fa
Feedback

فریب کلاهبرداران را نخورید! تل‌متریو این کانال‌ها را شناسایی و برچسب‌گذاری می‌کند 👉 برای مشاهده برچسب، اشتراک تهیه کنید

Iftekhar Jamil

Iftekhar Jamil

رفتن به کانال در Telegram

একজন তালিবে ইলমের দিনলিপি-মুজাকারা-রিভিউ

نمایش بیشتر
9 231
مشترکین
+224 ساعت
-77 روز
-3430 روز
آرشیو پست ها
কলকাতা ও ঢাকার সাহিত্য কলকাতাকেন্দ্রিক শিল্প-সাহিত্যের প্রধানবিন্দু হিন্দু অন্টলজি-ওয়ার্ল্ডভিউ। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী বাংলা সাহিত্যের প্রধান শিল্পকর্মের একটি, পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায় একে চলচিত্রে রুপান্তর করেন—এখানে কাহিনী গড়ে ওঠেছে এক ব্রাহ্মণ পুরোহিত পরিবারকে কেন্দ্র করে, কীভাবে ব্রাহ্মণ ভদ্রলোকরা আধুনিকতা এক্সপ্লোর করছেন, ব্রাহ্মণ-আধুনিক ভদ্রলোকির বিন্দু যেভাবে মিলে যায়—এটাই এই উপন্যাসের প্রধাম থিম। এখন, আমাকে বলেন, এই মানের কোন উপন্যাস-চলচিত্র কি ঢাকাতে রচিত- নির্মিত হয়েছে? অবশ্যই হয়েছে, হুমায়ূনের বিকল্প সমকালীন বাংলা সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তিন গোয়েন্দার জনপ্রিয়তার কথা বলতেও ভুলবেন না। কিন্তু হুমায়ূন-সেবা প্রকাশনীরা কেউই ইসলামি অন্টলজি-ওয়ার্ল্ডভিউকে এক্সপ্লোর করতে চাননি। দেখেন, অবজেক্ট হিসেবে ইসলাম-মুসলমানদের তুলে ধরতে বলছি না, আপনি আপনার চরিত্রকে একটা টুপি-পাঞ্জাবি পরিয়ে দিলেন, মাদরাসা-হুজুরদের কথা লেখলেন, পত্রিকায় ধর্মপাতার জায়গা করে দিলেন, টিভিতে হুজুরদের নিয়ে আসলেন—তাতে কি সাবজেক্টিভিটির দাবী পূরণ হয়ে যাবে? আপনি যখন ইসলাম-মুসলমানদের অবজেক্ট-অবজেক্টিভিটির জায়গা থেকে কল্পনা করেন, তখন আপনি আসলে নিজের কথাই ভুলে যান। জাতি চুলায় যাক, আপনার কী হবে, আপনার নিজস্ব জটিলতা-টানাপড়েন-ট্রান্সজিশনের গল্পটা বলবে কে? সবচেয়ে বড় কথা, এসবের মধ্যে আপনি কীভাবে আপনার অন্টলজি-ওয়ার্ল্ডভিউ এক্সপ্লোর করছেন, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি নিজেকে যেভাবে কল্পনা করছেন, সেটা পড়ুক লোকজন, রিইমাজিন করুক নিজেদেরকেও। এছাড়া ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্প-সাহিত্য কখনোই বিশ্বদরবারে জায়গা করে নিতে পারবে না।

ইসলাম ও মানবসেবা পরিচিত এক ভাই দক্ষিণ ভারতে গেলেন কিছুদিন আগে, তিনি এক আশ্চর্য গল্প বললেন। 'দক্ষিণ ভারতে মসজিদের সামনে হিন্দু মহিলারা দাঁড়িয়ে থাকে, মুসল্লিদের থেকে দোয়া নেয়, মুসুল্লিদেরকে বরকতের 'ফুঁ' দিতে বলে।' এই ছোট ঘটনা থেকে ভারতীয় মুসলিম ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে অনেককিছু আন্দাজ করা যায়। আবুল হাসান আলী নাদাবি লেখেছেন, আগে প্রতিটা পীরের দরবারে বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করা হত। প্রতিবেলা হাজারের বেশী মানুষ খাবারে অংশ নিতেন, হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে ভেদাভেদ করা হত না। নিজামুদ্দিন আওলিয়া এক বয়ানে বলেন, মানুষের মনে শান্তি দেবার মতো সাওয়াবের কাজ আর কিছুই হতে পারে না। নাদাবি লেখেন, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলের আধ্যাত্মিক-মানসিক-সামাজিক কল্যাণ কামনাই ছিল সূফীদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যে লোক আপনাকে খাবারের সাহায্য করছে, মনে প্রশান্তি যোগাচ্ছে, তার সামান্য কথা আপনার মনে অনেক বড় প্রভাব ফেলবে। তবে খাবার-প্রশান্তিদানকে নিছক কৌশল হিসেবে দেখা অনুচিত। আপনি আল্লাহর বান্দাকে খাবার দিচ্ছেন, আপনি ধর্মীয় কাজই করছেন। নাদাবি দেখান, সুফি-দরবেশদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হচ্ছে, তারা ভারতে বিপুল পরিমাণ গাছ রোপণ করেন। আপনার গাছে যদি কোন পথিক আনন্দ পায়, তবে আপনি সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন না। এখানে একটা নোট দিয়ে রাখা জরুরি। আধুনিককালে অনেকে 'মানবসেবা'কে সেকুলার অর্থে গ্রহণ করেন। ইসলামি কাজকে নিছক মানবসেবায় সীমিত করতে চান। বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষের মনে বস্তুবাদ জায়গা করে নিলে সে কখনোই মানবসেবাকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করবে না। আপনি যদি ঈমান-আকিদার গাছ কেটে দেন, তবে আগামীকাল আপনি মানবসেবার ফলাফলও ভোগ করতে পারবেন না। আল্লাহ আমাদেরকে 'গাছহীন ফল ও ফলহীন গাছে' পরিণত না করুন। ( গাছ : ঈমান-আকিদা। ফল : মানবসেবা)

