আধুনিক দাম্পত্যের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন- বিশ্লেষণ
ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের তাত্ত্বিক জ্ঞান আমাদের থাকলেও, বাস্তব জীবনে এর প্রতিফলন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। গত ৫০ বছরে পৃথিবী যতটা বদলেছে, আমাদের পারিবারিক চ্যালেঞ্জগুলোও বদলে গেছে তার চেয়ে বেশি। কিন্তু আমরা এখনো সেই পুরোনো দিনের সমাধান দিয়ে বর্তমানের ক্ষত সারাতে চাইছি। আজকের ডিজিটাল যুগে পারিবারিক শান্তির পথে যে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জগুলো আসছে, তা চিহ্নিত করা এবং কার্যকর সমাধান খোঁজা অত্যন্ত জরুরি।
।
১. ডিজিটাল দেয়াল
আগের দিনে মানুষের মাঝে ‘আনডিভাইডেড অ্যাটেনশন’ বা অবিভক্ত মনোযোগ ছিল। তখন ঘরে স্মার্টফোন ছিল না, ছিল না সোশ্যাল মিডিয়ায় ডুবে থাকার ব্যস্ততা। মানুষ কৃষিকাজ বা সাধারণ অফিস শেষে যখন বাড়ি ফিরত, তখন পরিবারের সদস্যের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয়ার সুযোগ ছিল, এতে একধরনের মানসিক প্রশান্তি ছিল। কিন্তু আজকের দৃশ্যপট ভিন্ন। এখন স্বামী-স্ত্রী ঘরে থাকলেও মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে ডিজিটাল স্ক্রিন। অফিসের কাজ এখন ঘরের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে। কর্পোরেট ইঁদুর দৌড়ে টিকে থাকতে গিয়ে মানুষের মগজ সবসময় দখল করে থাকে পরবর্তী প্রজেক্টের চিন্তা। ঠান্ডা মাথায় কথা বলা বা একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে শোনার সময়টুকুও আর নেই। এই মনোযোগের অভাবই আধুনিক দম্পতিদের মধ্যে তৈরি করছে এক বিশাল অদৃশ্য দেয়াল।
।
২. উচ্চশিক্ষা বনাম ‘স্টে অ্যাট হোম’ জীবনের দ্বন্দ্ব
গল্পটা শুরু হয় অনেক স্বপ্ন নিয়ে। শামিমা (একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে) একজন উচ্চশিক্ষিত মেয়ে। হয়তো সে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েট। সে ইসলামকে ভালোবাসে, তাই বিয়ের পর সিদ্ধান্ত নিল ক্যারিয়ারের পেছনে না ছুটে ঘরে থেকে সন্তান লালনপালন করবে এবং দ্বীন পালন করবে। তার স্বামীও এতে খুব খুশি। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস যেতেই দেখা দিল এক অদ্ভুত বিষণ্নতা। কেন?
