ওঝা আসলো রাত নয়টার দিকে। তিনি বললেন, ঘর অন্ধকার করো। কেউ শব্দ কইরো না। বাইরের লোক ঢুকতে দিও না। অবাক ব্যাপার ওই তিনটা নির্দেশের সাথে চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটা মিল আছে। এই রোগীকে শান্ত আর অন্ধকার জায়গায় রাখতে বলা হয়, কারণ আলো আর শব্দে খিঁচুনি বাড়ে। তাই মাঝে মাঝে ওঝার ঘরেও রোগী ভালো হইয়া যাইত। আর সবাই ভাবত, ওঝার কাজ হইসে। ওই কারণেই বিশ্বাসটা টিকসে, বংশের পর বংশ।
কিন্তু একটা জিনিস ওঝা দিতে পারতেন না। খিঁচুনি থামানোর একটা ওষুধ আছে। ম্যাগনেসিয়াম সালফেট। সস্তা ওষুধ, ইনজেকশন। আর এই রোগের একমাত্র নিশ্চিত চিকিৎসা হইল বাচ্চা আর গর্ভফুলটা বাইর কইরা আনা। কারণ রোগের উৎস ওই গর্ভফুলেই। মানে যতক্ষণ ওইটা ভিতরে আছে, ততক্ষণ কোনো ফুঁ, কোনো পানিপড়া, কোনো তাবিজে সাময়িক উপকার হবে, নিরাময় হবেনা।
সেই রাতে আয়েশার তিনবার খিঁচুনি উঠল। ওঝা ফুঁ দিলেন। পানিপড়া খাওয়ানোর চেষ্টা হইল, কিন্তু আয়েশা গিলতে পারতেসিল না। তার শাশুড়ি সারা রাত তার মাথাটা কোলে নিয়া বইসা ছিলেন। আর তার স্বামী দাঁড়ায়া ছিল দরজার কাছে। ছেলেটার বয়স বাইশ। সে একবারও ভিতরে ঢুকে নাই। কেউ তাকে ঢুকতে বলেও নাই।
খিঁচুনির সময় আয়েশার হাত দুইটা মুঠ হইয়া যাইতেসিল। আর ওই মুঠ করা বাঁ হাতের অনামিকায় ওই রুপার আংটিটা। রাত দুইটার দিকে ওঝা বললেন, খারাপ বাতাসটা ছাড়তেসে না। আরও শক্ত কিছু লাগবে।
তখন কেউ একজন বলল, চাচা, হাসপাতালে নিলে হয় না? হাসপাতাল-ওই কথাটা বলতে সাত ঘণ্টা লাগল। তারা রওনা দিল রাত তিনটায়। ভ্যান, তারপর রাস্তায় উইঠা একটা অটো। উপজেলা হাসপাতাল আঠারো কিলোমিটার। পথে আরেকবার খিঁচুনি উঠল। অটোর ভিতরে, অন্ধকারে, রাস্তার ঝাঁকুনির মধ্যে। শাশুড়ি মেয়েটাকে জড়ায়া ধইরা বইসা ছিলেন।
এই দেশে প্রসব বা গর্ভাবস্থাজনিত কারণে যত মা মারা যান, তাঁদের উনিশ শতাংশের মৃত্যু হয় রাস্তায়। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই। আর তাঁদের তেত্রিশ শতাংশ মারা যাওয়ার আগে তিন বা তার বেশি জায়গায় চিকিৎসা খুঁজতে গেসিলেন। মানে একটা পরিবার রোগীকে নিয়া এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটতেসে, আর প্রতিটা জায়গা থেকে বলা হইতেসে, এইখানে হবে না, অন্যখানে যান।
আয়েশা উপজেলা হাসপাতালে পৌঁছাইল ভোর পাঁচটায়। ডাক্তার দেখলেন। তারপর বললেন, এইখানে হবে না। জেলা সদরে নিয়া যান।