ইউনিভার্সিটি মালায়, যে পথটা ধরে প্রতিদিন হাটি
ইউনিভার্সিটি মালায়, যে পথটা ধরে প্রতিদিন হাটি

লিটলম্যাগ কর্ণারে। বিদেশ সফরের আগে তুলেছিলাম। লিটলম্যাগ সংস্কৃতি সাহিত্য-চিন্তাচর্চার প্রাথমিক পর্ব। যেমন আমি এখন নিজেকে লিটল
লিটলম্যাগ কর্ণারে। বিদেশ সফরের আগে তুলেছিলাম। লিটলম্যাগ সংস্কৃতি সাহিত্য-চিন্তাচর্চার প্রাথমিক পর্ব। যেমন আমি এখন নিজেকে লিটলম্যাগ চর্চার অংশ বলে মনে করি না—যদিও উদ্যোক্তারা অধিকাংশই আমাদের ছোটভাই পর্যায়ের। লিটলম্যাগ কর্ণারে গিয়ে আমার মাথায় বারবার একটা প্রশ্নই এসেছে—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কি লিটলম্যাগকে গবেষণা/সাহিত্য পত্রিকায় রুপান্তরিত করতে পারবে? আমি এখন যে ডিপার্টমেন্টে পড়ছি, তারা দুটো জার্নাল বের করে। একটা স্কোপাস, আরেকটাও শীঘ্রই একই স্ট্যাটাস অর্জন করবে। স্বপ্ন-ডিসিপ্লিন সফলতার প্রথম ধাপ

হেফজখানায় আমার হাফেজ হবার জার্নিটা মোটেই সহজ ছিলো না। ছোটবেলায় লোকজন আমাকে ‘খুব মেধাবী’ মনে করত, আমার বোন হাফেজ হয়েছিলেন তিন-চার মাসে, কাজেই সবাই ভেবেছিল আমিও খুব সহজে হাফেজ হয়ে যাবো। প্রথম দু’দিনে এক পৃষ্ঠা শেষ করলাম, তৃতীয়দিন সারাদিন পড়েও দুই লাইনের বেশী মুখস্ত করতে পারলাম না। তৃতীয়-চতুর্থ দিনেও একই অবস্থা—সহপাঠীরা ততদিনে অনেকটা এগিয়ে গেছে। আমি খানিকটা ভেঙে পড়লাম। বাসায় গিয়ে আম্মাকে বললাম, ‘আম্মা আমি হাফেজ হইতে পারতাম না’। কথাটা শুনে আম্মা সাথে সাথে কান্না করে দিলেন। কান্না দেখে আমি নিজেকে সামলে নিলাম—একটা কঠিন লড়াইয়ে নেমে গেলাম, এগুতে লাগলাম কচ্ছপের গতিতে। কোনদিন সবক দেই তিন লাইন, কোনদিন চারলাইন দিতে গিয়ে আটকে যাই। আমার বয়স তখন কত? ছয়-সাত বছরের মত। রাতে ঘুমাই বাসাতেই, ফজরের ঘন্টাখানেক আগে ঘুম থেকে উঠি—আমার সাথে সাথে উঠেন বাবা-মা-বোন। আমি তিন-চার লাইনের সবক একে একে তাদের তিনজনকেই শুনাই। কোনদিন সবক ইয়াদ না হলে বাবা হুজুরকে বলেন, ‘জামিল অসুস্থ, আজকে সবক শোনাতে পারবে না।’ এভাবে দুইপারা শেষ হল, তৃতীয় পারা থেকে আধা পৃষ্ঠা সবক দিতাম, ষষ্ঠ পারা থেকে এক পৃষ্ঠা, আট-নয় পারা হতেই সেটা দুই-তিন পৃষ্ঠায় পৌঁছল। আমি একে একে প্রায় সকল সহপাঠীকেই ধরে ফেললাম। আমি হাফেজ হলাম একদিন দুপুরবেলা, বারোটার দিকে। বিশ পারা শেষপৃষ্ঠার সবক। শেষ করতেই হুজুর বললেন, ‘দেরী করতেছোছ কেন, তাড়াতাড়ি বাসায় যা। মিষ্টি খাওয়াতে বল।’ আম্মাকে বললাম, আম্মা আপনার ছেলে সবক শেষ করেছে। আম্মা সেই প্রথমদিনের মতই কিছু বললেন না। কান্না শুরু করলেন। মহিলাদের এই এক অভ্যাস, তারা শুধু কান্না করেন। কুরআন শরীফ খুললে, পৃষ্ঠার দিকে তাকালে আপনারা কী দেখেন—অক্ষর, লাইন, আয়াত? আমরা দেখি কোনদিন কত পৃষ্ঠা সবক দিয়েছিলাম, কোথায় মাইর খেয়েছিলাম, কোন আয়াতে সবকের লুকমা। ঊনত্রিশ-ত্রিশ পারার পৃষ্ঠা খুললে সেই বালক ছেলেটার কথা মনে হয়, যে সারাদিনেও তিন-চার লাইন মুখস্ত করতে পারছে না।

