব্যবস্থার মত বিচার বিভাগেও আমরা ইসলামি বিকল্প চাই। সিভিল অপশন থাকুক, তবে পাশাপাশি আমরা ইসলামি কোর্ট-সালিশব্যবস্থা চাই। দেশে এমন বাজে বিচারব্যবস্থা টিকিয়ে রাখবেন, আর সমাজে নৈরাজ্য থাকবে না, সেটা তো হতে পারে না।

বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ‘মানবাধিকারের’ কথা বলে। অথচ আমরা সবাই জানি, শুল্ক আরোপের মূল উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক
বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ‘মানবাধিকারের’ কথা বলে। অথচ আমরা সবাই জানি, শুল্ক আরোপের মূল উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক—মার্কিন বাণিজ্য আধিপত্য জারি রাখার চেষ্টা। ‍যাতে পশ্চিমা মার্কেটে গ্লোবাল সাউথের কম দামি প্রোডাক্ট কম ঢুকতে পারে—কারণ প্রধানত এটাই। কাজেই, মানবাধিকার তথাকথিত নীরিহ ক্যাটাগরি নয়।

ধর্ম মানে কী—বিশ্বাস? বিশ্বাস ছাড়া তো মানুষ চলতে পারে না। সবারই কোন না কোন বিশ্বাস আছে। আইডিয়ালজি-মডেল-ফ্রেমওয়ার্ক বিশ্বাস
ধর্ম মানে কী—বিশ্বাস? বিশ্বাস ছাড়া তো মানুষ চলতে পারে না। সবারই কোন না কোন বিশ্বাস আছে। আইডিয়ালজি-মডেল-ফ্রেমওয়ার্ক বিশ্বাস ছাড়া চলতে পারে না। যদি তাই হয়, তাহলে তো কারো পক্ষেই রাজনীতি করা সম্ভব না। মুবাশার হাসানসহ বেশ কয়েকজন পশ্চিমা গবেষক বলেছেন, আওয়ামীলীগ জাতীয়তাবাদী-সেকুলার ধর্মে পরিণত হয়েছিল। কাজেই, একই যুক্তিতে কি লীগকে নিষিদ্ধ করা যাবে?

কুরআন সহিহ করুন আমাদের সমাজে অনেকের কুরআন শরীফ পড়া শুদ্ধ নয়। এটা খুবই খারাপ কথা। ইরান-তুরান সবকিছু বুঝতে সময় দেন, আল্লাহর কুরআন পড়তে শিখবেন না, এটা কেমন কথা? আল্লাহর কালামের ক্ষমতা অনন্য, ‘আল্লাহর জিকিরেই মনে প্রশান্তি আসে।’ কুরআন তিলাওয়াত স্বতন্ত্র ইবাদত ও আমল। সুফিরা মুরিদদেরকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ তিলাওয়াত করতে বলতেন, তাতে মানসিক স্থিরতা অর্জিত হত। যদি কখনো মন ভেঙ্গে যায়, সামনে শুধু অন্ধকার দেখেন, মনে করেন আপনার অন্তরে মরিচা পড়ে গেছে, তবে কুরআন পড়ুন ; পড়তে না পারলে তিলাওয়াত শুনুন। শান্তি পাবেন। আল্লাহ আপনাকে পৃথিবীতে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। সেই দায়িত্বের বিবরণ দিয়েছেন কুরআনে পাকের মধ্যে। আপনি যদি মুসলমান হয়েও সেই কালাম পড়তে না শিখেন, বুঝতে না শিখেন তার মধ্যে কী আছে, তাহলে এটা কি দুর্ভাগ্য নয়? * এখন অনলাইনেও অনেকে কুরআন ও কুরআনিক আরবি শিক্ষা দেন। একটু খোঁজ নিলেই কাউকে পেয়ে যাবেন।