২০১৭ সালের স্বাস্থ্য সুবিধা জরিপে দেখা গেছে, ইনজেকশনযোগ্য ম্যাগনেসিয়াম সালফেট পাওয়া যায় বাংলাদেশের মাত্র চোদ্দ শতাংশ জেলা পর্যায়ের সরকারি প্রতিষ্ঠানে। আর যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক প্রসব করানো হয়, তার দুই তৃতীয়াংশে খিঁচুনি থামানোর কোনো ওষুধই ছিল না। আর ওই একই জরিপ বলতেসে, ২০১৪ সালের পর এই ওষুধের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমসে। কমসে। জ্বি লিখতে ভুল হয় নাই।
তারা আবার রওনা দিল। আয়েশা জেলা হাসপাতালে পৌঁছাইল সকাল আটটায়। ইনজেকশন দেওয়া হইল। কিন্তু ততক্ষণে তার শরীরটা নিস্তেজ হইয়া গেছে।
আয়েশা মারা যায় দুপুরের দিকে। বাচ্চাটাও বাঁচে নাই। সন্তান জন্ম দিতে গিয়া মারা যাওয়া প্রতি একশজন হতভাগ্য মায়ের তেইশজনের গল্প প্রায় এইটাই। রক্তক্ষরণের পরেই এই রোগটা দ্বিতীয়। মানে প্রতি চারজন মৃত মায়ের প্রায় একজন।
আয়েশার মায়ের কাছে খবর গেসিল সকালবেলা। তিনি তখন মানুষের বাড়িতে কাজে। খবরটা শুইনা তিনি শুধু বলসিলেন, কী হইসে আমার মেয়ের। যিনি খবর দিসিলেন, তিনি পুরাটা বলেন নাই। বলসিলেন, অসুখ করসে, জেলা হাসপাতালে আছে, তাড়াতাড়ি আসেন। তাঁর গ্রাম থেকে জেলা শহর তিন ঘণ্টার পথ। তিনি পৌঁছাইলেন বিকাল চারটায়। হাসপাতালের বারান্দা দিয়া হাঁটতে হাঁটতে তিনি ভাবতেসিলেন, কী এমন অসুখ যে জেলায় আনতে হইল। তারপর যে ঘরটায় ঢুকলেন, ওইটা থেকে কেউ বাইর হইয়া যাইতেসিল চোখ মুছতে মুছতে।
মেয়েটা মারা গেছে দুপুরে।
মানে তিনি তাঁর মেয়েকে জীবিত দেখেন নাই। তিনি যা দেখলেন, ওইটা একটা ঢাকা দেওয়া শরীর। আর ঘরের এক কোণায় আয়েশার শাশুড়ি বইসা আছেন, হাতে একটা ভেজা কাপড়। তিনি কাপড়টা সরাইলেন। মেয়েটার চোখ দুইটা বন্ধ, মুখটা ফোলা। তিনি অনেকক্ষণ তাকায়া রইলেন। তারপর বললেন, আমার মেয়েটা তো এমন ছিল না।
দুই মহিলা অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বললেন না। তারপর শাশুড়ি উঠে আসলেন। আর বললেন, আপা, আমি ওর আংটিটা খুলতে পারি নাই। আঙুল ফুইলা গেছে। আয়েশার মা বললেন, থাক। তারপর বললেন, ওইটা ওর কাছেই থাকুক। তারপর তিনি মেয়ের হাতটা ধরলেন। ওই হাতটা, যেই হাত ধইরা তিনি বিয়ের দিন বলসিলেন আংটিটা হারাইস না। আয়েশাকে ওই আংটিসহই দাফন করা হইসিল।
আয়েশার প্রতিটা চেকআপে রক্তচাপটা মাপা হইলে জিনিসটা ধরা পড়ত। একটা যন্ত্র, দুই মিনিট। আর ওই উপজেলা হাসপাতালে ওষুধটা থাকলে সে ওইখানেই বাঁইচা যাইত। আঠারো কিলোমিটারেই চিকিৎসা পাইত।