চট্টগ্রামের মাদরাসা-ট্র্যাডিশন চট্টগ্রামের মাদরাসাগুলোর একটা নিজস্ব জগত আছে, নিজস্ব ইতিহাস আছে—এটা ঢাকার লোকজন কখনোই বুঝতে চেষ্টা করেননি। সারাদেশে চট্টগ্রামের সাথে সংযুক্ত মাদরাসার সংখ্যা মোটেও কম নয়। লেখক ইমরান রাইহান শিক্ষাজীবনের শেষ কিছুদিন চট্টগ্রামে কাটিয়েছেন, তিনি মাঝে মাঝে আমাদেরকে চট্টগ্রামের মাদরাসাগুলোর গল্প বলেন। আমি তাকে এ নিয়ে উপন্যাস লেখতে অনুরোধ করছিলাম। বৈচিত্র্যকে শক্তি হিসেবে দেখলেই কিন্তু ভালো, যদি একে বিভক্তির উপাদান বানিয়ে ফেলেন, তবে বিপদের শেষ নেই। সিলেবাস দশ রকমের হলে কি কোন অসুবিধা আছে? আমার মতে এতে কোন অসুবিধা নেই—তবে মাঝে কিছু ব্রিজ তৈরি করে দিতে হবে। যেন মাঝামাঝি পর্যায়ে এক সিলেবাস থেকে অন্য সিলেবাসে জাম্প করা যায়। শিক্ষাকে কল্পনা করুন নদী হিসেবে—যদি একটা দেশে দশ রকমের নদী থাকে তাহলে কি কোন অসুবিধা আছে? তবে প্রতিটা নদী যেন একে অপরের সাথে সংযুক্ত থাকে। নয়ত এক নদী শুকিয়ে খাল হয়ে যাবে, পলি জমে আরেক নদীতে বন্যা নামবে—বিভক্তিতে নষ্ট হবে পরিবেশ-বৈচিত্র্য। যদি মাদানি নেসাবে আরবি ভালো হয়, চট্টগ্রামে ফার্সি-উর্দু চর্চা বেশী হয়, ঢাকাতে এসে যদি মানুষের মধ্যে সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধি পায়, তাহলে একে কি কখনো খারাপভাবে কল্পনা করা যায়? আমার খালু হাটহাজারিতে পড়েছিলেন, ‘আমি ইকবালের পুরো বাঙ্গে দারা দরসে হুজুরের মুখ থেকে শুনে শুনে লেখে ফেলেছিলাম’, তিনি একদিন গল্পচ্ছলে বলছিলেন। চট্টগ্রামের মুফতি কেফায়েতুল্লাহ সম্ভবত বর্তমানে দেশের প্রধান ইকবাল গবেষক—তিনি কথায় কথায় ইকবালের উদ্ধৃতি দিতে পারেন। আমি যদি ভুল না করি, তবে মেখল সম্ভবত এখনো ফার্সিশেখার ক্ষেত্রে দেশের প্রধান প্রতিষ্ঠান। তাদের উর্দুর উচ্চারণটাও নিজস্ব—ঢাকার তরুণরা তো এখন উর্দু বলতেই জানেন না। মুফতিয়ে আজম হাদিস-বিদআত বিষয়ে কিছু নিজস্ব ইজতিহাদ ধারণ করতেন, তার হাতে গড়া হাতিয়ার সিলসিলাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। কিছু মাদরাসা গড়ে ওঠেছে প্রত্যন্ত গ্রামে, তারা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন না, ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে থাকেন। ইউ সি—এসব বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানতে কি আপনাদের কখনো আপ্লুত লাগে না? যারা এসব বৈচিত্র্যকে বিভক্তিতে রুপ দিচ্ছে, আল্লাহ তাদের হেদায়েত দান করুন

কাদিয়ানী প্রশ্ন : কীভাবে ডিল করবো? কাদিয়ানি ইস্যুটা এখন মোটেই ধর্মতাত্ত্বিক বিষয় নয়, আইনি কমনসেন্সের বিষয়। দেখেন, বাংলাদেশি মুসলমানদের কোন অংশ কি কাদিয়ানিদের নিজেদের অংশ মনে করেন? করেন না। কাজেই, তাদেরকে ডিসকারসিভ ট্রেডিশনের জায়গা থেকে ‘মুসলিম’ বলার সুযোগ নেই। মনে রাখা ভালো, সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের মুসলমানরা বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক, কেবল মসজিদের সংখ্যাই চার লাখের মত। মাদরাসা-কবরস্থানের মত সম্পদও অসংখ্য। কার্যত কাদিয়ানিরা কি এসব সম্পদ ব্যবহার করতে পারে? পারে না। আমরাও কাদিয়ানিদের প্রোপার্টি ইউজ করতে পারি না। যদি তাই হয়, তবে বিদ্যমান স্থিতাবস্থাটাই একটা কমনসেন্স। এই স্থিতাবস্থাকেই আইনি ভাষায় প্রকাশ করা জরুরি। নইলে আপনি প্রোপার্টি রাইটস রক্ষা করতে পারবেন না। দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশের হুজুরদের একটা বড় অংশ আইনি আর্টিকুলেশনে আগ্রহী নন। আইনি উদ্যোগ ছাড়া এই জটিলতা কোনভাবেই সমাধান সম্ভব নয়। তারা মাঠেময়দানে আটকে থাকবেন, নির্বাচিত ফুটেজগুলো চলে যাবে দূতাবাসগুলোতে। বিদেশি পত্রিকায় প্রতিবেদন আসবে, ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা হুমকির মুখোমুখি’। দিনশেষে আইনি কমনসেন্সের আবেদনটাও হারিয়ে যাবে। তাহলে করণীয় কী? সভা-সেমিনার-রিসার্চ-মামলা। ঠিকমত ফান্ডিং করা গেলে একটা আইনি টিমের পক্ষে দশ বছরের মধ্যে একটা ফলাফল নিয়ে আসা সম্ভব।