আশরাফ আলী থানবি : ব্যক্তি ও প্রভাব গতপরশু ছিল আশরাফ আলী থানবির তিরাশিতম মৃত্যুবার্ষিকী। শাহ ওয়ালি উল্লাহ-এর পরে, গত দেড়শ বছরে, দক্ষিণ এশিয়ায় আশরাফ আলী থানবিই ছিলেন হয়তো সবচেয়ে বড় আলেম। প্রভাব ও উৎপাদনে তার ধারেকাছেও সহজে কেউ যেতে পারবে না। একটা ছোট দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টা আরও ভালোভাবে ধরতে পারবেন, তকি উসমানীর প্রসিদ্ধি-প্রভাব এখন দুনিয়াব্যাপী। তবে তার লেখাজোখা একটু গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়লে মনে হবে, তিনি মূলত থানবির বক্তব্য-ব্যাখ্যা সহজভাষায় উপস্থাপন করেছেন। তকি উসমানী নিজেও এই বিষয়টি বিভিন্ন জায়গায় স্বীকার করেছেন। তাসাউফ সংকলন-পরিমার্জনে থানবির ভূমিকার কোন তুলনা হতে পারে না। জালালুদ্দিন রুমির ওপর তিনি প্রায় সাত আট হাজার পৃষ্ঠার বিশাল ব্যাখ্যাগ্রন্থ লেখেছেন। আল্লামা ইকবাল এক চিঠিতে লেখেন, রুমির বিষয়ে আশরাফ আলী থানবিই সবচেয়ে বড় জীবন্ত অথরিটি । থানবি কুরআন-হাদিসের আলোকে তাসাউফকে উপস্থাপন করেছেন। একজন সূফী সাধক কীভাবে মুরিদদের সংশোধন করেন, তার নমুনা মিলবে তরবিয়াতুল সালিকিনে। আমি জুনায়েদ বাবুনগরির কাছে কিতাব পড়ার বিষয়ে পরামর্শ চাইলে তিনি আত তাকাসশুফ ও আত তাশাররুফ পড়ার কথা বলেন। বস্তুত এই দুই কিতাবে তাসাউফের সারকথা চলে এসেছে। কুরআন বিষয়েও থানবির বিশেষ আগ্রহ ছিল। গত শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাফসীরের একটি বয়ানুল কুরআন। দেওবন্দি ধারায় লিখিত পরবর্তী তাফসীরগুলো মূলত বয়ানুল কুরআনের ছায়া অনুবাদ। উলুমুল কুরআন ও তাজবিদ বিষয়েও তার বেশকিছু কিতাব আছে। ফার্সি ও উর্দুতে রচিত পূর্ববর্তী অনুবাদে কোথায় কোথায় ত্রুটি আছে, সে বিষয়ে তিনি বেশকিছু রিভিউও লেখেন। থানবি ইলমে কেরাআতের বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এখন রুকইয়া-চিকিৎসার বহুল প্রচলন ঘটেছে, থানবি কুরআনি চিকিৎসা নামে আমালিয়াত বিষয়ে একটা নতিদীর্ঘ বই লেখেন। ইলমে কালামে থানবির অবদান কোন অংশে কম নয়। আল ইনতিবাহাতুল মুফিদা গতশতকের আলোচিত কালামি কিতাবের একটি। ইউটিউবে সার্চ করলে অনেক আরব শায়েখের দরস পেয়ে যাবেন। পাশাপাশি সমকালে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোও তিনি উত্তর দানের চেষ্টা করেছেন, একাধিক সংকলন বের হয়েছে। যুক্তির আলোকে ধর্মীয় বিধিবিধান তুলে ধরেছেন। ফিকাহে তার দক্ষতা ও প্রভাব তুলনাহীন। উসুলে ফিকাহ ও ইফতা বিষয়ক লেখাজোখা এখন সংকলিত হয়েছে, ফতোয়া প্রকাশিত হয়েছে ছয় খণ্ডে। ই’লাউস সুনান ও আহকামুল কুরআন রচিত হয়েছে তার নির্দেশনায়। আশরাফ আলী থানবির সবচেয়ে বড় অবদান হয়তো রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বে (Political theology)। পাকিস্তান তত্ত্বের রাজনৈতিক পরিগঠন হয়েছে ইকবাল-জিন্নাহের হাত ধরে, ফিকহি কাঠামো দান করেছেন আশরাফ আলী থানবি। শুধু তাই নয়, আলেম সমাজের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কেমন হবে, তারা কতটুকু স্বতন্ত্র থাকবেন, কতটুকু সম্পর্ক রাখবেন, এই বিষয়েও থানবি বিশদ ব্যাখ্যা দান করেছেন। এভাবে রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বেও তার ভূমিকা অপরিসীম। যদি এক কথায় বলতে চাই, তাহলে বলতে হবে উপমহাদেশে ‘ট্র্যাডিশন’ এর বর্তমান কল্পনা ও কাঠামো অনেকটাই থানবির তৈরি। তবে আপনারা যারা সালাফ-আকাবিরদের লেখা পড়ে অভ্যস্ত নন, তারা আশরাফ আলী থানবি থেকে উপকৃত হতে পারবেন না। একই কথা তকি উসমানী লেখলে ধরতে পারবেন, থানবি লেখলে বুঝতে কষ্ট হবে। কেননা থানবি আধুনিক রুচি-ভাষা-রচনাশৈলী অনুসরণ করেননি। প্রি-মডার্ন যুগের লেখালেখি হজম করা একটু কঠিন। খোদ আবুল হাসান আলী নদবীর মতো ব্যক্তিত্বকেও এই সমস্যায় পড়তে হয়েছে। যুবক বয়সে তিনি সাধারণত আরব ও পশ্চিমা ধারার লেখা পড়ে অভ্যস্ত ছিলেন। ইতিহাস, দর্শন ও সমাজতত্ত্ব তাঁকে টানত বেশী। তিনি মুজাদ্দিদে আলফে সানির রাসায়েল পড়তে আগ্রহ বোধ করতেন না। বড় ভাইয়ের অব্যাহত চাপে তিনি একসময় রাসায়েল পড়েন, তার সামনে একটি নতুন জগত খুলে যায়। সালাফ-আকাবিরদের লেখায় অভ্যস্ত হতে সময় লাগবে, এতে দোষের কিছু নেই। যত্ন ও চেষ্টা ছাড়া কোনকিছুই সম্ভব নয়।

