es
Feedback
Iftekhar Jamil

Iftekhar Jamil

Ir al canal en Telegram

একজন তালিবে ইলমের দিনলিপি-মুজাকারা-রিভিউ

Mostrar más
9 328
Suscriptores
-724 horas
-197 días
-830 días
Archivo de publicaciones
আমাদের প্রধান সমস্যা আমাদের শিক্ষক আবদুল হামিদ যারুম মাঝেমাঝে বলেন, মুসলিম বিশ্বের প্রধান সমস্যা আমাদের যোগ্য নেতা নেই, এরদোগান-মাহাথিরের মতো নেতা প্রতিদিন জন্ম নেয় না। জনসমর্থনে আমরা কোনভাবেই পিছিয়ে নেই, তবে শুধু জনসমর্থনে বিশেষ লাভ হয় না, অনেকক্ষেত্রে বরং বোঝা হয়ে দাড়ায়। আপনি যদি নেতা না হন, তবে কখনোই নেতৃত্ব দাবী করবেন না, নবীজি আবু যর গিফারীকে এই পরামর্শই দিয়েছেন। যদি যোগ্য হন, তবে পিছিয়ে থাকবেন না, ইউসুফ (আঃ) এর মতো এগিয়ে যাবেন। আমাদের মেধা-যোগ্যতা কোনকিছুর অভাব নেই। অভাব নেতৃত্বের ; পুরনোদের মধ্যে যারা অযোগ্য, তারা সরে দাড়ালেই আগামীর নেতাদের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন আপনাকে যোগ্য নেতার অনুসরণের তৌফিক দান করেন। দেশ-দশের সাথে থাকার তৌফিক দান করেন। একাকিত্ব-ব্যক্তিবাদিতা আধুনিক রোগ, আল্লাহ আমাদেরকে এর থেকে হেফাজতে রাখুন।

ভয়াবহ সেই দিন : কাল্পনিক চিত্র
ভয়াবহ সেই দিন : কাল্পনিক চিত্র

‘ডে এক্স’ বাংলাদেশের প্রতিটা সামাজিক-রাজনৈতিক গোষ্ঠীর জন্য জাতীয় নিরাপত্তার দিকগুলো জানা অত্যন্ত জরুরী। আপনাদেরকে মোটেই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হতে বলছি না—তবে জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকিগুলো না বুঝলে আপনি কখনোই পলিসি মেইক করতে পারবেন না। কলেজের শিক্ষক কিশোরদেরকে স্বপ্ন দেখাতে পারবেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় জাতীয় নিরাপত্তা গুরুত্ব পাবে না, মাদরাসায় পড়ুয়া ছেলেটা আগামীতে এলাকার প্রধান খতীব হবে, ওয়াজের ময়দানে চষে বেড়াবে—জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুগুলো না জানলে খতীব-বক্তারা জনতাকে কীভাবে ‘সতর্ক’ করবে? মনে রাখবেন, বাংলাদেশের সামনে একটা ‘ডে এক্স’ (Day X) অপেক্ষা করছে। সেই সম্ভাব্যদিনে বাংলাদেশ বৃহত্তর কোন বৈদেশিক আক্রমণের মুখে পড়বে।সেনাছাউনিগুলো আক্রান্ত হবে। বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলো মুখ থুবড়ে পড়বে—জনজীবনে নেমে আসবে ছোটখাটো কেয়ামত।

বাবা দিবসে আমার বাবা কখনোই আমাদেরকে পড়াশোনার জন্য/সফলতার জন্য চাপ দেননি। আমাদের ফলাফল নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন বটে, তবে বাবার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক আমাদের সুস্থতা-ভালো থাকা, বাকি সবকিছুই গৌণ। আমি যদি আগামীকাল পিএইচডি ছেড়ে দেই, টানা দুই-তিন বছর বাসায় বসে থাকি, তবু তিনি কিছুই বলবেন না। বাবা কি একজন অসাধারণ মানুষ? জনপ্রিয় অর্থে তিনি অসাধারণ নন, ব্যাপকভাবে পরিচিতও নন। প্রবীণ আলেম; বিখ্যাত অনেকের শিক্ষক; আলেমরা আমার বাবাকে এক নামে চিনেন, তবে মধ্যবিত্ত-গ্রাম থেকে উঠে আসার প্রেক্ষিতে বাবার মধ্যে বিভিন্ন টানাপড়েন আছে, সীমাবদ্ধতাও আছে, সেটা অস্বীকার করা যাবে না। ভালো করে খেয়াল না করলে তার জীবনটা ভীষণ আটপৌরে : তিনি কখনোই কোন জটিল আলোচনায় ঢুকেন না, কারো সাথে রাজনৈতিক/বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ করেন না। মানুষের সাথে কথা বলেন হালকা চালে, জীবনঘনিষ্ঠ আলাপ, মাঝে মাঝে কিছু সরল রসিকতা। চাকরি-পরিবার-তিলাওয়াত-মুনাজাত-তাহাজ্জুদ—এসবের মধ্যেই তার জীবন সীমাবদ্ধ। তবে এসবকিছু ছাপিয়ে তার মধ্যে ধারাবাহিকতা-স্থিরতা-বিনয়-সরলতার চমৎকার একটা বুনন আছে। তার মধ্যে অদ্ভুত কিছু বিষয় আছে—তিনি বিরলপ্রায় আরবি কিতাবগুলো পড়েন, ইকবাল-আত্তার-রুমির কবিতাতেও তার সমান আগ্রহ, রাতে-মুনাজাতে সুর করে শের আবৃত্তি করেন, থানবি-আমিন ইসলাহি-মওদুদির বইগুলোও মাঝে মাঝে দেখেন, এমন বৈচিত্র্য আলেমদের মধ্যে খুবই বিরল। অবশ্য, তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য কুরআন তিলাওয়াত, তাফসীর। আট-দশটা দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে সফর করেছেন, টানা ত্রিশ বছর বাংলাদেশ বেতারে তিলাওয়াত করেছেন, সামরিক বাহিনীসহ অসংখ্য মানুষকে তিলাওয়াত শিখিয়েছেন। বর্তমানে দেশের বিখ্যাত কারীরা প্রায় সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমার বাবার ছাত্র। দুই হাজার চব্বিশে বাংলাদেশ নৌবাহিনী আমার বাবাকে শ্রেষ্ঠ কুরআন শিক্ষক হিসেবে সম্মানিত করে। ছাত্ররাও তাকে কল্পনা করেন অভিভাবক হিসেবে—অনেকে তাকে বাবা ডাকেন, এমন সন্তানের সংখ্যা অন্তত দশ-পনেরোর কাছাকাছি। তবে এসব পেশাগত সফলতা ছাপিয়ে তিনি একজন সাধারণ মানুষ। সামনা সামনি দেখলে কখনোই তার স্বতন্ত্রতা ধরতে পারবেন না— আপনার মনে হবে, তিনি একজন কওমি হুজুর, এলাকার ইমাম।

ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি আমাদের শিক্ষক মাওলানা ফখরুদ্দিন সাহেব ছিলেন 'দ্বীনে ফেরা' আলেম। অবশ্য এসব উপাধি ধর্মীয় সংস্কৃতিতে খুব একটা প্রচলিত নয়। তিনি কলেজের ছাত্র ছিলেন, পরে মাদরাসায় এসে ভর্তি হন, কাজেই অনেক বয়সে পড়াশোনা শেষ করেন। আমাদের অঞ্চলের আলেমরা জেনারেল শিক্ষায় বাঁধা না দিলেও তাদেরকে শতভাগ 'হুজুর' বানিয়ে ফেলতে চান। হয়ত মাদরাসায় ভর্তি হবেন, নয়ত পাঞ্জাবি- টুপি পরে তাবলীগে সময় দিবেন। মাঝামাঝি কোন বিকল্প নেই। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর 'দ্বীনে ফেরা' হুজুর শ্রেণী তৈরি করতে পারলেও ধর্মপ্রিয় পেশাজীবীদের মধ্যে আলেমদের প্রভাব খুবই সীমিত। নেজামি ইসলাম পার্টির পরে আলেমভিত্তিক দলগুলোতে পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ ছিল খুবই সামান্য। আলেমদের যে কোন উদ্যোগকে তাই আপনাদের মনে হবে, গোত্রীয় বিষয়। ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো অবশ্য স্বতন্ত্র উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারা আধুনিক পেশাকেন্দ্রিক সফলতাকেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরে। তারা মোটিভেশনাল বয়ানে তরুণদের চিকিৎসক হতে বলে, ইঞ্জেনিয়ার-অর্থনীতিবিদের গুরুত্ব তুলে ধরে। কয়েক দশকের অব্যাহত প্রচারণার ফলাফল হয় অত্যন্ত মারাত্মক। ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান নেতৃত্বে এখন কোন আলেম নাই বললেই চলে। প্রধান নেতাদের ছেলেদের মধ্যেও আলেম খুঁজে পেতে আপনাদের খানিকটা কষ্ট হবে। বাড়াবাড়ি কখনোই ভালো ফল বয়ে আনে না। আলেমদের নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান-সংগঠনগুলো এখন তাই প্রায় গোত্রীয় প্রতিষ্ঠান, সেখানে বাইরের কাউকে পাবেন না। অপরদিকে রাজনৈতিক ইসলামি দলগুলোর প্রধান নেতৃত্বে কোন প্রভাবশালী আলেমের অস্তিত্বও পাবেন না। আপনি ইসলামি দল চালাবেন, অথচ ধর্মীয় বয়ান নিয়ন্ত্রণের মত সক্ষমতা রাখবেন, সে তো কোনভাবেই চলবে না। আল্লাহ, আমাদের বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি থেকে মুক্ত রাখুন। অবশ্য যোগ্য নেতৃত্ব ছাড়া এমন সমন্বয় আসলেই যথেষ্ট কঠিন।

আফগানে ভূমিকম্প হলে সেটা কেন আজাব নয়, অমুসলিম দেশে ভূমিকম্প হলেই কেন সেটা আজাব হয়? শুরুতেই আপনাকে বুঝতে হবে, বিপর্যয় মাত্রই আজাব নয়, প্রাচুর্য মাত্রই রহমত নয়। ঠিক এ কারণেই নবীজি বলেছেন, পৃথিবী মুমিনের জন্য জাহান্নাম, কাফেরের জন্য জান্নাত। দুনিয়াতে মুমিন বিপদে পড়বেই, মুমিনের বিপদ দেখলে সেটাকে আজাব বলা যাবে না, একইভাবে কাফেরের সুখকেও রহমত বলা যাবে না। নবীজি বলেছেন, মহামারী মুমিনের জন্য রহমত, কাফেরের জন্য আজাব। একই ঘটনা মুমিন-কাফেরের জন্য দুইরকম, একজনের জন্য রহমত, আরেকজনের জন্য আজাব। আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে এটা ডবল ষ্ট্যাণ্ডার্ড কিনা, একই ঘটনা দুইজনের জন্য দুইরকম হবে কেন? ইসলামে আজাব-রহমত মূলত দুটি দৃষ্টিভঙ্গি, প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। বিপদে ধৈর্য ধারণ করলে সেটা আপনার জন্য রহমত, আপনি পরীক্ষা-প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও পবিত্র হয়ে উঠবেন। বিপদে আশা ছেড়ে দিলে, বিপদ আপনার জন্য আজাব। একইভাবে আপনার হাতে যদি অনেক টাকা থাকে, আপনি ডুবে থাকেন সুখ-প্রাচুর্যে, আপনি টাকা ভালো কাজে লাগালে সেটা আপনার জন্য রহমত। খারাপ কাজে লাগালে এই টাকাটাই আপনার আজাব। বিষয়টি কি পরিষ্কার হয়েছে? আজাব-রহমত মূলত দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়। ঘটনা মূলত একটাই, দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতায় ব্যাখ্যাতেও ভিন্নতা আসবে। অনেকক্ষেত্রে রহমত-আজাবের বিষয়টা পরিষ্কার থাকে, কিছু গ্রে এরিয়াও আছে, সেগুলোতে আমাদের চুপ থাকা বাঞ্ছনীয়। পার্থিব সুখ-দুঃখকে মানুষ খোদায়ী সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি ভাবতে পারে, এই ইশারা কোরআনেই পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষ এমন যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন, সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন সে বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মান দান করেছেন। আর যখন আল্লাহ তাকে পরীক্ষা করেন, রিযিক সংকুচিত করে দেন, তখন সে বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন। ( ১৬-১৭, সূরা ফাজর ) আল্লাহ এই ভুল ধারণা ভাঙ্গার জন্য পরমুহূর্তেই বলেন, না, এটা অহেতুক ধারণা মাত্র। ইমাম কাতাদাহ রাহ. উল্লেখিত আয়াতের তাফসীরে বলেন, পার্থিব প্রাচুর্য বেশী থাকলেই এটা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সম্মানের প্রমাণ নয়, আবার দারিদ্র থাকলেই আল্লাহর অসম্মান ও অসন্তুষ্টি নয়। আল্লাহর আনুগত্যেই তার সন্তুষ্টির প্রমাণ, নাফরমানিতে অসন্তুষ্টি। ( তাফসীরে তাবারী)। ইবনে আতাউল্লাহ ইসকান্দারি রহ. এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘তুমি যদি আল্লাহর কাছে তোমার অবস্থান কী, সেটা জানতে চাও, তাহলে দেখো, আল্লাহ তোমাকে কেমন কাজে নিয়োজিত রেখেছেন।’ অর্থাৎ যদি দেখো, তুমি ভালো কাজে নিয়োজিত, তাহলে আল্লাহ তোমাকে ভালো অবস্থানে রেখেছেন। আর যদি দেখো, তুমি খারাপ কাজে নিয়োজিত, তাহলে আল্লাহ তোমাকে খারাপ অবস্থানে রেখেছেন। এই প্রসঙ্গে আল্লামা ইকবাল দুটি কবিতা লেখেছেন, শিকওয়া ও জাওয়াবে শিকওয়া। শিকওয়ার সারকথা হল, মুসলমানরাই যদি ভালো হয়, তবে তাদের কেন এত বিপদ, শুধু জান্নাতের ওয়াদাতেই কি তাদের জীবন কেটে যাবে? জাওয়াবে শিকওয়ার সারকথা হল, মুসলমানরা এখন বাহ্যত মূর্তিপূজা না করলেও তারা সুন্নাতে ইবরাহিমি থেকে সরে গিয়েছে, চিন্তা-চেতনায় তারা পথ ধরেছে আজারের। কয়েকটা লাইন তুলে দিচ্ছি, اُمتیں اور بھی ہیں، اُن میں گناہگار بھی ہیں عجز والے بھی ہیں، مست مئے پندار بھی ہیں ان میں کاہل بھی ہیں،غافل بھی ہیں،ہشیار بھی ہیں سینکڑوں ہیں کہ ترے نام سے بیزار بھی ہیں رحمتیں ہیں تری اغیار کے کاشنوں پر برق گرتی ہے تو بیچارے مسلمانوں پر শেষ জবাবে ইকবাল বলেন, تم سبھی کچھ ہو بتائو تو مسلمان بھی ہو بت شکن اُٹھ گئے، باقی جو رہے بت گر ہیں تھا براہیم پدر اور پسر آذر ہیں