রাবীন্দ্রিক মুসলমান সৈয়দ মুজতবা আলী ছিলেন ‘রাবীন্দ্রিক মুসলিম’, পড়েন বিশ্বভারতীতে, ঠাকুরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে বইটা গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা-উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে : রাবীন্দ্রিক মুসলিমের চোখে কাবুল দর্শন। তিনি সংস্কৃত ঘনিষ্ঠ বাংলার সাথে বাংলাদেশি বাংলার মেলবন্ধন ঘটাতে চেষ্টা করেন, হিন্দু ধর্মতত্ত্ব-কল্পলোকের পাশাপাশি ইসলামি কল্পলোকের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন অবাধে : তবু বাংলাদেশি বাংলার সাথে দূরত্ব কাটেনি, সাধারণ শিক্ষিত কারো পক্ষে মুজতবা আলীর লেখায় ভালোভাবে দাঁত বসানো খানিকটা কঠিন। মুজতবা আলী আফগান মৌলবিদের প্রতি বিরক্ত ছিলেন। রাশান সমাজতন্ত্র-পশ্চিমা সভ্যতার প্রতি তার আগ্রহের দিকটা কখনোই লুকিয়ে রাখতে পারেননি। কাবুল মুলুকে তার সাথে ছিলেন শান্তিনিকেতনের এক হুজুর, মৌলানা জিয়াউদ্দিন। ঠাকুর হুজুরকে নিয়ে কবিতাও লেখেছেন। এই ‘মৌলানা’ও ছিলেন একজন ‘রাবীন্দ্রিক মুসলিম’। শান্তি নিকেতন ‘রাবীন্দ্রিক মুসলিম’দের মধ্যে কেমন পরিবর্তন ঘটিয়েছিল, সেটি আমাদের আগ্রহের বিষয় বলে বিবেচিত হতে পারে। এদের নিরীক্ষা চালালে আপনি ছায়ানট-চারুকলার মুসলমানদেরকে বুঝতে পারবেন সহজেই। কাবুল মুলুক নিয়ে সম্প্রতি বই লেখেছেন আল জাজিরার সাংবাদিক আহমদ ফালুদ্দিন। মুরিতানিয়ার এই লেখক পড়েছেন আমেরিকায়, পরবর্তীতে আল জাজিরার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ফালুদ্দিনের লেখায় ওঠে এসেছে কাবুলের মৌলবির শক্তি ও দুর্বলতা। আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন সৈয়দ মুজতবা আলী কেন ফালুদ্দিন হতে পারলেন না? উত্তরটা আদতে সহজ। ফালুদ্দিনের শরীরে ছায়ানটের ছায়া পড়েনি। আগেই লেখেছিলাম, ছায়ানটিদের কাছেও ‘ধর্ম’ গুরুত্বপূর্ণ নয়, তারা 'অসাম্প্রদায়িক'। তবে ছায়ানটি মুসলমানরা সবাই ‘রাবীন্দ্রিক মুসলিম’ : এদের কল্পনা-সুর-রুচি-আবেগ-আকাংখা সবকিছুই রবীন্দ্র জগতের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। এরা হয়ত মুসলিম, তবে রাবীন্দ্রিক মুসলিম

দ্বীনী ভাই ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্কের বাইরে দ্বীনী ভাই নামে একটি স্বতন্ত্র সম্পর্কের ওপর অত্যন্ত জোর দিয়েছে। আনসার-মুহাজির সাহাবাদের জীবন দেখলেই এটি ধরতে পারবেন। ইমাম গাজালি ইহয়ায়ে উলুমিদ দ্বীনের মধ্যে এ নিয়ে সম্পূর্ণ একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় বরাদ্দ করেছেন। কখনো সময় করতে পারলে পড়ে দেখবেন। ইসলাম শুধু ব্যক্তির ইবাদত-আত্মশুদ্ধির কথাই বলে না, সামাজিক সম্পর্কের কথাও বলে। মানুষ সামাজিক জীব, একা বসবাস করতে পারে না। একাকী বসবাস করলে অনেক রকমের জটিলতা তৈরি হয়। আধুনিক সমাজে সম্পর্কগুলো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আমিও মাঝে মাঝে ভাবি, আমরা আত্মীয়তা-সামাজিক সম্পর্কে অনেক রকম অবহেলা করছি। ইসলাম একটা বিশাল ব্যাপার। শেখা ও জানার ব্যাপার। আপনি যাতে একাকী বোধ না করেন, ভুল-ত্রুটি থেকে বেঁচে থাকতে পারেন, সে জন্যই দ্বীনী ভাইদের সাথে থাকা ও সম্পর্ক রাখা অনেক জরুরী। আপনার আশেপাশে যারা আছেন, একই এলাকার, একই বিশ্ববিদ্যালয় বা সাবজেক্টে পড়েন, তারাই প্রধানত আপনার দ্বীনী ভাই হবেন। অনেকবেশী স্পেশাল-মেধাবী হতে হবে না। বরং অনেকক্ষেত্রে স্পেশালরা সম্পর্ক রাখতে জানেন না/ পারেন না।