ব্লু মসজিদ, সেলাঙ্গর রাজ্যের প্রধান মসজিদ। মসজিদের পাশেই বহুতল বিশিষ্ট শরিয়া আদালত ও ইফতা বিভাগ অবস্থিত।
ব্লু মসজিদ, সেলাঙ্গর রাজ্যের প্রধান মসজিদ। মসজিদের পাশেই বহুতল বিশিষ্ট শরিয়া আদালত ও ইফতা বিভাগ অবস্থিত।

থানবির রাজনীতি চিন্তা নিয়ে কিছু কথা আশরাফ আলী থানবি (রাহঃ) আলেমদের 'আলেম' হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার বিরোধী ছিলেন। তার মতে ইলম-আমল-ওয়াজ-নসিহতে সময় দেওয়াই আলেমদের প্রধান কাজ—পাশাপাশি বিরাজমান সকলপক্ষের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যাওয়াও আলেমদের কর্তব্য, প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নামলে সেটিও অসম্ভব হয়ে যাবে। এগুলোকে ধর্মীয় সিদ্ধান্ত মনে করার কোন কারণ নেই, বিষয়গুলো থানবির নিজস্ব ইজতিহাদ—খোদ থানবিধারার অনেক আলেম এসব সিদ্ধান্তে একমত হননি। তবে আপনি একমত হন বা দ্বিমত পোষণ করেন—আমার মনে হয়, থানবি সাহেবের মতামতগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবা দরকার। কেননা প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে না জড়ালেও আলেম/ইসলামি স্কলারদের মধ্যে পাকিস্তান আন্দোলনে থানবির ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ প্রতিদিন মুখে 'রাজনীতি' 'রাজনীতি' জপতে থাকলেই প্রয়োজনের সময় আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন, সেটার কোন নিশ্চয়তা নেই। থানবি মূলত 'ধর্মভিত্তিক' রাজনীতির বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, রাজনীতি বিশেষ দক্ষতা-মনোযোগের বিষয়। যারা এসব দক্ষতা-মনোযোগে অভ্যস্ত নন, থানবি তাদেরকে প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে জড়াতে নিষেধ করতেন। পাশাপাশি, মুসলমান ফাসিক-ফুজ্জার হলেও রাজনীতিতে তারাও আপনার সমান মর্যাদার অধিকারী। 'আলেম/প্রাকটিসিং' বলে আপনি আলাদা করে বিশেষ গুরুত্ব পাবেন না। থানবির বক্তব্য ছিল, রাজনীতিকে আইডোলজিতে রুপান্তর করার বিপদ অনেক বড়। এতে একদিকে মানুষ রাজনীতিকে 'ধর্মীয় আমল' বলে মনে করবে, পাশাপাশি 'ধর্মীয় আমলের' দোহাই দিয়ে অযোগ্য-অদক্ষ ধার্মিকরা রাজনীতি করতে শুরু করবে। একপর্যায়ে মাদরাসা-খানকাও আলেমদের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। আপনি থানবির সাথে দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন, তবে তার বক্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার কোন সুযোগ নেই। মনে রাখবেন, থানবি প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে অংশ না নিলেও আলেম/স্কলারদের মধ্যে ভারতভাগের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ছফার 'বাঙালি মুসলমানের মন' : কী ও কেন? ক) জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান পাল্টে দেয় অনেক হিসাব-নিকাশ। বাঙালি জাতিবাদী/বামপন্থীরা অনেকটা হতভম্ব হয়ে যান। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই ছিয়াত্তর সালে আহমদ ছফা বাঙালি মুসলমানের মন প্রবন্ধটা লেখেন। বাঙালি মুসলমানরা কেন জাতিবাদী ধারায় না গিয়ে ধর্মীয়ধারায় ঝুঁকে পড়ল, আহমদ ছফা সে নিয়ে বিরক্ত ও বিব্রত ছিলেন। এই প্রেক্ষাপট দেখে বলা যায়, লেখাটা ছিল প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রোপাগান্ডামূলক। খ) ছফা এই লেখায় ধর্মের সাথে সমাজ-রাজনীতির সম্পর্ক বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছেন। এটাই মূলত লেখার মূল থিসিস। তিনি মনে করতেন, বাঙালিরা নির্যাতন থেকে বাঁচতে ধর্মত্যাগ করেন, এই মনন-চৈতন্য থেকেই তারা ইসলামগ্রহণ করেছেন। কিন্তু ইসলাম তাদেরকে মাঝে মাঝে রাজনৈতিকভাবে উত্তেজিত করতে পারলেও সামাজিক-বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি দিতে পারেনি, নীচুতলার বাঙালি মুসলমানরা থেকে গেছেন ঠিক আগের ‘সামাজিক’-’বুদ্ধিবৃত্তিক’ শ্রেণীতেই। এখানে এসেই ধরতে পারবেন, ছফার থিসিসটা প্রথাগত বাম-জাতিবাদী চিন্তার সিলসিলা। গ) কেন বাঙালি মুসলমানরা বাম-জাতিবাদী সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনকে গ্রহণ করলো না, স্বাগত জানালো না, আহমদ ছফা এই প্রশ্ন না তুলে বলটা ঠেলে দিচ্ছেন বাঙালি মুসলমানের কাঁধেই। তিনি বলতে চাচ্ছেন, দায়টা প্রধানত বাম-জাতিবাদীদের নয় ; এটা মূলত বাঙালি মুসলমানদের সমস্যা। যেহেতু তারা গরীব, পিছিয়ে পড়া মানুষ, তাই তাদের মনন-চিন্তায় কোন উন্নতি ঘটেনি। ছফা আক্ষেপ করেন, ‘এক পা যদি এগিয়ে আসে, তিন পা পিছিয়ে যেতে হয়। মানসিক ভীতিই এই সমাজকে চালিয়ে থাকে। দু-বছরে কিংবা চার বছরে হয়তো এ অবস্থার অবসান ঘটানো যাবে না, কিন্তু বাঙালি মুসলমানের মনের ধরন-ধারণ এবং প্রবণতাগুলো নির্মোহভাবে জানার চেষ্টা করলে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ হয়তো পাওয়াও যেতে পারে।’ ঘ) বাঙালি মুসলমানের মন প্রবন্ধের কয়েকটি বিশেষ দিক : * পুথিসাহিত্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন, অথচ এটি ছিল অনেক গৌণ বিষয়। পাশাপাশি বিকল্প পুথিধারাগুলোর কথা এড়িয়ে গেছেন। * ব্রিটিশ আমলে দারিদ্রের প্রেক্ষিতে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে যে মনস্তাত্ত্বিক নীচতা তৈরি হয়েছিল, ছফা একে বাঙালি মুসলমানদের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেছেন, যেটি অত্যন্ত হতাশাজনক। * তৎকালীন ধর্মীয় চিন্তা-সংস্কৃতিকে কোনভাবেই গুরুত্বের চোখে দেখেননি ; আশরাফ বা উর্দুভাষী সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দিয়েছেন। * আরবে ইসলাম উন্নত সভ্যতার জন্ম দিয়েছে, পাশাপাশি পুথিসাহিত্যে ইসলামের অনেক বিকৃতি ঘটেছে। ছফা অবশ্য এই দুটি বিষয়ের স্বীকৃতি দিয়েছেন।

কওমি মাদরাসায় রাজনীতি মোল্লা ওমর তালিবানের কার্যক্রম শুরু করার সময় বিভিন্ন মাদরাসায় যান। ছাত্রদের সাথে কথা বলেন। ছাত্ররা তাকে বলেন, তারা শুক্রবারে ও পরীক্ষার ছুটিতে সময় দিতে আগ্রহী। এই কথাটা আমার যতবার মনে হয়েছে, ততবার হাসি চেপে রাখতে পারিনি।