ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র সর্বশেষ পর্ব ধারণ করা হয়েছে নরসিংদীতে। নাগরিক পার্টির ইমামবাড়া গোলাম সরোয়ার তুষার কিছুক্ষণ আগে এ-ব্যাপারে লিখেছে— ‘যে-জেলায় ইত্যাদি হয়, সেই জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরা ইত্যাদির পুরোনো রেওয়াজ। ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিশেবে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের শহিদ আসাদ, ভাই গিরীশচন্দ্র সেনের বসতভিটা, সমাধিস্থল, জাদুঘর, লাইব্রেরি দেখানো হলো। তাদের কীর্তি ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাসও বর্ণিত হলো। নরসিংদীর সন্তান হিশেবে অবশ্যই আমরা গর্বিত। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করলাম হানিফ সংকেতের চৈতন্যে জুলাই নেই, জুলাইয়ের নরসিংদী নেই। জুলাইয়ের নরসিংদীর বীরোচিত কারাবিদ্রোহের ইতিহাস নাই। শহিদ তাহমিদ, শহিদ ইমন বা শহিদ রাব্বি নেই। জুলাইয়ের উত্তাল নরসিংদী হানিফ সংকতের চৈতন্যে নাই। উপস্থিত দর্শকদের জন্য সাজানো কুইজের প্রশ্নে নরসিংদীর সন্তান কবি শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ আছেন; নাই সেরেফ জুলাই।’
ইতিহাস একদিনে বা এক-দেড়-দুই বছরে তৈরি হয় না। ইতিহাস তৈরি হতে দশকের পর দশক সময় লাগে। দশকের পর দশক ধরে তর্ক-বিতর্ক চলার পর একটা ইতিহাস মীমাংসিত হয়। এরপর তা সর্বজনশিরোধার্য হয়, পাঠ্যপুস্তকে উঠে আসে, অরাজনৈতিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানেও নিশ্চিন্তে ঠাঁই পায়। অবশ্য, দশকের পর দশক ধরে তর্ক-বিতর্ক চলার পরও কোনো-কোনো ইতিহাস অমীমাংসিতই থেকে যায়, কালের বিবর্তনে হারিয়ে যায়। অমুসলমান হওয়া সত্ত্বেও নরসিংদীর গিরীশচন্দ্র সেন কোরানের প্রথম বঙ্গানুবাদকারী হিশেবে স্বীকৃত। এই ভদ্রলোক মারা গেছেন একশো ষোলো বছর আগে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে মারা যাওয়ায় এবং এই ফাঁকে তাকে নিয়ে কোনো বিতর্ক না-হওয়ায় ইতিহাসে তিনি স্থায়ী আসন পেয়ে বসে আছেন। বৃহত্তর জামায়াতে ইসলামি অপছন্দ করলেও শামসুর রাহমান বাংলা কবিতার ইতিহাসে অমরত্ব পেয়ে গেছেন। কোনো ছুঁচো-কেঁচো নিন্দেমন্দ করে শামসুর রাহমানের অমরত্বের কেশাগ্রও নষ্ট করতে পারবে না। মতিউর রহমান নিহত হয়েছেন পঞ্চান্ন বছর আগে। পাকিস্তানের পাইলট অফিসার রশিদ মিনহাজের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিমান ছিনিয়ে বাংলাদেশে আনতে গিয়ে মতিউর রহমান নিহত হয়েছিলেন, মতিউর রহমানকে প্রতিহত করতে গিয়ে নিহত হয়েছিলেন রশিদ মিনহাজও। পাকিস্তান রশিদ মিনহাজকে বীর হিশেবে স্মরণ করে, মতিউর রহমানকে গাদ্দার হিশেবে। বৃহত্তর জামায়াতে ইসলামিও রশিদকে বীর এবং মতিউর রহমানকে গাদ্দার মনে করে। কিন্তু তাতে মতিউর রহমানের কিছুই যায়-আসেনি। মতিউর রহমান ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছেন ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ হিশেবে। মতিউর রহমানকে নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। তিনি চূড়ান্তভাবে মীমাংসিত।