ঢাবির ইসলামিক স্টাডিজ, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে কথা বলছিলাম। ছেলেপেলেদের চোখে স্বপ্ন খেলা করছিল—দেখে ভালো লাগলো। আমি এখন আর
ঢাবির ইসলামিক স্টাডিজ, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে কথা বলছিলাম। ছেলেপেলেদের চোখে স্বপ্ন খেলা করছিল—দেখে ভালো লাগলো। আমি এখন আর কওমি-আলিয়া-বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি না। ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি খানিকটা আলাদা হলেও মিলের দিকগুলোও তো কম নয়।

যে কারণে বর্তমানে ফতোয়া দেওয়া অনেক কঠিন আধুনিককালে বিভিন্ন কারণেই ‘ধর্মীয় অথরিটি’ ভেঙে পড়েছে। আলেম সমাজ, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্র—কার দায় কতটুকু, সেটা একটা ভিন্ন আলোচনা। অথরিটি ভেঙে পড়ার প্রেক্ষিতে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’। ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহু ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’র একটা সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন—الأمر إذا ضاق اتسع وإذا اتسع ضاق—মানে, পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে ছাড় দেওয়া হবে/হুকুম সহজ করে বলা হবে, পরিস্থিতি অনুকূল হলে কঠোরতা করা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই কাজটা কে করবে, কে কার অথরিটি মেনে নিবে? আশরাফ আলী থানবি রাহিমাহুল্লাহু বলতেন, মুসলমানের কাজকে যতদূর সম্ভব জায়েজ বলা উচিত। পাশাপাশি, আলেম/স্কলাররা যদি সবচেয়ে সহজ সমাধানের কথাই বলতে থাকেন, কৌশল/পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে সবকিছু জায়েজ বলেন, তবে মানুষ একসময় আরও সহজ সমাধান চাইবে, পুরো ‘ধর্মীয় ফ্রেমওয়ার্ক’ ভেঙে পড়বে—যদি সবকিছু জায়েজই হয়, তবে শরীয়তের দরকার নাই—নাকি? ‘অথরিটি‘ না থাকলে অসুবিধা কোথায়? একজন আলেম/মুফতি/মুরুব্বি পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে সহজ বিধানের কথা বললেন। আরেকজন এসে বলে বসবে, হুজুর তো শুধুই শিথিলতা করেন। অথবা, আলেম/মুফতি/মুরুব্বি পরিস্থিতি অনুকূল দেখে সংশোধনের চিন্তা করে ‘কঠোরতা’ প্রকাশ করলেন। তৃতীয়জন এসে ভাববে, ‘হুজুর এত কঠোরতা করেন কেন, এই যুগে কি এত কঠিন কথা মানা সম্ভব?’ অসুবিধাটা ধরতে পারছেন? ইসলাম কোন একরৈখিক বিষয় নয়—ছাড়টাও ইসলাম, কঠোরতাটাও ইসলাম। এখন, ধরেন ‘ফর্মাল কোন অথরিটি’ নাই, আপনি একটা দল/গোষ্ঠীর সমর্থক—আপনার দলের থেকে কেউ বেশী ছাড় দিয়ে ফেললে আপনি তার ‘ইসলাম’ নিয়েই প্রশ্ন তুলে বসবেন। আর যদি কেউ আপনার দলের চেয়ে ‘কঠিন এপ্রোচ’ গ্রহণ করে, আপনি বলবেন—‘হুজুররা ইসলামটাকে কঠিন করে ফেলল’। আমি ভদ্রদের কথাই বললাম, সমাজের একটা বড় অংশ যে অভদ্র—সেটা তো আমরা সবাই জানি। ইসলামকে দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার বিপদটা ধরতে পারছেন? কোন একক দল/গোষ্ঠীর পক্ষে ইসলামকে ধারণ করা সম্ভব নয়—এমন কোন অথিরিটির বিকল্প নেই, যারা রাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে গিয়ে জাতীয়-ধর্মীয় স্বার্থের কথা ভাবতে পারেন, প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। ঐতিহাসিকভাবে এই কাজটা করত আলেম সমাজ, আধুনিক রাষ্ট্র-ইসলামি দল মিলে আলেমদের অবস্থানকে দূর্বল বানিয়ে ফেলল। কিন্তু—গত কয়েক দশকে আমরা দেখলাম, দলীয়ভাবে ইসলামের অথরিটি ক্লেইম করার বিপদ অনেক। এখন সবাই স্বীকার করছে, ‘তারা শরীয়া করতে পারবে না’। রাষ্ট্র অনেক বডি-পলিসি করলো বটে, তবে ‘আলেম সমাজকে’ রিপ্লেস করতে পারলো না। মাঝে, আলেম সমাজের একটা বড় অংশ ভাবা শুরু করল, দলীয়-রাষ্ট্রীয় ইসলামের বিরোধিতা করাটাই তাদের কাজ। কি এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি

ফুকুয়ামার সংশয় ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা মূলত একটা খৃস্টান পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন, তার বাবা ছিলেন একজন ধর্মযাজক। তার পূর্বপুরুষরা জাপানে থাকতেই খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেন। ঠিক এ কারণেই হয়ত হিরোশিমা-নাগাসাকির বিপর্যয় ফুকুয়ামাকে বিশেষভাবে স্পর্শ করেনি। ফুকুয়ামার লিবারেলিজম তার গুরু হেগেলের মতই খৃস্টান ইউনিভার্সালিজমের সিলসিলা। হিস্ট্রি একরৈখিকভাবে চলতে থাকে, লিবারেল ডেমোক্রেসিতে মোক্ষ লাভ করে। বাংলাদেশে যেমন হেগেলের ভক্তপাঠক ফরহাদ মজহার ইসলামের মধ্যে ইউনিভার্সালিজম কেন নেই, কীভাবে 'ইসলামিক সার্বজনীনতা' কল্পনা করা যায়—এই প্রসঙ্গে তিনি ডিপলি বদারড। ফুকুয়ামা ইকুয়ালিটি চান, তবে সেটা লিবারেলিজমের শর্তে। যদি তাই হয়, চারদিকে যদি লিবারেলিজমের জয়জয়কার হয়, তবে কীভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা দখল করলেন—ইতিহাস কি একরৈখিক, চক্রকার, নাকি রেন্ডম?  যদি জ্ঞানব্যবস্থাই ভেঙ্গে পড়ে, তবে ফুকুয়ামা কীভাবে উত্তর খুঁজবেন? 

কয়েকদিন আগে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা নিউ ইয়র্ক টাইমসে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। লিবারেলিজম ও এন্ড অফ হিস্ট্রি থিসিসের পক্ষে সাফাই গাইলেও
কয়েকদিন আগে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা নিউ ইয়র্ক টাইমসে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। লিবারেলিজম ও এন্ড অফ হিস্ট্রি থিসিসের পক্ষে সাফাই গাইলেও তার নিজের মধ্যে এখন বেশকিছু অপরাধবোধ ও দ্বিধা কাজ করে, সেটা স্পষ্টভাবে ধরা যায়—তিনি কেন ও কীভাবে ইরাক যুদ্ধ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সমর্থন করলেন, তার কাছে এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই।   সাক্ষাৎকারের মাঝে বলে বসলেন, তিনি এখন এনলাইটেনমেন্টের নলেজ প্রোডাকশনে আগের মত বিশ্বাস রাখেন না— মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে যুক্তি থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না, আগে সিদ্ধান্ত ঠিক করে রাখে, তারপর যুক্তি সাজায়। বলাই বাহুল্য, এই কথা বললে প্রচলিত জ্ঞানব্যবস্থা প্রায় পুরোটাই ভেঙ্গে পড়বে। তার কথা শুনে আমি খানিকটা কৌতুকবোধ করলাম।

ঢাকায় সাংস্কৃতিক খানকা ঢাকায় বাম-লিবারেলদের অনেকগুলো নিজস্ব ‘খানকা-আস্তানা’ আছে। শহিদুল আলমের দৃক, আবু সাঈদের বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্র, ফরহাদ মজহারের প্রবর্তনা। ঢাকায় আমাদের এমন কোন সাংস্কৃতিক ‘খানকা-আস্তানা’ নেই। ইমরান রাইহানের সাথে একবার কথা প্রসঙ্গে ঠিক করেছিলাম ঢাকার বাইরে একটা স্পেস দরকার। আশেপাশে, কোন গ্রামীণ পরিবেশে। পরে ভাবলাম, আসলে স্পেসটা দরকার ঢাকায়। ছাদের পাশে একটা ছোট মসজিদ, কফিশপ, লাইব্রেরি ও সেমিনার স্পেস। আগামী দশ বছরের মধ্যে এমন কোন স্পেস দেখার সুযোগ হবে?

তুলনা মুসলমানরা যখন ইরাক জয় করেছিল, ঠিক একই সময়ে খ্রিস্টানরা ইংল্যান্ড দখল করতে শুরু করে। ইংল্যান্ডে তৎকালীন জাতি-উপজাতিদের কোন চিহ্নও অবশিষ্ট নেই। ইরাকের দিকে তাকান, খ্রিস্টানরাসহ প্রি-ইসলামিক যুগের বেশ কয়েকটি জাতির অস্তিত্ব এখনো টিকে আছে। আধুনিক রাষ্ট্রের ইতিহাস বাদ দিলে পার্থক্যটা আরও ভালোভাবে ধরতে পারবেন। দেখুন, এটা ইংল্যান্ডের একার সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-অস্ট্রেলিয়ায় উপজাতিদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন, স্পেনের ঘটনা তো সবাই জানেন। পশ্চিমা সভ্যতায় ধর্ম-ধর্মনিরপেক্ষতা উভয়েই সমানভাবে নিপীড়নমূলক। ফ্রান্স শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জুব্বা-পাঞ্জাবি-জামা-আবায়া জাতীয় কোন কাপড় পরতে দিবে না। তারা জনতার মধ্যে 'পার্থক্য' রাখতে চায় না, তারা একে প্রজাতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যা দেয়। একটু তলিয়ে দেখলেই ধরতে পারবেন, পশ্চিমা স্বাধীনতার ধারণা ডিপলি প্রবলেমেটিক। রাষ্ট্র দাবী করছে আপনাকে সে ফ্রিডম দিবে, ব্যক্তি 'স্বাধীনতার মোক্ষ' লাভ করবে। আমরা ভুলে যাই, পার্সোনাল ফ্রিডম বলে কিছু নেই। আপনাকে ঠিক-বেঠিক নির্ধারণ করে দিচ্ছে আপনার সোসাইটি-নরমস-কাস্টমস। আপনি যদি সোশ্যাল ফ্রিডম ক্লেইম না করতে পারেন, তবে ফ্রিডম বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। ফ্রিডম সেটাই যেটা আপনার পরিবার-সমাজ-ধর্মকে রাষ্ট্রের থাবাকে রক্ষা করতে পারে। পরিবার-সমাজ-ধর্মকে গুঁড়িয়ে দিলে আপনার অস্তিত্বই নাই হয়ে যায়। আপনার পরিচয় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায় : স্কুল-কলেজ চালাবে তারাই, তাদের শিক্ষাই আপনাকে গ্রহণ করতে হবে, বাজারও বিগব্রাদারের নিয়ন্ত্রণে, টিভিতে দেখবেন বিবিসি-সিএনএন মিলে আপনাকে জ্ঞান দিচ্ছে। আপনার মাথার মধ্যে বসে যাবে আরেকজন মানুষ, আপনি ফ্রিডম দিয়ে কি করবেন?