কর্মজীবনের জটিলতায় থানবী আশরাফ আলি থানবি পড়াশোনা শেষ করেই কর্মজীবনে ঢুকে যান। এক অচেনা-অজানা শহরে তার শিক্ষক-জীবনের সূচনা ঘটে। কর্তৃপক্ষ তাকে চাঁদা কালেকশন করতে বললে তিনি অপমানিত বোধ করেন, একপর্যায়ে মাদরাসার চাকরি ছেড়ে দিয়ে দিল্লীর পথে চলে আসেন। স্থানীয়রা তাকে আবার জোরাজোরি করে কানপুরে নিয়ে আসে, নতুন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে থানবির হাতে দায়িত্ব সপে দেওয়া হয়। এলাকাবাসী বলে, আপনি শুধু পড়াবেন, আমাদেরকে ওয়াজ-নসিহত করবেন, অর্থনৈতিক দিক নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আশরাফ আলি থানবি ছিলেন অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের সন্তান, একপর্যায়ে বেতনের চাকরি তার কাছে অসহ্য লাগতে শুরু করে। স্থানীয়দের যতই আন্তরিকতা থাকুক, অপরিচিত পরিবেশে স্থানীয়দের অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার চাকরিতে তিনি কোনভাবেই স্বস্তি বোধ করতে পারছিলেন না। বাবার কাছে চিঠি লেখলেন, 'বাবা আমি মাদরাসায় পড়াতে চাই না, বেতনের চাকরি করবো না, মেডিকেলে ভর্তি হব—বাবা বললেন, তোমাকে আমি কিছু সম্পদ লেখে দিচ্ছি। পড়াশোনার ক্ষেত্রে আমি তোমাকে সর্বোচ্চ সাহায্য করবো। মেডিকেলে ভর্তির কয়েকদিনের মধ্যেই আবার এলাকা থেকে মুহিব্বিন-মুতাআল্লিকিন আসা শুরু করলেন। আপনাকে ফিরতেই হবে বলে জোরাজোরি করতে শুরু করলেন। ইতিমধ্যে পরিচিত বন্ধু এসে বললেন, দ্যাখো, চিকিৎসা পেশার সাথে ধর্মীয় শিক্ষা-প্রশিক্ষণের কাজ একসাথে চলতে পারে না। আমি নিজেই ভুক্তভোগী, আমি পেশাগত কাজ করে কোনভাবেই ইলমি খেদমত করতে পারছি না। নানামুখী অব্যাহত চাপে থানবি মেডিকেলের পড়াশোনা বাদ দিতে বাধ্য হন। আবার ফিরে যান আগের মাদরাসায়। চাকরিজীবনে মাদরাসাগ্র্যাজুয়েটদের বেশকিছু জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। আশরাফ আলি থানবির মত ব্যক্তিত্বও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তবে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে খেদমতে জড়িত হতে পারলে একসময় সবকিছুর সমাধান হয়ে যায়। হয়ত এই কথা সবার জন্য সমানভাবে সত্য নয়, সবাই জীবনকে এক দৃষ্টিকোণ থেকে বাধ্য নয়, তবে দৃষ্টিকোণ যেমনই হোক, প্রতিটা মানুষকেই কর্মজীবনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।

ফররুখ আহমদ ফররুখ আহমদ অতীত হয়ে যাচ্ছেন। আমাদের চর্চা ও স্মৃতিতে তিনি আর খুব বেশীদিন টিকে থাকবেন না। আপনি নিশ্চয় ভাবছেন, ফররুখকে বাঁচাতে আপনি প্রবন্ধ লেখবেন, আপনাদের প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করবেন সাহিত্যসভা। বাস্তবতা হচ্ছে, প্রবন্ধ লেখে বা আলোচনা সভায় কবিতা-সাহিত্য টেকানো যায় না। প্রত্যেক কবি-সাহিত্যিক বিশেষ এক ভাবের জগত তৈরি করেন। আমরা ফররুখের ভাবের জগতে বিলং করি না। ফররুখের জগত প্রশান্ত আত্মার সুকুন ও জিকির ; ইসলামি বোধ ও বিবেকের জগত, পাঞ্জেরী, সিরাজাম মুনিরা ও হাতেম তায়ীদের জগত। ‘আমার ব্যথিত আত্মা আর্তনাদ করে উঠলো দাউদের পুত্র সোলায়মানের মতো কেননা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের আকাশ আছে পৃথিবীতে চিরন্তন শুধু সত্যের অন্বেষা। আমাদের মনে ব্যথা নেই, সুলাইমানের অনুসন্ধান নেই, আমরা হক-বাতিলের ধার ধারি না, সত্যের জন্য অন্বেষায় আমাদের হৃদয় উতলা হয় না। সেসব চেতনা আমরা আমাদের বাবাদের যুগেই ফেলে এসেছি। আমাদের অন্তর প্রশান্ত নয়, আমাদের চিত্ত, চিন্তা ও চেতনায় ঘিরে আছে গুনাহ-অস্থিরতা। আসলে ফররুখকে বাঁচাতে হবে না। আমরা বাঁচলে ফররুখও বাঁচবেন।

হানাফিরা আবু হানিফার আকিদা অনুসরণ করে না—বাংলাদেশে কেউ কেউ এমন তত্ত্ব প্রচারের চেষ্টা করেছেন। এমন ধারণা কেবল ভুলই নয়, আমাদের
হানাফিরা আবু হানিফার আকিদা অনুসরণ করে না—বাংলাদেশে কেউ কেউ এমন তত্ত্ব প্রচারের চেষ্টা করেছেন। এমন ধারণা কেবল ভুলই নয়, আমাদের আইডেনটিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলার শামিল। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী আকিদা জানে না বা ভুল আকিদা পোষণ করে—শক্তিশালী তত্ত্ব-প্রমাণ ছাড়া এমন কথা বলার কোন সুযোগ নেই। বলাইবাহুল্য, আরবেও কেউ কেউ এমন দাবী সামনে আনার চেষ্টা করেছেন। এই আলোচনায় হামযা বাকরি সেসব দাবী খন্ডন করেছেন। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা। দেখতে পারেন।

ইসলামে ট্রেডিশনের মর্ম ও গুরুত্ব শুধু রেফারেন্স দিলেই হয় না। ঠিকঠাকভাবে দিচ্ছেন কিনা সেটাও নিশ্চিত করতে হয়। আমাদের সমাজে অনেককেই দেখা যায়, তারা ইসলামি ট্র্যাডিশন বিষয়ে অজ্ঞ, তারপরেও সরাসরি কুরআন-হাদিস থেকে রেফারেন্স দিচ্ছেন, সেখান থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। আধুনিককালের আগে এমন প্রবণতা খুব বেশী দেখা যেত না। ইবনে মাসউদ (রাঃ) বছরের পর বছর কোন হাদিস না বলে আলোচনা চালিয়ে যেতেন। বিখ্যাত তাবেঈ ইবরাহিম নাখাঈও খুব বেশী হাদিস বলতেন না। হাম্মাদ বিন আবু সুলাইমান ও আবু হানিফা হাদিস কম বলতেন বলে অনেকে তাদের হাদিসে দক্ষতা নেই বলে অভিযোগ করতেন ও করেন। তারা কি একই অভিযোগ ইবনে মাসউদ সম্পর্কেও করবেন? করবেন না। তাহলে হাম্মাদ ও আবু হানিফাকে কেন করবেন? প্রশ্ন হচ্ছে, সালাফ হাদিসে/রেফারেন্সে খুব বেশী জোর না দিয়েও কীভাবে ফিকাহ সংকলন করলেন? সা’দুদ্দিন তাফতাযানির কিছু লেখায় এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সাহাবায়ে কেরাম নবীজির সোহবত পেয়েছেন, পেয়েছেন দীক্ষা ও রুচি। যার প্রেক্ষিতে ইবনে মাসউদ হাদিস না বললেও হাদিসের চর্চা, মর্ম ও প্রেক্ষাপট ধরে মাসায়েল বলতেন। এই চর্চা, মর্ম ও প্রেক্ষাপট ধরেই তৈরি হয় ইসলামি চিন্তার ট্র্যাডিশন। খেয়াল করুন, আক্ষরিক রেফারেন্সের চেয়েও চর্চা, মর্ম ও প্রেক্ষাপট বুঝা খুব বেশী জরুরী। সেটা ট্র্যাডিশন ও সনদ ছাড়া বুঝা সম্ভব নয়। রেফারেন্স ও ট্র্যাডিশনের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার জরুরী। আপনি একটা আয়াত ও হাদিস দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন, অথচ সেই সংক্রান্ত বাকি হাদিস ও সাহাবা-সালাফদের মতামত জানলেন না, সেক্ষেত্রে আপনার ভুল হওয়া খুব স্বাভাবিক। ভুল না হলেও আপনার বক্তব্যে কোন গভীরতা থাকবে না। যারা ট্র্যাডিশন সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের মধ্যে আকছার এই ত্রুটি থাকতে দেখবেন। ট্র্যাডিশনের মানে কী? ট্র্যাডিশনের মানে অন্তত দুটি। ক) কুরআন-হাদিসের পরম্পরাগত চর্চা, মর্ম ও প্রেক্ষাপট জানা। জানার দক্ষতা তৈরি করা। খ) সেই পরম্পরাকে কেন্দ্র করে যে চর্চা হয়েছে, সেটা জানা। ধরা যাক, আপনি শাতিমে রসূলের আলোচনা করবেন। আপনি হাদিস দিয়ে জেনারেলাইজড বক্তব্য দিলেন। অথচ আপনি জানেন না, অমুসলিমদের ক্ষেত্রে শা/ তিমের বিধান প্রয়োগ হবে কিনা, সে নিয়ে ইসলামি ট্র্যাডিশনে বিতর্ক আছে। যে কোন গবেষণার ক্ষেত্রেই জেনে নিতে হয়, আপনার আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঠিক কী গবেষণা হয়েছে, জাগতিক সব বিষয়ে এই প্রক্রিয়া (লিটারেচার রিভিউ) গ্রহণ করলে ধর্মীয় ক্ষেত্রে কেন অবহেলা করবেন? আমরা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারী। যার অর্থ, সুন্নাহ তথা আমরা সকল হাদিস-নুসুস মানি; পাশাপাশি আমরা জামাআহ তথা সাহাবা-সালাফের মাধ্যমে সেসব নুসুসের মর্ম-ব্যাখ্যা গ্রহণ করি। এভাবে একটু তলিয়ে দেখলে বুঝা যাবে, ইসলামে ট্র্যাডিশনের গুরুত্ব অনেক বেশী।

আপনি মোটেই একা নন জীবনের কোন কোন সময় আমরা সবাই বিপন্ন বোধ করি, আমাদের পাশে কেউ থাকে না। ঠিক ঐ সময়েও আল্লাহ আমাদের পাশে থাকেন। 'বান্দারা যদি আপনাকে আমার বিষয়ে প্রশ্ন করে তবে বলুন, আমি পাশেই আছি। যারা আমাকে ডাকে আমি তাদের ডাকে সাড়া দেই। তারা যাতে আমার কথা শুনে, আমাতে রাখে বিশ্বাস।' আল্লাহ কখনোই সীমাহীন বিপদ চাপিয়ে দেন না। যে বিপদ সহ্য করার ক্ষমতা আছে, আল্লাহ আপনাকে সেই বিপদই দেন। আপনার কপালে যা আছে, সেটাই আপনাকে মোকাবেলা করতে হয়, অন্য কারো বোঝা আপনাকে বহন করতে হয় না। অন্যরা সবাই ওসিলা। ইসলাম ধর্মের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা। কোন পীর-মাশায়েখ-পুরোহিত ছাড়াই আপনি আল্লাহর সাথে কথা বলতে পারেন। ইবাদত, জিকির ও দোয়া আল্লাহর সাথে কথা বলার প্রধান মাধ্যম। বড় বড় আলেম ও সুফীরা ঘন্টার পর ঘন্টা আল্লাহর প্রেমে নিমগ্ন থাকতেন, কথা বলতেন। এর মধ্যে দোয়ার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। মূলত দোয়াই তো ইবাদতের মূল। আপনি যদি কুরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলো দেখেন, তবে আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা ধরতে পারবেন। আল্লাহর সাথে ঘনিষ্টতার সবচেয়ে বড় উপহার হচ্ছে, আপনি বুঝবেন আপনি একা নন। আপনাকে একজন সবসময় হেফাজতে আগলে রেখেছেন। একজন সবসময় আপনার আবেদন কবুলের জন্য প্রস্তুত আছেন। কখনো নামাজ পড়েননি, শতবার তাওবা ভঙ্গ করেছেন, তবুও একদিন নামাজ পড়ুন, নামাজ শেষে দোয়ায় বসুন। দোয়ায় আল্লাহর সাথে কথা বলুন, বিশ্বাস করুন আপনার ভালো লাগবে। দোয়া করলে সব সমস্যার সমাধান হবে, দোয়ার মূল কথা এটা নয়। দোয়ার মূল কথা সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা, আল্লাহর কাছে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ। বিপদ দূর না হোক, অন্তত আপনি বুঝবেন আপনি একা নন। 'ইউ আর নট লেফট এলোন।'

মুরসি ও গণতন্ত্র মুরসি ও মিশরের প্রসঙ্গ আসলে কেউ কেউ বলেন, তারা একশো ভাগ সঠিক ছিলেন না, তাই এই বিপর্যয়। এই দাবী অত্যন্ত আত্মঘাতী। আমি মোটামুটিভাবে আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ইতিহাস পড়েছি। সে হিসেবে বলতে হয়, শুরুতে ঐ ব্যবস্থাগুলো একশোভাগ দূরে থাক, ত্রিশ চল্লিশ ভাগ 'ঠিক' ছিল কিনা সে নিয়ে গভীর সংশয় আছে। এখনো তাতে অনেক ত্রুটি আছে। গণতন্ত্র মোটেই পবিত্র কিছু না। তবে সহিংসতাহীন ক্ষমতার পালাবদলে এর ভূমিকার কথা অস্বীকার করার মতো নয়। মুশকিল হচ্ছে, এটা একটা জুয়া খেলার মতো। এই জুয়ার নাম গণসম্মতি—এর সাথে গণমাধ্যম ও জনমত যুক্তিহীনভাবে জড়িত। যাকে নানান সময়ে ব্যবহার করে বিশ শতাংশ ভুলকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে বড় আকারে দেখানো যায়, আবার ত্রিশ শতাংশ ভালোকে বারবার দেখিয়েও সম্মতি উৎপাদন করা যায়। এটা বোকাদের খেলা এবং মেইক নৌ মিসটেইক, আমি আপনিও অত স্মার্ট না, নিয়মিত ভুল প্রচারনায় প্রভাবিত হই। মুরসি ও মিশর অভিজ্ঞতা যে মাত্রায় 'কারেক্ট' ছিল, মোদি বা ইজরাইল তার ধারকাছেও 'কারেক্ট' না। তবে এখান থেকে শিক্ষা নেবার কিছু নেই, তা নয়। কোন গণতন্ত্রই সহিংসতার আশ্রয় ছাড়া টিকে থাকতে পারে না, আবার সামান্য সহিংসতাতেই গণতন্ত্রকে গুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব—এটা গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যের একটি। তবুও মুরসিদের অভিজ্ঞতায় যে পরিমাণ ইখলাস ও কৌশল ছিল, তাতে তারা আদর্শ হয়ে থাকবেন। ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের কথা বলে, এই তত্ত্ব সত্য নয়। সত্য হলে হুসাইনের শাহাদাতের সাথেসাথেই হুসাইনী চেতনার মৃত্যু ঘটে যেত। মুরসির শাহাদাত পরিবর্তনের চারাগাছ, তাকে কোনভাবে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়। রাহিমাহুল্লাহ। সতেরই জুন মুহাম্মদ মুরসির মৃত্যুর সাত বছর পূর্ণ হলো। হে আল্লাহ, আপনি হাফেজ মুহাম্মদ মুরসিকে মাগফুর ও মারহুম করুন, উচ্চ মর্যাদা দান করুন। তার প্রতি ফাতেহা ও সূরায়ে ইখলাস। (সময় থাকলে পাঠ করে দোয়া করুন)

পথ থেকে পথে : আলী জুমআহ ও হিবাহ ইজ্জাত হিবাহ রউফ ইজ্জাতকে মুসলিম বিশ্বের প্রথম সারির নারী একাডেমিশিয়ান হিসেবে গণ্য করা হয়। পড়েছেন কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে, পলিটিকাল সাইন্সে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ হতেই তিনি একদিন কান্নায় ভেঙে পড়লেন। হিবাহ ইজ্জাত পশ্চিমা রাজনৈতিক তত্ত্ব মেনে নিতে পারেন না, তবে সমালোচনার মেথডগুলোও তার ভালোভাবে জানা নেই। তার মনে হল, তিনি মুসলমানের মেয়ে হয়ে ফিকাহ-উসুলে ফিকাহ কেন জানবেন না—কেন তাকে প্লেটো-এরিস্টটল-ম্যাকিয়াভেলি পড়েই জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে? শিক্ষকদের সাথে পরামর্শ করলেন, তারা তাকে এক তরুণ আজহারি আলেমের কাছে নিয়ে গেলেন। সবশুনে তরুণ আলেম বলেন, ‘আপনি নিয়মিত আমার বাসায় আসবেন। আমার স্ত্রীও আপনার সাথে তুরাছি ধারার কিতাবগুলো পড়বেন।’ প্রচণ্ড পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে হিবাহ ইজ্জাত তুরাছি ধারার স্কলারশিপ আত্মস্ত করতে সক্ষম হন। সেই তরুণ আজহারি আলেমের প্রভাবও বাড়তে থাকে—দুই হাজার তিন সালে তিনি মিসরের গ্র্যান্ড মুফতি পদে নিযুক্ত হন। ইয়েস—সেই তরুণ আলেমের নাম আলী জুমআহ/গোমা। দায়িত্বপ্রাপ্তির সাথে সাথে আলী জুমআহ হিবাহ ইজ্জাতকে ডেকে পাঠান। মিসরের প্রধান মুফতি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা হিবাহ ইজ্জাতকে বলেন, তোমাকে দারুল ইফতায় সোশিউলজি অফ আরবান লাইফ পড়াতে হবে। আলী জুমআহ ব্যাখ্যা করলেন, ‘অধিকাংশ ইমাম-তরুণ মুফতি শহুরে মানুষের মনোভাব-জীবনধারা ধরতে পারেন না। ফলে তারা এমন ফতোয়া/বক্তব্য দিয়ে বসেন, যেগুলো শহুরে জীবনের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ নয়।’ হিবাহ ইজ্জাত শিক্ষকের নির্দেশনা মেনে নিলেন—ফিকাহ-উসুলে ফিকাহের মধ্যে সোশিউলজি-পলিটিকাল সাইন্সের বোঝাপড়ার মিশ্রণ ঘটিয়ে দিলেন। শিক্ষক-ছাত্রীর সম্পর্কের অবসান ঘটলো দুই হাজার তেরোতে—আলী জুমআহ সিসির পক্ষে দাঁড়িয়ে যান। হিবাহ ইজ্জত শিক্ষকের এই অবস্থান কোনভাবেই মানতে পারেননি। তবে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথেও হিবাহ ইজ্জাতের দূরত্ব তৈরি হয়। তিনি মনে করেন, মিসরে আরব বসন্ত ব্যর্থ হবার একটা বড় কারণ—ব্রাদারহুডের লোকজন জীবনকে রাজনীতিসর্বস্ব বিষয়ে পরিণত করেন। হিবাহ ইজ্জাত মনে করেন, তুরাছি ধারার পড়াশোনাটা অত্যন্ত জরুরী, পাশাপাশি তিনি তাসাউফকেও জরুরী মনে করেন। হিবাহ ইজ্জাত কি কিছুটা ঠাট্টাচ্ছলেই বলেন, 'ইসলামি লোকজন আধুনিক রাষ্ট্রকে দুর্গ বলে কল্পনা করে। তারা ভাবে, দুর্গ জয় করতে পারলেই সব কাজ শেষ। বাস্তবে আধুনিক রাষ্ট্র হল পরিখার মত এক অতল গহ্বর। তার সামনে আপনি যে আদর্শই তুলে ধরেন, আধুনিক রাষ্ট্র তাকে গিলে ফেলবে, নিজস্ব ছাঁচে গড়ে তুলবে।' ঠিক এ কারণেই হিবাহ ইজ্জাত ভাবেন, আপনাকে অবশ্যই বেসিক ফিকাহ-উসুলে ফিকাহ জানতে হবে, তাসাউফ চর্চা করতে হবে। হিবাহ ইজ্জাত এখনো আলী জুমআহকে শ্রদ্ধার চোখেই দেখেন, এখনো উসুলে ফিকাহ পাঠের স্মৃতি ভুলতে পারেন না। আলী জুমআহ নিজেও হিবাহ ইজ্জাতের পথেই আগালেন—তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বন্ধুদের কাছে পড়লেন পশ্চিমা জ্ঞানের প্রধান শাখাগুলো—আইন-অর্থনীতি-গণিতের মত বিষয়গুলো। এখন আলী জুমআর সাথে হিবাহ ইজ্জাতের দূরত্ব অনেক বেশী—তবে তারা একে অপরের জীবনে হাজির আছেন বিপুলভাবে পুনশ্চ : আলী জুমআ অনেক শায/প্রান্তিক মতামত পোষণ করেন। তার মতামতের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, অন্য আলেমদের মতামতের আলোকে তার মতকে বিচার করতে হবে।

জিহাদ ও খেলাফতের আকাঙ্ক্ষা অনেকেই ভাবেন, তারা 'জি হাদের মাধ্যমে বিশ্বে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করবেন, এটাই নাকি মুসলমানদের জন্য প্রকৃত সমাধান।' এগুলো অনেকক্ষেত্রেই অতিআবেগি মূল্যায়ন। তারা কী চান, সেটা আমি ধরতে পারি। তারা ইসলামের প্রাথমিক যুগ বা পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মত হার্ড পাওয়ার দিয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের পক্ষপাতী। আমেরিকা যেভাবে ইরানে হস্তক্ষেপ করেছে, তারাও একইভাবে সামরিক হস্তক্ষেপ চালাতে চান। মুশকিল হচ্ছে, আপনার দেশে প্রপার গভরনেন্স না থাকলে অতিরিক্ত হার্ড পাওয়ার ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। প্রপার গভরনেন্স না থাকলে আপনি তো আপনার নিজের দেশকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না, বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার তো আরও দূরের কথা। একই কথা খাটে খেলাফতের ক্ষেত্রেও। লোকজন আসলে খেলাফত বলতে কী বুঝে? তারা মুসলিম স্বর্ণযুগের কথা কল্পনা করে, শক্তিশালী শাসক কামনা করে। মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমাদের অব্যাহত হস্তক্ষেপে লোকজন ক্লান্ত, বিরক্ত, ক্ষুব্ধ। তবে তারা অনেককিছুই তলিয়ে ভাবতে চান না; মুসলমানরা তো ঠিকভাবে আঞ্চলিক রাষ্ট্রই বানাতে পারেনি, খেলাফতের মত বৈশ্বিক রাষ্ট্রকাঠামো বানাবে কীভাবে? সর্বোপরি, মুসলিম শাসনে অবশ্যই শরিয়ার উপস্থিতি ছিল, তবে সেগুলো মোটেই ফেরেশতাদের শাসন ছিল না। খেলাফত বলতে লোকজন কল্পনা করে, আকাশ থেকে নেমে আসা ফেরেশতাদের শাসন —এসব প্রান্তিক চিন্তাভাবনা লোকজনকে কাল্পনিক জগতে আটকে রাখে। এসব ক্ষেত্রে রিলিজিয়াস-লিবারেল বিভক্তিটাও অপ্রাসঙ্গিক। আমেরিকা হার্ড পাওয়ার ইউজ করলে, বৈশ্বিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠলে সেটাকে যদি ধর্মীয়ভাবে ফ্রেম না করা যায়, তবে মুসলিম আকাঙ্ক্ষাকে কেন ধর্মীয় শব্দে ফ্রেম করা হবে? অবশ্যই ধর্মীয় ভাষা লিবারেল পরিভাষার থেকে আলাদা। কিন্তু জি হাদকে হার্ড পাওয়ার বললে, খেলাফতকে কোর/বৈশ্বিক রাষ্ট্র বললে মূল মডেলিং এ কি অনেক বেশি পার্থক্য চলে আসে? এভাবে ভাবলে দেখবেন, হুজুর-নন হুজুর-রিলিজিয়াস-লিবারেল লোকজন রাষ্ট্রীয় মডেলিং নিয়ে অধিকাংশ সময় অনর্থক মারামারি করে। এরা ভাবে, হার্ড পাওয়ার বললে অনেক সেকুলারিজম হয়ে গেল, খে লাফত শব্দ বললে অনেক ধার্মিকতা হয়ে গেল। কাজেই, এসব তর্ক থেকে নিজেদেরকে যতটা দূরে রাখতে পারেন ততই ভালো। কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হচ্ছে, আপনারা কি বাংলাদেশে গুড গভরনেন্স নিশ্চিত করতে পারছেন? সামাজিক সমন্বয়-প্রতিনিধিত্ব-মোবিলিটি কার্যকর করতে পারছেন? সফট এন্ড হার্ড পাওয়ারের মধ্যে সমন্বয় করতে পারছেন? বৈশ্বিক পর্যায়ে বাংলাদেশের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারছেন?

শিক্ষাবাজেটে সংস্কার চাই কওমি মাদরাসার ছাত্ররা শিক্ষাবাজেটে তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবী জানাচ্ছে। আমার মতে কওমি মাদরাসার পাশাপাশি আলিয়া-জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করে থাকে, অথচ হবার কথা উল্টাটা। যেহেতু পাবলিকের ছাত্ররা সবচেয়ে ভালো চাকরিগুলো বাগিয়ে নেয়, আপনি তাদের পেছনে সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে পারেন না—এগুলোকে বলে তেলা মাথায় তেল ঢালা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-উন্নয়নে বরাদ্দ বৃদ্ধি করেন, কিন্তু সাধারণ খরচের টাকা কমান—বছরের পর বছর ভর্তুকি দিয়ে যাবেন, এটা হতে পারে না। পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত দেশে এই মডেলে শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হয় না। কওমি-আলিয়া-জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সবচেয়ে অবহেলিত শিক্ষাধারা। আপনি এসব ক্ষেত্রে ইনভেস্ট করে দেখেন, বহুগুন ফলাফল ফেরত পাবেন। সর্বোপরি, রাষ্ট্র সবাইকে সমানভাবে ট্রিট করতে পারে না—অবশ্যই মাদরাসা-জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রেক্ষিতে সামাজিক ইন্টিগ্রেশন-ইনক্লুশন-আপওয়ার্ড মোবিলিটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কওমিকে বলেন, তুমি এইচএসসি পর্যন্ত পড়ালে তোমাকে টাকা দিবো। আলিয়াকে বলেন, শিক্ষার মান বাড়লে এমপিউভুক্ত কলেজের সমান বরাদ্দ দেওয়া হবে। জাতীয়কে বলেন, এমপ্লয়মেন্ট রেট বৃদ্ধি করো, পাবলিকের সমান বরাদ্দ দিবো। সবাইকে প্রতিযোগিতার মধ্যে নামান, প্লেয়িংফিল্ড সমান করার চেষ্টা করেন, সারাজীবন একশ্রেণীর প্রতিষ্ঠানকে 'রাষ্ট্রীয় খাইরাত' করে যাবেন, সেটা হতে পারে না।

নেটওয়ার্কিং-কোলাবোরেশন উচ্চশিক্ষায় এসে আমি যেসব রিসার্চ স্কিলস-টুলস শিখেছি, এগুলো দেশের কওমি-আলিয়া-ইসলামিক স্টাডিজের ছাত্রদেরকে শেখানোর চেষ্টা করবো—এই চিন্তা অনেক আগে থেকেই ছিল। সবার পক্ষে বিদেশে আসা মোটেই সম্ভব নয়, বাস্তবানুগও নয়। আমরা যারা বিদেশে এসেছি, পশ্চিমা ধাঁচের গবেষণার সাথে পরিচিত হয়েছি, তারা দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণ কোলাবোরেশন করতে সক্ষম হলে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিশ্বমানের আউটপুট বের করা মোটেই অসম্ভব কিছু নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে কীভাবে কাজ করবো? প্রথমত, ব্যক্তিগত সম্পর্ক-নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। দেশের উঠতি গবেষক-লেখকদের সাথে কাজ করতে হবে, যৌথভাবে প্রজেক্ট করতে হবে। এই ধাপটা মোটামুটি সফলতার সাথে সম্পন্ন করা গেলে ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করতে হবে। এভাবে যদি কয়েকটা আদর্শ ডিপার্টমেন্ট/বিভাগের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে ফেলা যায়, তবে প্রচুর যোগ্য ছেলে তৈরি করা সম্ভব। আরববিশ্বের দিকে যদি তাকান, তবে আজহার বা জাইতুনা কীভাবে আজকের পর্যায়ে পৌঁছল? এক্ষেত্রে বিদেশে পড়া গবেষকদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। যেমন বর্তমান শাইখুল আজহার ফ্রান্সে পড়েছেন, পাশাপাশি কাতার ও পাকিস্তানে কাজ করেছেন। আপনি কেন বাংলাদেশে আটকে থাকবেন? যদি দেশে থেকেই নিজেকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন, তবে আপনার সামনে পুরো দুনিয়ার দরজা খুলে যাবে। বাংলাদেশের ছেলেপেলেরা সাধারণত যথেষ্ট পরিশ্রমী হয়, পাশাপাশি বেসিকটাও ভালো থাকে, কাজেই নেটওয়ার্কটা একটু শক্তিশালী করা গেলে, খানিকটা কোলাবোরেশন করা গেলে অনেককিছু করাই সম্ভব।

মন যদি খারাপ হয় তবে ডিপ্রেশন অস্বাভাবিক, তবে অসম্ভব নয়। আমি আমার কিছু কাছের বন্ধুকেও ডিপ্রেশনে ভুগতে দেখেছি। আমরা যারা শহুরে জীবন যাপনে অভ্যস্ত, তারা প্রকৃতি থেকে অনেক দূরে—আমরা প্রাকৃতিক স্বাদ, ঘ্রাণ ও আলোর আশ্রয় পাই না। সাথে থাকে শহুরে জীবনের অসীম আকাংখা ও আশঙ্কা, পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা পেতে আমাদেরকে অনেক অনিশ্চিত সময় ব্যয় করতে হয়। এসবের মাধ্যমে জন্ম নেয় অস্থিরতা। একসময় কেউ কেউ ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয়ে যায়। মানসিক অস্থিরতা অস্বাভাবিক কিছু নয়— সত্যি বলতে কি, একশো ভাগ মানসিক স্থিরতা সম্পন্ন কাউকে আমি পাইনি। প্রত্যেকের মনেই থাকে কিছু বেদনা, ক্লান্তি ও দ্বিধার আঁচড়। একসাথে দীর্ঘক্ষণ থাকলে—ক্রাইসিস মুহূর্তে, বিতর্ক হলে বা অসহায় বোধ করলে মানসিক দুর্বলতার দিকগুলো প্রকাশ পেয়ে যায়। সবাই যৌক্তিক ও নৈতিক পন্থা অবলম্বনের চেষ্টা করে— তবে মানসিক দুর্বলতায় মানুষ কখনোই একশোভাগ যৌক্তিক ও নৈতিক আচরণ প্রদর্শন করতে পারে না। আল্লাহ মানুষকে দুর্বল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এটা আপনাকে মেনে নিতে হবে। সুফিয়ানে কেরাম মানসিক অস্থিরতার বিষয়ে বিস্তারিত লেখেছেন। তারা যেমন আল্লাহর সাথে মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে চেষ্টা করেন, তেমনি মানসিক অস্থিরতার সমাধান দান করেন। কেউ যদি তীব্র হতাশায় আক্রান্ত হয়ে সুফিয়ানে কেরামের কাছে যান, তারা আক্রান্ত ব্যক্তিকে রজা ও রেজার আমল করতে দেন। একে তারা তাদের ভাষায় জালব ও সালবে আওসাফ হিসেবে আখ্যা দেন। ধর্ম মানলেই আপনার সব মানসিক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এটা কেউই মনে করবেন না। মূলত মানসিক সমস্যার সমাধান তাসাউফের উল্লেখযোগ্য অংশ। ইসলাহে বাতেনের অর্থ মৌলিকভাবে এটাই— থানবি রাহঃ লেখেন, এগুলোই তাসাউফের মূল মাকসাদ। জিকির-শুগুল-আওরাদের মূল লক্ষ্য এগুলোই। আজকাল অনেকে মানসিক অস্থিরতা হলেই মনে করেন, তার ধর্ম ঠিক নাই— কি দুঃখজনক কথা ! আপনি আশেপাশের মানুষদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখবেন, আমরা প্রত্যেকেই 'উইয়ার্ড'। এটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। মানুষ কোন জড়বস্তু না—সে যুক্তি-নিয়ম-স্থিরতায় আটকে থাকতে পারে না। তবে মানসিক অস্থিরতাগুলোকে কখনোই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। অস্থিরতা টের পেলে বন্ধু, সঙ্গী বা পার্টনারকে অবশ্যই ছাড় দিতে হবে। আপনি নিজে অস্থির হলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবেন। কোন সূফীর সাথে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করবেন। আধুনিক মনোবিজ্ঞান মানসিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারে না, সাময়িক উপশম হয় বড়জোর। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের বেশীরভাগ অংশ অপবিজ্ঞান। মানসিক অস্থিরতাকে সে অসুস্থতা হিসেবে দেখে বা অসুস্থতাকে মহান বানিয়ে তুলে। অবচেতন মন, মানসিক সমস্যা সমাধানে মেডিসিন ব্যবহার বা সামাজিক স্মার্টনেসকে অত্যধিক গুরুত্ব দেয়। আপনার একটা আচরণ একটু উইয়ার্ড-একটু ব্যতিক্রমী— তাতে কি আপনি অসুস্থ হয়ে গেলেন? অবশ্যই না। সামাজিক স্মার্টনেসের কথা বলে আমাদের সমাজে অনেকে নির্যাতনের মুখে পড়ে। সুফিয়ানে কেরাম লেখেন, আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবার পরেও যদি ব্যতিক্রমী মানসিক আচরণ থেকে মুক্তি না ঘটে, তাহলে আল্লাহর কাছে ইসতেগফার করতে হবে। আমাদের সমাজে যাদেরকে জীনে ধরেছে বলে আমরা মনে করি, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ আসলে মানসিক রোগী—এমনকি নিশ্চিতভাবে একটা সমাজে কিছু পাগল-আলাভোলা-মানসিক ভারসাম্যহীন লোক থাকবেন। তাদের যত্ন নিতে হবে। তাদেরকে কোনভাবেই ঊনমানুষ মনে করা যাবে না। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন

রাজনৈতিক আধ্যাত্মিকতা ধর্মহীন রাজনীতি কি মানুষকে সন্তুষ্ট করতে পারে? সহজ উত্তর হচ্ছে, পারে না। ফিলিস্তিনিদের যুক্তরাষ্ট্র নানান লোভ দেখাচ্ছে, 'তোমাদের চাকুরী হবে, উন্নয়ন হবে, হত্যাকান্ড বন্ধ হবে, তোমরা রাজনৈতিক দাবী থেকে সরে আসো।' আপনি যদি রাজনীতিকে নিছক বস্তুকেন্দ্রিক মনে করেন, তাহলে মনে করতে পারেন, ফিলিস্তিনিরা অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের দাবী মেনে নিবে, তাতেই তাদের কল্যাণ নিহিত। তবে রাজনীতি তো আধ্যাত্মিকতা ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। রাজনৈতিক আধ্যাত্মিকতার মর্ম হচ্ছে, আপনার স্ট্রাগল অর্থপূর্ণ হতে হবে, মর্যাদা ও নৈতিকতা নিশ্চিত করতে হবে। ফিলিস্তিনি তরুণ ও তরুণীরা খালি বুকে ইজরাইলের মোকাবেলা করে--তারা নিছক জাতীয়তাবাদী না। তারা বিশেষ রাজনৈতিক আধ্যাত্মিকতা বহন করে। তাদের অনেকের নামাজ ও দোয়া আমার আপনার চাইতে অনেক বেশী ইখলাসপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটেই আমাদের পরদাদারা যে ব্রিটিশ শিক্ষা ও চাকুরী বর্জন করেছিলেন, তাকে সম্মান করতে শিখুন। মাদরাসার শিক্ষক বা ইসলামপন্থীরা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের পার্থিব-স্বার্থ ত্যাগ করেন, একে কখনোই বোকামি বা অর্থহীন ভাববেন না। সেসব কুরবানি অর্থহীন হলে শাহজালাল বা বিন কাসিমের ভারত মুক্তির সংগ্রামও অর্থহীন। ভারতকে অন্ধকার থেকে মুক্ত করার কোন বস্তগত দায় তো তাদের ছিলো না।

বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি আবিষ্কার ও বিজ্ঞানের সাথে গভীরভাবে রাজনীতি ও অর্থনীতি জড়িত। যারা আবিষ্কার বা বিজ্ঞানের ইতিহাস বা কল্পকাহিনী বলেন, তারা এই দিকটা বলেন না, ফলে অনেক ভুল ধারণা তৈরি হয়। একটা গরীব দেশে বসে যতই বিজ্ঞান চর্চা করেন, পরিবেশ ও প্রযুক্তির সহায়তা পাবেন না। তাত্ত্বিক বিজ্ঞান চর্চা করতে পারেন, তবে বিজ্ঞানের গল্পের সাথে তত্ত্বের যোগ কম, প্রযুক্তি ও প্রয়োগের জোর বেশী। গত শতকের অনেক আবিষ্কারের সাথে দুই বিশ্বযুদ্ধের যোগ আছে। উপনিবেশের কাঁচামাল, শ্রম , অর্থ ও বাজার না থাকলে ইউরোপীয় বিজ্ঞানের ইতিহাস কতটা অগ্রসর হত, সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। ঠিক এ কারণেই গত শতকে আমেরিকা থেকে ইউরোপ পিছিয়ে পড়েছে। গতশতকের পশ্চিমা রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছে আমেরিকা ও রাশিয়া, তাই এসেছে অগ্রসরতা। মধ্যপ্রাচ্যে প্রযুক্তিতে এখন তুরস্ক ও ইরান অনেক অগ্রসর। কেননা তারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিজের পায়ে দাড়াতে পেরেছেন। বিজ্ঞানের কল্পকাহিনীতে কিশোররা প্রভাবিত হন। মা-বাবারা চাকরীর জন্য বিজ্ঞান পড়ান। ঠিকঠাকভাবে পড়লে তাদের অবস্থা অনেক ক্ষেত্রে ভালো থাকে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে এর প্রেক্ষিতে দেশে প্রচুর ছেলে বিজ্ঞান শাখায় পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। প্রথমসারির বিশ্ববিদ্যালয় দূরে থাকুক, প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানেও ভর্তি হতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মানবিক শাখায় যেখানে সহজেই ভর্তি হওয়া যাচ্ছে, বিজ্ঞান শাখায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে হচ্ছে অনেকের। পাশাপাশি গবেষণার অবকাঠামো ও বাজেট না থাকায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরে এসে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীগুলো ঠাট্টায় পরিণত হচ্ছে। রাজনীতি ও অর্থনীতির উন্নতি ছাড়া বৈজ্ঞানিক উন্নতি সম্ভব নয়। জাফর ইকবালরা কখনোই এই দিকগুলোর কথা বলবেন না। বরং সেখানে পাকিস্তান ও চেতনা তত্ত্ব এনে সবকিছু গুলিয়ে দিবেন।

নিজেকেও ক্ষমা করুন অন্যদের পাশাপাশি নিজেকেও ক্ষমা করতে শিখুন। অপরাধবোধ বয়ে বেড়াবেন না। আল্লাহ তাওবা করার সুযোগ দিয়ে রেখেছেন। মৃত্যুর আগে সংশোধনের সুযোগ কখনোই শেষ হবে না। যদি বান্দার হক নষ্ট করে থাকেন, তবে নিঃসঙ্কোচে যোগাযোগ করুন, ক্ষতিপূরণ প্রদানের চেষ্টা করুন, ক্ষমাপ্রার্থনা করুন। তবে সবার আগে ক্ষমা করুন নিজেকে। গুনাহ স্বেচ্ছায় করেছেন বটে, তবে সেটাও আল্লাহর ইচ্ছার অংশ। নিজেকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করুন।

Iftekhar Jamil - Estadísticas y analítica del canal de Telegram @iftekharjamil