কিন্তু বৃহত্তর জামায়াতে ইসলামি জুলাইয়ের ব্যাপারে ভীষণ অস্থির। জামায়াতে ইসলামি একাত্তরেরও পরাজিত শক্তি, সাতচল্লিশেরও পরাজিত শক্তি। তাই, জামায়াতের তড়িঘড়ি করে একটা নতুন স্বাধীনতা দরকার, নতুন সংবিধান দরকার, নতুন জাতীয় সংগীত দরকার, দেশের জন্য নতুন নাম দরকার, দরকার জাতির নতুন পিতা। ছাত্রদের রক্তাক্ত লাশ দেখে সারাদেশের মানুষ জুলাই আন্দোলনে অংশ নিলেও আন্দোলনের একক মালিকানা হাতিয়ে নিয়েছে জামায়াত। পেছনে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা বা মার্কিন মেটিকিউলাস ডিজাইন আছে জানলে জুলাইয়ে কাকপক্ষীও রাজপথে নামত না। ফলে, জুলাইকে মীমাংসিত হতে দিতে আরও সময় লাগবে। কিন্তু অমীমাংসিত জুলাইকে মীমাংসিত হতে দিতে বৃহত্তর জামায়াত কোনো সময় দিতে চায় না। টাকায় জামায়াতের জুলাই গ্রাফিতি লাগবে, পাঠ্যপুস্তকে জুলাই লাগবে, সংবিধানে জুলাই লাগবে। বাকি ছিল হানিফ সংকেতের ইত্যাদি। জামায়াতের সেখানেও জুলাই লাগবে, জবরদস্তি করে হলেও লাগবে, মীমাংসিত হওয়ার আগেই লাগবে।
এত তাড়াহুড়ো করলে চলবে না। মীমাংসিত হতে জুলাইকে অন্তত দশটা বছর সময় দিতে হবে। দশ বছর পর জুলাই নিজেই নিজের জায়গা খুঁজে নেবে। হানিফ সংকেত যদি তখনও বেঁচে থাকেন এবং তখনও যদি ‘ইত্যাদি’ বানান, তা হলে নিশ্চয়ই তিনি তখন ইত্যাদিতে জুলাই রাখবেন। দর্শকদের জন্য সাজানো প্রশ্নের তালিকায় হানিফ সংকেত নিশ্চয়ই এ-রকম প্রশ্ন রাখবেন— ‘জুলাইযোদ্ধা নীলা ইসরাফিলকে লাগাতে চাওয়া আরেক জুলাইযোদ্ধা গোলাম সরোয়ার তুষারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই নরসিংদীতেই। বলতে হবে তার জন্মস্থান নরসিংদীর কোন থানার কোন ইউনিয়নে এবং নীলা ইসরাফিলকে তিনি কবে লাগাতে চেয়েছিলেন, কী বলে লাগাতে চেয়েছিলেন। ওখানে একজন হাত তুলেছেন— লাল শাড়ি, শাদা ব্লাউজ। হ্যাঁ, আপনার উত্তর সঠিক হয়েছে। লাল শাড়ির জন্য করতালি। কী নাম আপনার? কী করেন আপনি? নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী জুলাইকা অরোরা, আপনি চলে আসুন মঞ্চে।’
বিজয়ী দর্শকের হাতে কেয়া কসমেটিকসের পক্ষ থেকে কম্পিউটার ও সবসময়কার মহামূল্যবান পুরস্কার বই তুলে দেওয়ার জন্য হানিফ সংকেত কাকে ডাকবেন, জানি না। তবে, বিজয়ীর হাতে পরিবেশবন্ধু গাছ তুলে দেওয়ার জন্য হানিফ সংকেত তখন যে নরসিংদীর বীরোচিত বাড়াবিদ্রোহের মহানায়ক গোলাম সরোয়ার তুষারকেই ডাকবেন, এ-ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। বিজয়ীর হাতে গাছ তুলে দিয়ে তুষার বলবে— আমি লাগাতে পারিনি, আপনার