গতকাল আসমার ওআফকারে ফরিদুদ্দিন আত্তারের মানতিকুত ত্বইর নিয়ে একটা দুর্দান্ত আলোচনা দেখলাম। সুফী কবিরা কীভাবে ভাষা-রুপক-আত্মিক
গতকাল আসমার ওআফকারে ফরিদুদ্দিন আত্তারের মানতিকুত ত্বইর নিয়ে একটা দুর্দান্ত আলোচনা দেখলাম। সুফী কবিরা কীভাবে ভাষা-রুপক-আত্মিক-মনস্তত্ত্বিক সংগ্রাম কল্পনা করেন, মানতিকুত্ব তইর এর একটা ভালো দৃষ্টান্ত। ফরিদুদ্দিন আত্তার পাখিদের সভা-আলোচনাকে কেন্দ্র করে মানুষের নৈতিক ও মনস্তত্ত্বিক সংকট ও সমাধানের ব্যাখ্যা তুলে ধরতে চেয়েছেন। অনুষ্ঠান শেষে ডক্টর আহমারি আত্তারের তরিকা নিয়ে আপত্তি জানালেন। বললেন এমন সমাজবিমুখতার প্রেক্ষিতেই মুসলিম ইতিহাসে জড়তা নেমে আসে। নবীরা তো কখনোই সমাজকে ত্যাগ করেননি, আত্মশুদ্ধির প্রশ্নটা তাই সামাজ সংস্কারের বাইরে গিয়ে ধরা যাবে না। আমার আহমারির কথাটা আংশিক সত্য মনে হল, তবে আত্তারের দিকটা ধরতে চেষ্টা করছিলাম। মূল আলোচক আত্তারের তরফে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করলেন—সূফি আত্মশুদ্ধি কখনোই সমাজবিচ্ছিন্ন কিছু নয়। আত্মা শুদ্ধ হলে সেটা পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র সবখানেই প্রতিফলিত হয়।

গাজালির শেষজীবন গাজালি শেষ জীবনে ইলমে কালাম থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন, এই অনুমান ঠিক নয়। কেননা গাজালির জীবনের সর্বশেষ লেখা কয়েকটি বইয়ের মধ্যে একটি ছিল কালাম বিষয়ক। খোদ যখন গাজালি তৎকালীন ইলমি পরিমণ্ডলের প্রতি বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে যান, সেই বিচ্ছিন্নতার সময়েও গাজালি কালাম বিষয়ক বেশ কয়েকটি পুস্তিকা লেখেন। ফলে গাজালি একসময় কালাম পরিত্যাগ করেছিলেন, এমন অনুমান ভুল। এমন অনুমানে আসলে গাজালির তৎকালীন ইলমি পরিমণ্ডলের প্রতি বিরক্তির প্রকৃতি ও প্রবণতাই বুঝা যাবে না। গাজালি আল ইকতিসাদ ও ইলজাম, উভয় বইয়েই বলেছেন, ইলমে কালাম ঔষধের মতো, মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে অসুবিধা আছে। বিচ্ছিন্নতার সময়েই গাজালি তার অসামান্য পুস্তিকা কানুনুত তাবীল লেখেন। এর মাধ্যমে গাজালি যুক্তি বিষয়ে ইসলামী অবস্থানের মৌলিক সূত্রায়নের চেষ্টা করেছেন। গ্রীক যুক্তি ধারণায় বিরক্ত হয়ে গাজালির দোহাইয়ে খোদ যৌক্তিকতাকে অস্বীকার করাতে কোন ফায়দা নেই। তারচে বরং যুক্তির সীমাবদ্ধতা কী ও কোথায়, এটা বুঝার চেষ্টা করা উচিত। গাজালির তৎকালীন বিচ্ছিন্ন জীবনের মূল প্রণোদনা ছিল, ধর্মের প্রমাণ আর ধার্মিকতা এক জিনিস নয়। আপনি সত্য জেনেও লুকাতে পারেন। নৈতিকতা বর্জন করতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে যুক্তি আপনাকে সাহায্য করবে না। কেননা মানুষের মধ্যে বুদ্ধির পাশাপাশি প্রবৃত্তিও আছে। তাকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে যুক্তিতে কী হবে? এ জন্য ইহসান ও ইখলাস দরকার। গাজালি এ উদ্দেশ্যেই নির্জন-জীবন গ্রহণ করেছিলেন।