মনস্তাত্ত্বিকভাবে মানুষের কিছু মৌলিক চাহিদা থাকে। যেমন নিজের গুরুত্ব (Significance) অনুভব করা। শামিমা ক্লাস ওয়ান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ২০ বছর ধরে পড়াশোনা করেছে, নিজেকে একভাবে বড় হতে দেখেছে। তার শাশুড়ি বা মায়ের সাথে তার পার্থক্য এখানেই। তার শাশুড়ি হয়তো কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি, তাই ঘরের কাজের মধ্যেই তিনি নিজের সার্থকতা খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু শামিমার মনোজগৎ সেভাবে তৈরি হয়নি। হঠাৎ করে নিজেকে চার দেয়ালের মাঝে আবিষ্কার করে তার সচেতন মন হয়তো বলছে—‘আমি আল্লাহর জন্য এটা করছি’,
কিন্তু অবচেতন মন কর্মহীনতা আর একঘেয়েমির ভার সইতে পারছে না।
এ অবস্থায় যদি স্বামী অসংবেদনশীল হয়ে বলে বসে, ‘তুমিই তো ঘরে থাকতে চেয়েছিলে, এখন কেন মন খারাপ করো?’ তখন মেয়েটির ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ভালোবাসা আছে ঠিকই, কিন্তু আধুনিক মনস্তত্ত্বের এই জটিল সমীকরণগুলো না বোঝায় দূরত্ব বাড়তে থাকে।
৩. আবেগীয় অপরিপক্বতা
আরেকটি বড় সমস্যা হলো আবেগীয় অপরিপক্বতা। এখনকার ২৫ থেকে ২৬ বছরের তরুণ-তরুণীরা বয়সে বড় হলেও মানসিকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই অপরিণত। তাদের ঝগড়ার ধর দেখে মনে হয় তারা এখনো শিশু। ছোটখাটো মতভেদ তাদের চোখে ‘তিলকে তাল’। নিজেদের অনভিজ্ঞতা বা ভুল বিশ্বাসের কারণে তুচ্ছ ঘটনাকে জীবনের চরম বিপর্যয় মনে করে। এরই মাঝে যখন পরিবারে সন্তান আসে, তখন পরিস্থিতি হয়ে উঠে আরও ভয়াবহ। একে তো নিজেদের সামলাতেই তারা হিমশিম খাচ্ছে, তার ওপর সন্তানের দায়িত্ব—সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়। অথচ তারা যদি অভিজ্ঞ কোনো বড় মানুষের বা মেন্টরের ছায়ায় থাকত, তবে অনেক সহজ সমাধান পাওয়া যেত।
৪. মেন্টরশিপ বা ম্যারিজ কাউন্সিলিংয়ের প্রয়োজনীয়তা
স্বামী যখন স্ত্রীর এই মানসিক অবস্থাকে বুঝতে না পেরে অভিযোগ করে বলেন—তুমি নিজেই তো ইসলামি জীবন চেয়েছিলে, ঘরে থাকতে চেয়েছিলে, তবে এখন কেন খারাপ লাগছে? তখন সমস্যাটি আরও ঘনীভূত হয়। এই ধরনের মন্তব্য বা অসংবেদনশীলতা দম্পতিদের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়, যা প্রকারান্তরে বিচ্ছেদ বা তিক্ততার দিকে নিয়ে যায়।
আগেকার দিনে ঝগড়া হলে বাবা-মা বা চাচা-ফুফুরা এসে সমাধান করতেন।
কিন্তু এখনকার যুগে অনেক সময় দেখা যায়, পরিবারের সদস্যরাই পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলেন। হয়তো মেয়েটি তার কোনো আপাকে কিছু বলল বা ছেলেটি তার বাবাকে বলল—তারা সমাধানের বদলে উলটো জেদ বাড়িয়ে দেন। কারণ এ যুগের চ্যালেঞ্জগুলো বোঝার মতো সেন্সিবিলিটি সবার থাকে না।
ঠিক এ জায়গাতেই প্রয়োজন একজন ‘থার্ড পার্টি’ বা নিরপেক্ষ মেন্টর। একজন কাউন্সিলর বা বিজ্ঞ মেন্টর যখন বলেন, ‘এটা কোনো সমস্যাই না, তোমরা এভাবে চিন্তা করো’, তখন দম্পতিরা বুঝতে পারে তারা ভুল পথে ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক এই ‘মেন্টাল হেলথ লিটারেসি’ বা ম্যারেজ কাউন্সিলিং এখন বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি। বিয়ের আগে এবং বিয়ের পরের কয়েক বছর যদি দম্পতিরা কোনো বিশেষজ্ঞের ‘অবজারভেশনে’ থাকে, তবে তুচ্ছ কারণে আজ এত ঘর ভাঙত না।"
আমার লিখিত 'জেন্ডার প্রতারণা'- বই থেকে
#এ_যুগের_চ্যালেঞ্জ