শরিয়া আইন-আদালত  শরিয়া আইন-আদালত কি অপরাধকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারবে? পারবে না। অশিক্ষা-দরিদ্রতা-অস্থিতিশীলতা-বেকারত্ব অপরাধ ডেকে আনবে—সেটাই স্বাভাবিক। ইউরোপে কেন অপরাধ কম? অনেকেই এই প্রশ্নটা করে বুঝাতে চান, ওরা সভ্য, আমরা অসভ্য। বিষয়টা কি এতটাই সরল? মূল পার্থক্য আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট। আপনি কাতার বা ব্রুনাইয়ের পর্যায়ে আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতা অর্জন করেন, আপনার দেশেও অপরাধ কমে যাবে। বরং আমাদের আর্থসামাজিক অস্থিতিশীলতার পেছনে ইউরোপিয়ানরাও কি খানিকটা দায়ী নয়? ওরা সম্পদ লুণ্ঠন না করলে, নিজেদের মত পলিটিকাল-জাস্টিজ সিস্টেম বসিয়ে না গেলে আমরা নিশ্চিতভাবে আরও ভালো থাকতাম। এতদিন পরেও কেন আমাদেরকে কলোনিয়াল জাস্টিজ সিস্টেম ফলো করতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ইউরোপিয়ান প্রভাবের দিকটা ধরতে পারবেন। শরিয়া আইন-আদালত অবশ্যই ইউরোপিয়ান জাস্টিজ সিস্টেম থেকে বেটার। কোন দিক দিয়ে? ইউরোপিয়ান জাস্টিজ সিস্টেম প্রধানত কলোনিয়াল প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয়েছে। কাজেই, এর মধ্যে পলিটিকাল উপাদান অনেক বেশী উপস্থিত। ইউরোপিয়ান জাস্টিজ সিস্টেমে মানুষকে গ্রেফতার করা খুবই সহজ, কারণ রাজারা-কলোনিয়াল মাস্টাররা মানুষকে ভয়ভীতির মধ্যে রাখতে ভালবাসত। তবে, ঠিক এ কারণেই কলোনিয়াল লিগাল সিস্টেমে জাস্টিজ নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন। আলোচিত মামলাগুলো বাদ দিলে অধিকাংশ কেসের কোন বিচার হয় না। জমিনের মামলা নিয়ে কেন বছরের পর বছর ঘুরতে হবে, সেটার উত্তরও কেউ দিতে পারবে না। ইয়েস, প্রক্রিয়াগত দিক থেকে শরিয়া আইন ও আদালত ইউরোপিয়ান সিস্টেম থেকে অনেক বেশী গতিসম্পন্ন, তবে সেজন্যই কিছু ঝুঁকির দিকও থেকে যায়। হয়ত দ্রুততার প্রেক্ষিতে কিছু মামলায় এদিক-ওদিক হতে পারে। সেজন্য হাইকোর্ট/মাজালিম কোর্ট অত্যন্ত জরুরী। তবে স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু শরিয়া কোর্ট/সালিশ ইন্ট্রিডিউস করা যেতে পারে। আমার ধারণা তাহলে ইউরোপিয়ান সিস্টেমের মনপলি প্রশ্নের মুখে ফেলা যাবে, খুব সহজেই। দারুল উলুম দেওবন্দের সফলতার শেষ নেই, তবে তারা তাদের প্রাথমিক পরিকল্পনার দুটি দিক কখনো বাস্তবায়ন করতে পারেনি—ক) বিকল্প আদালত, খ) বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা। আমার ধারণা বর্তমানে মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা এই ব্যর্থতার ইতিহাসটা জানেন না।

বাদশা আমানুল্লাহ আফগান বাদশা আমানুল্লাহ ইউরোপ সফর থেকে ফিরে আসলেন। তার চোখেমুখে মুগ্ধতা। তিনি ভাবলেন, বুরকা-নিকাব নিষিদ্ধ করতে হবে। পুরুষদেরকেও ইউরোপীয়ান পোশাক পরতে বাধ্য করতে হবে। নইলে শক্ত জরিমানা।কাবুলের মুচি-মজুর সবাইকেই কোট পরতে বাধ্য করা হয়। সে এক অদ্ভুত চিত্র—ঝাড়ুদার থেকে শুরু করে মুচি পর্যন্ত কোট পরতে শুরু করে। আমানুল্লাহ ভাবেন, এভাবেই প্রগতি-উন্নতি সম্ভব, কাপড়েই সকল সফলতা নিহিত। দেওবন্দি আলামদেরকে নিষিদ্ধ করা হয়, মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সে একশো বছর আগের কথা—সেই কাবুল এখন শাসন করে দাড়ি-টুপিওয়ালা শাসকরা। তালিবরা নারীদের জন্য জেনারেল শিক্ষার দরজা সংকুচিত করেছে—খুবই সত্য কথা: আফগান সেকুলার-কমিউনিস্টরা মাদরাসা বন্ধ করে দিয়েছিল, এটাও সমানভাবে সত্য কথা। তালিবদের কঠোরতার গল্পে ইতিহাসের এই দিকটা কেউ তুলে আনেন না।

আসাম ও কলকাতায় মাদরাসা শিক্ষায় নিষেধাজ্ঞা আমাদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল দু’টিতে কওমি শিক্ষার ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। কাজেই বৃদ্ধি পাচ্ছে আমাদের দায়িত্ব। কলকাতা বা আসামের কারো যদি শিক্ষা বিষয়ক পরামর্শ-রিসোর্স সংক্রান্ত হেল্পের দরকার হয়, আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আমি সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ।