রোমান্টিক গল্প
Open in Telegram
এখানে রোমান্টিক গল্প পাবেন। Email us: panutaru319@gmail.com গল্পঃ গুলো নিয়ে কারোর কোনো মতামত থাকলে আমাকে message করতে পারো @Panutaru_bot অন্যান্য channel গুলো: https://t.me/addlist/WK8ntttrKkkzOTZl https://t.me/mytelegramchannelslink
Show more626
Subscribers
No data24 hours
No data7 days
No data30 days
Posts Archive
শিষ্যটি গাছের দিকে তাকায় আকাশে তখন পূর্ণিমার সম্পূর্ণ উজ্বল চাঁদ দেখা যাচ্ছে যার আলোয় চারিদিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে, একটু ভালো করে দেখতেই শিষ্যটি দেখতে পেলেন গাছের একদম উপরের দিকে একটা ডালে একটা পাখির বাসা এবং তাতে দুটো পাখি বসে আছে একে অপরের গা ঘেঁষে একে অপরের চঞ্চুতে চঞ্চু লাগিয়ে কখনো গলায় গলা ঘষে আদর প্রকাশ করছে, প্রেম নিবেদন করছে। যদিও শিষ্য ঠিক বুঝতে পারলেন না ওটা কি পাখি? তিনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে গুরুর দিকে তাকালেন, গুরু একটু স্মিত হেসে বললেন "আজ ওদের মিলনের রাত, এত বছরের অপেক্ষা, বিরহ আজ শেষ আজ ওরা চিরতরে একে অপরের কাছে বাধা পড়ে গেছে অবশ্য এটা তো হওয়ারই ছিল, ওদের ভাগ্যই তো ওদের এক সাথে বেধে রেখেছে ওদের তো এক হতেই হতো। শিষ্য বুঝলেন তার গুরু পাখি দেখিয়ে অন্য কারো কথা বলছে কিন্তু কে সেটা বুঝতে পারছে না এতক্ষণে বাকি শিষ্যরাও উঠে পড়েছে তারা গুরুকে ঘিরে বসে পড়েছেন তাদেরই একজন জিজ্ঞেস করেন "গুরুদেব তাহলে তো ওদের জীবন এবার সুখেই কাটবে কারণ আপনিই বলেছিলেন ভালোবাসাই জীবনে সুখের সন্ধান দেয়"।
গুরু আবার স্মিত হাসি দেন, বলেন "সুখ বা দুঃখ কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়, সেটা চক্রাকারে আবর্তিত হতে থাকে ঠিক যেমন দিন আর রাত এর বিরাম নেই চলতেই থাকে ঘুরতেই থাকে"।
তার মানে গুরুদেব আবার ওদের জীবনে দুঃখ নেমে আসবে?
জীবনের পরীক্ষা তো চলতেই থাকে, সেই পরীক্ষা থেকে পালানোর উপায় নেই।
বাণিজ্যনগরীর এক অন্ধকার ঘরে, পুরো অন্ধকার নয় একটা নাইটল্যাম্প জ্বলছে ঘরে তাতে ঘরটাকে আরও রহস্যময় মনে হচ্ছে, সোফার উপর এক তরুণী যুবতী বসে আছে বয়স ২৭-২৮, পরনে একটা পরু স্ট্রিপের টপ, আর শর্ট প্যান্ট সোফার সামনে দুটো অ্যালকোহলের বোতল যার একটা পুরো এবং অপরটা অর্ধেক খালি পাশে একটা গ্লাস আর একটা পাত্রে বরফ, আর একটা জলের জগ, টেবিলেই একটা ল্যাপটপ রাখা তাতে স্ক্রিনে এক দম্পতির ছবি, অভয় আর তাথৈএর ছবি, যুবতী গ্লাসে কিছুটা অ্যালকোহল ঢেলে তাতে কিছুটা জল মেশায় তারপর দুটো বরফের টুকরো গ্লাসে দেয় এবার গ্লাসটা হাতে তুলে এক চুমুকে প্রায় শেষ করে ফেলে। এই সময় দরজায় নক হবার শব্দ আসে, যুবতী নেশা জড়ানো গলায় বলে "আসুন"
একটা পুরুষের অবয়ব দেখা যায়, যুবতী বলে "আপনার ভাইকে এআরসি জেলে দিয়েছিল মনে আছে?"
আছে। পুরুষটি গম্ভীরকণ্ঠে বলে।
প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছা করে না?
না।
না? যুবতীটি বিস্ময় প্রকাশ করে।
না।
তাহলে এখানে এসেছেন কেন?
আপনাকে কয়েকটা কথা বলতে।
কি?
আমার ভাইকে এআরসি জেলে দিয়েছিল এটা ঠিক কারণ সে একটা গর্হিত অপরাধ করেছিল এবং সেখানে সে আত্মহত্যা করে কিন্তু এআরসি আমার সাথে শত্রুতা করেনি, কিন্তু এখন যদি আমি ওর বিরুদ্ধে কিছু করি তাহলে ও আমাকে শেষ করতে দুবার ভাববে না।
আপনি ওকে ভয় পাচ্ছেন?
এই শহরের প্রায় সবাই ওকে যেমন ভয় পায় তেমনি সম্মান করে আবার অনেকে ভালোওবাসে, আপনার সাথে আমার পারিবারিক পরিচয় আছে তাই সাবধান করছি, এআরসির বিরুদ্ধে যাবেন না কারণ ও যদি জানতে পারে তাহলে আপনাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না, এআরসি ছাড়ুন আমির যদি জানতে পারে কিংবা আমিরও ছাড়ুন এই শহরের যেকোনো সাধারণ খেটে খাওয়া লোক যদি জানতে পারে যে আপনি এআরসির ক্ষতি করতে চাইছেন তাহলে ওরাই আপনাকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করবে তাই..
বেরিয়ে যান এখান থেকে। হটাৎ যুবতী চিৎকার করে ওঠে, বেরিয়ে যান নাহলে এখন আমি আপনাকে মেরে ফেলবো।
পুরুষটি বেরিয়ে যায়, ঘরে যুবতী একা সে ল্যাপটপের ছবির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, এবার সে স্বগতোক্তি করতে থাকে "ছোটো থেকেই যেটা আমার পছন্দ হয়েছে সেটা আমি নিয়েছি এটাই আমার অভ্যাস, তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছিল এআরসি, সেই তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম একটা বারে, আমাকে একা পেয়ে যখন কিছু বদমাইশ ছেলে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করছিল তখন তুমি আমাকে ওদের হাত থেকে উদ্ধার করেছিলে, তারপর অনেক খুঁজে তোমার সম্বন্ধে জানলাম তোমার অফিসে তোমার পিএ হিসাবে চাকরি নিলাম যাতে সবসময় তোমার কাছে থাকতে পারি তোমার পাশে থাকতে পারি, তারপর থেকে প্রতিদিন চেষ্টা করতাম তোমাকে ইমপ্রেস করার, তোমার মন জয় করার কিন্তু পারিনি, তুমি আমার দিকে নজরই দাওনি তবুও আমি চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম কিন্তু আজ তুমি কোথা থেকে একটা মেয়েকে নিয়ে এসে বিয়ে করে নিয়েছো... এটা আমি কিছুতেই সহ্য করবো না, তুমি আমার আর যদি তোমাকে আমি নিজের করে না পাই তাহলে তোমাকে অন্য কারো হতেও দেবো না, ওই মেয়েটা তাথৈ ও আমাদের মাঝে এসে ভুল করেছে ওকে সরতে হবে, আর তা নাহলে তোমাকে এই পৃথিবী থেকে সরতে হবে, আমাকে ইগনোর করে তুমি আমাকে অপমান করেছো তার মূল্য তো চোকাতেই হবে মিস্টার এআরসি, হয় তোমাকে নিজের করে নেবো ওই তাথৈকে মেরে আর নাহয় তোমাকে মেরে আমাকে অপমান করার প্রতিশোধ নেবো... প্রতিশোধ।
সমাপ্ত
রাতে নিজের রুমে ঢুকলো অভয়, পুরো ঘরটা চমৎকার ভাবে সাজানো হয়েছে, তার উপরে সুগন্ধি ছড়ানো হয়েছে ফলে পুরো ঘরেই সুগন্ধে ভরপুর, উচ্চ পাওয়ারের লাইট নয়, ছোটো ছোটো প্রদীপের মতো দেখতে লাইট দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।এছাড়া সারা ঘরে লাইটিংএর আলো আঁধারির খেলা চলছে, মেঝেতে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে আলপনার মতো সাজানো হয়েছে, বিছানাতেও গোলাপের পাপড়ি দিয়ে সাজানো আর তার উপরে ঘোমটা টেনে বসে আছে তাথৈ, পরনে সোনালী রঙের জড়ির কাজ করা টকটকে লাল চোলি ও সেম ডিজানের টকটকে লাল লেহেঙ্গা, মাথায় টিকলি, যেটা সিঁথিতে সিঁদুরের উপরে আছে, কানে ঝুমকো, নাকে নোলক, গলায় সোনার চেইন এবং মঙ্গলসূত্র, দুহাতে মেহেন্দি, কবজির অনেকটা উপর পর্যন্ত সেম লাল রঙের চুরি সাথে সোনার বেশ কয়েকটা চুরিও আছে, দুহাতে এবং দুপায়ের নখে কাপড়ের সাথে ম্যাচিং লাল নেলপালিশ, ঠোঁটেও লাল লিপস্টিক, কপালে টিপ, পায়ে নূপুর। অভয় আস্তে আস্তে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল, তাথৈও ঘোমটার ভিতর থেকে দেখছে তার প্রিয়তম পুরুষটিকে, অভয়ের পরনে সিলভার রঙের ডিজাইন করা কালো কুর্তা পাঞ্জাবি, গলায় উত্তরীয়, ক্লিন শেভড গাল এবং ঘাড় পর্যন্ত লম্বা চুল একটু ছোটো করে কাটা,।মাঝখান থেকে সিঁথি করে দু সাইডে পিছন দিকে আচড়ানো, অভয় এমনিতেই সুদর্শন কিন্তু আজ তাথৈ যেন চোখ ফেরাতে পারে না সে ঘোমটার ভিতর থেকেই একদৃষ্টিতে দেখতে থাকে অভয়কে।
অভয় বিছানায় বসে আস্তে করে ঘোমটা তোলে এতক্ষণে তাথৈএর মুখ দৃশ্যমান হয় তার কাছে, অত্যন্ত মোহময়ী লাগছিল তাথৈকে, এতক্ষণ তাথৈ অভয়কে দেখছিল এখন অভয়ও মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে হারিয়ে যেতে থাকে এতে খুব সম্ভবত তাথৈ একটু লজ্জা পায় সে চোখ নামিয়ে ফেলে বলে "কি দেখছো?"
তোমাকে।
কেন? এত দেখার কি আছে?
তুমিও তো দেখছিলে আমাকে।
বেশ করেছি, আমার বর আমি দেখছিলাম।
তাহলে আমিও বেশ করেছি আমার বউকে আমি দেখছিলাম। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ তারপর অভয় বলে "তোমার মনে আছে তোমার কাছে আমার একটা জিনিস পাওনা বাকি আছে?"
তাথৈ মুখ তুলে তাকায় ওর ভ্রু কুঁচকে গেছে বলে "কি জিনিস?"
কেন মনে নেই? তুমি বলেছিলে তোমার যেদিন ১৮ বছর বয়স হবে সেদিন দেবে।
একটু ভাবতেই তাথৈএর মনে পড়ে যায় কয়েকবছর আগের সেই পুরনো মন্দিরের পিছনের বাগানের বটতলায় এক বিশেষ দিনের কথা, সঙ্গে সঙ্গে সে আবার লজ্জায় মুখ নামিয়ে ফেলে বলে "তুমিই আসতে দেরী করেছো আমি কি করবো?"
কি করবে মানে? আজ দেবে।
হবে না, তুমি দেরী করে ফেলেছো।
ঠিক তো?
হুমম।
বেশ তাহলে আমিও চললাম।
চললাম মানে কোথায়?
কেন তোমাকে বলেছি তো ববিতা আমাকে ডিনারে ডেকেছিল, মায়ের কথায় দেখা করতে গিয়েছিলাম শুধু এটুকুই মিথ্যা ছিল এটুকু বাদে বাকিটা সত্যি ছিল ,এখনো আমাকে ডাকছে ডিনারে।
তাথৈএর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল সে অভয়ের কুর্তার কলার ধরে বিছানায় টেনে শুইয়ে ওই বুকের উপর চেপে বললো "মিস্টার অভয় রায় চৌধুরী একটা কথা মন দিয়ে শোনো আর মগজে ঢুকিয়ে নাও আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে এখন তুমি আমার, শুধু আমার অন্য কোনো মেয়ের দিকে যদি তাকিয়েছো তাহলে তোমার জন্য কতটা খারাপ হবে সেটা তুমি ভাবতেও পারছো না"
কি করবে?
দেখতেই পারবে, মা তো বলেই দিয়েছেন ওনার ছেলেকে শোধরানোর দায়িত্ব উনি আমাকে দিয়েছেন।
অ্যাঁ।
আজ্ঞে হ্যাঁ এবার বুঝতে পারছো তো যে আমি পার্মিশন পেয়েই গেছি।
অভয় এবার এক ঝটকায় তাথৈকে বিছানায় শুইয়ে নিজে ওর পাশে কাত হয়ে শুয়ে শরীরের অর্ধেক তাথৈএর উপর তুলে বলে "মিসেস তাথৈ রায় চৌধুরী, আমি এখন সেই পুরনো অভয় নেই যে তোমার হাতও ধরবে না এখন এই অভয় নিজের পাওনা কখনো ছাড়ে না, আমার যেটা পাওনা সেটা তো আমি নেবোই"।
কি চাই তোমার?
অভয় কথা না বলে আস্তে আস্তে নিজের ঠোঁট দুটো তাথৈএর দুটো ঠোঁট লক্ষ্য করে নামিয়ে আনে, তাথৈ দুহাতে অভয়ের গলা জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে তবে এবার আর তাকে অপেক্ষা করতে হয় না বা কারো ডাকও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না, দুজনেই একে অপরকে গাঢ় প্রেমচুম্বনে আবদ্ধ করে।
প্রায় ১২০০ মাইল দূরে অন্য এক শহরের শিব মন্দিরের চাতালে এখন সাধু রাত্রির জন্য আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, একজনই প্রধান গুরু বাকিরা তার শিষ্য, রাতে গুরুকে না ঘুমিয়ে একটু দূরে একটা বট গাছের উপরে তাকিয়ে থাকতে দেখে তার এক শিষ্য জিজ্ঞেস করেন "গুরুদেব, ওখানে কি দেখছেন?"
তুমিও দেখো কি দেখতে পারছো?
ডেকেছি কিন্তু রোহিতের পরীক্ষা চলছে তাই আসতে পারেননি, পরে এসে তোমাদের সাথে দেখা করবেন। তবে শুধু আমার বাবার জমিটা যেটা তোমার বাবা নিয়েছিলেন ওটা আমি নিলাম।
বেশ, তাই হবে। বৃষ্টি শান্ত স্বরে বললো।
অমিয়র মুখ একটু ছোটো দেখে অভয় জিজ্ঞেস করে "কি রে তোর আবার কি হলো?"
তোরা এখানে থাকবি, আমাকে ওখানে ফিরে যেতে হবে, আবার কবে তোদের সাথে দেখা হবে কে জানে।
তা কেন? আমির বলে ওঠে, অমিয় তুমি যে কোম্পানিতে কাজ করো সেটার একটা ব্রাঞ্চ এই শহরে আছে আর ওই কোম্পানির এমডি আমাদের পরিচিত তোমাকে এখানে ট্রান্সফার করিয়ে নিয়ে আসছি চিন্তা কোরো না।
"উঠুন.. উঠুন" অভয় ডাকতে থাকে, বীরেন বাবু উঠে আবার অভয়ের বাহাতের বাহুতে আঘাত করে, এবার অভয়ের ব্যাথা অনুভূত হয় তার চোখমুখ একটু কুঁচকে যায় কিন্তু বীরেন বাবু আবার আঘাত করতে উদ্যত হলে আবার সে হাতটা ধরে অপর হাত দিয়ে বীরেন বাবুর তলপেটে পরপর কয়েকটা ঘুষি মারে, তারপর হাতটা ছেড়ে দিয়ে আবার বুকে জোড়ে লাথি মারে, বীরেন বাবু আবার নীচে পড়ে যান কিন্তু এবার তিনি দ্রুত উঠতে পারেন না, কোনোমতে উঠে অভয়কে আবার মারতে চাইলে আবার অভয় হখত ধরে অপর হাতে তলপেটে পরপর ঘুষি মারতে থাকে, তারপর চোয়ালে একটা ঘুষি মারে, বীরেন বাবু কয়েকপা পিছিয়ে যান কিন্তু তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে যে আর তার লড়ার শক্তি নেই তার দমেও ঘাটতি পড়েছে তিনি টলছেন কোনোমতে এগিয়ে আসছেন কিন্তু অভয়ের ঘুষি, লাথি খেয়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছেন, তারপর আবার উঠছেন আবার মার খেয়ে পড়ে যাচ্ছেন, এভাবে কিছুক্ষণ চললো একসময় দেখা গেল বীরেন বাবু আর পারছেন না, তখন অভয় পিস্তল বার করলো বললো "বলেছিলাম না আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আপনার চোখে চোখ রেখে কপালে গুলি করবো" কথাটা বলে অভয় সোজা পিস্তলটা বীরেন বাবুর কপালে তাক করে এতক্ষণে বীরেন বাবু বুঝতে পারেন কি হতে যাচ্ছে, তিনি ডুকরে কেঁদে ওঠেন বারবার অনুরোধ করতে থাকেন তাকে না মারার জন্য "অভয়.. অভয় আমার ভুল হয়ে গেছে আমাকে মেরোনা দয়া করো আমাকে, অভয়.." কিন্তু অভয় তার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ট্রিগার চাপে, সঙ্গে সঙ্গে একটা আওয়াজ আজ বীরেন বাবুর কপালে আর মাথার পিছনে গুলি ঢোকা আর বেরোনোর ছিদ্র হয়ে কিছুটা রক্ত বেরিয়ে এল এবং তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন, কিন্তু অভয়ের যেন শান্তি হলো না সে পাগলের মতো মৃত বীরেন বাবুর উপরে পিস্তলের বাকি গুলি চালাতে লাগলো আর চেঁচিয়ে বলতে লাগলো "কেন আমার বাবাকে মেরেছিলেন, কেন? এখন দেখান আপনার ক্ষমতা উঠুন" শেষে যখন আর গুলি বেরোচ্ছে না তখন পিস্তল ফেলে হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে একবার চেঁচিয়ে উঠলো "বাবাআআআআআআ আমি প্রতিশোধ নিয়েছি, তোমাকে যে আমার থেকে কেড়ে নিয়েছিল আমি তাকে শেষ করেছি, বাবাআআআআ" তারপর মাথা নীচু করে দুহাতে মুখ চেপে কাঁদতে থাকে।
বেশ কয়েকমাস পরে,
বাণিজ্যনগরীতে এআরসি ম্যানসনে তুমুল ব্যাস্ততা আর লোকজনের ভিড়, অমৃতাদেবী আর বিন্দুমাসির দম ফেলবার ফুরসৎ নেই ওনারা অতিথি আপ্যায়নে এবং তাদের দেখাশোনায় ব্যস্ত আর হবে নাই বা কেন? শহরের বেতাজ বাদশা, বিজনেস টাইক্যুন "এআরসি"র বিয়ের রিসেপশন, কিছুদিন আগেই সে বাণিজ্যনগরীতে ফিরেছে আর আসার কয়েকদিন পরে বিয়ে করেছে বিয়েটা অনাড়ম্বরভাবে হলেও রিসেপশন বড়ো জাঁকজমকপূর্ণভাবে হচ্ছে, শহরের সব বড়ো বড়ো বিজনেসম্যান, ফিল্মস্টার, পলিটিশিয়ান রা আসছে সাথে সাধারণ মানুষরা তো আছেই, বিশেষ করে অসংখ্য ছোটো ছোটো বাচ্চারা তারা আনন্দ করছে এসব দেখে পণ্ডিতজী অভয়ের কাছে এলেন বললেন "রয় তোমার নিজের সিকিউরিটির প্রতি একটু নজর দেওয়া উচিত"
কেন?
কেন আবার বলতে হবে? এই শহরে তোমার কত শত্রু আছে তার হিসাব রাখো?
দরকার কি আপনি আছেন তো?
যদি আমিই তোমাকে মারতে চাই?
চলুন নিরিবিলিতে চলুন সেখানে মারবেন।
পণ্ডিতজী কৃত্তিম রাগ দেখিয়ে বলেন "তুমি শোধরাবে না, তাই না?"
অভয় শান্ত স্বরে বলে "পণ্ডিতজী এই সব লোকেরাই আমাকে তখন আপন করে নিয়েছিল যখন আমার কিছু ছিল না একদম নিঃস্ব ছিলাম, আর আজ সবকিছু হয়েছে বলে ওদের কিকরে দূরে সরিয়ে দিই বলুন, তাহলে আমিও কি বেইমানের দলে পরবো না?"
"আহমেদ ঠিকই বলতো রয়, তুমিই ওর পরে ওর জায়গা সামলানোর যোগ্য লোক,সবসময় আহমেদের মতো সবার কথা ভাবো অসহায়, দুর্বলদের পাশে থাকো কিন্তু রয় তুমি এখন অনেক উঁচুতে চলে গেছোতুমি এখন এআরসি"
তাতে কি হয়েছে?
ধরো যদি কখনো আবার কেউ আসে যারা এদের কষ্টের কারণ হয় তখন তুমি যে উচ্চতায় চলে গেছো সেখান থেকে নেমে আসবে? এআরসি কি আসবে?
না, এআরসি আসবে না, আসবে রয়, এই শহর আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে, বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছে এই শহরে সবারই অধিকার আছে ভালো ভাবে বাঁচার, স্বপ্ন দেখার কিন্তু যেটা আপনি বললেন যদি কেউ সেই অধিকার কেড়ে নিতে চায় তাহলে রয় তার জীবন কেড়ে নেবে।
এটাই শুনতে চাইছিলাম রয়, ক্ষমতা তোমার মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে কি না সেটাই দেখতে চাইছিলাম। পণ্ডিতজী রয়কে জড়িয়ে ধরলেন, একটু পরে অভয় তাথৈএর কাছে গিয়ে দেখে সেখানে বিদিশা, আমির, বৃষ্টি আর অমিয় মিলে কথা বলছে, তাকে দেখে অমিয় বললো "তারপর তুই এখানেই থাকবি?"
এটাই এখন আমার শহর।
আর ওইটা?
ওখানেও যাবো, ওখানেও তো কাজ আছে।
বৃষ্টি বললো "অভয় বলাটা উচিত হবে কি না জানিনা তাও বলছি, আমাদের যত বিজনেস আছে আমি চাই সব তুমি নাও এবার"
না বৃষ্টি ওগুলো তোমার আমার দরকার নেই।
আমারও দরকার নেই, আমি অমিয়র সাথে এই ভালো আছি।
তাহলে এক কাজ করো ওগুলো যোগ্য উত্তরাধিকারীর জন্য তোলা থাক।
কে?
তোমার ভাই, তোমার বাবার ছেলে।
বৃষ্টি অবাক হয় কিন্তু তাথৈ ওকে শিউলী দেবীর ব্যাপারে বলে তখন বৃষ্টি বলে "বেশ তবে তাই হোক কিন্তু মাসির ব্যাপারে যখন তুমি জানো অভয় তখন ডাকলে না কেন আজ?"
"আপনি নিশ্চয়ই আমাকে এখানে দেখে অবাক হয়েছেন তাই না?" ব্যাঙ্গের স্বরে জিজ্ঞেস করে অভয়, কিন্তু বীরেন বাবু কোনো কথা বলেন না অভয় টেবিল থেকে নেমে আস্তে আস্তে বীরেন বাবুর কাছে আসে বলে "আপনি খেয়াল করেছিলেন যে যেকটা গাড়িতে বিস্ফোরণ হয়েছে তার একটিতেও কোনো লোক ছিল না বা যারা আপনাকে নিয়ে আসতে গেছে তারা কারো উপর গুলি চালায় নি বুঝতে পারছেন না?"
বীরেন বাবু তবুও চুপ করে তাকিয়ে আছে দেখে অভয় আবার বলতে শুরু করে "তাহলে আপনাকে খুলেই বলি, আপনাকে কোর্ট চত্ত্বর থেকে বার করে আনার পুরো প্ল্যানটা আমার ছিল,আমিই ওই কনস্টেবল, বাপ্পা এবং ওর ওয়াইফকে পাঠিয়েছিলাম থ্যাংক ইউ বাপ্পা"
কি যে বলেন স্যার কি এমন করেছি আপনি না থাকলে বউ বাচ্চা নিয়ে না খেতে পেয়ে মরে যেতাম, তার বিনিময়ে এটুকু করতে পেরেছি এ তো আমার সৌভাগ্য স্যার।
"হ্যাঁ যেটা বলছিলাম সবকিছু আমার প্ল্যানেই ছিল শুধু একটা জিনিস ছাড়া, আমি ভেবেছিলাম আপনি পালানোর চান্স পেলে আগে পালানোর কথাই ভাববেন কিন্তু আপনি যে রিভলবার জোগাড় করে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাটাক করবেন এটা ভাবতে পারিনি, অবশ্য পুলিশকে মারায় আমার সুবিধাই হয়েছে পুরো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এখন আপনার বিরুদ্ধে, কিন্তু আপনি আরও একজনকে মারতে চেয়েছিলেন, আমার মাকে তাইতো?"
"দুর্ভাগ্য গুলিটা তোর হাতে লাগে" এতক্ষণে মুখ খুললেন বীরেন বাবু, "আমি ভেবেছিলাম তোর সামনে তোর মাকে মারবো ঠিক যেভাবে তোর বাপকে মেরেছিলাম"
"আপনার মধ্যে একটুও মনুষ্যত্ব নেই না? জীবনে কত পাপ করেছেন আপনার সাথে আজ কেউ নেই আপনার ছায়াসঙ্গী যেদুজন ছিল আপনার ভাই আর জগা তারা নেই আপনার দিদি আর ভাগ্নে নেই আপনার স্ত্রীকে আপনি মেরেছেন আপনি আপনার মেয়েকে মারতে লোক পাঠিয়েছেন, আপনার ছেলে আপনাকে কোনোদিন চিনবে না।"
আমার ছেলে?
"আপনার আর শিউলী দেবীর ছেলে, আমি ওর কথা জানি। আপনি একবারও আয়নায় নিজেকে দেখেছেন? মানুষ রূপী পশু আপনি, আপনি কোর্ট থেকে পালানোর সুযোগ কাজে না লাগিয়ে আবার আমার মাকে মারতে চেয়েছিলেন কি ভেবেছিলেন আমার মাকে মারতে পারবেন? আমার মায়ের গায়ে যদি একটা আঁচড় লাগতো না তাহলে ওখানেই আপনাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতাম। আর আপনাকে কেন কোর্ট থেকে নিয়ে এসেছি জানেন? যাতে নিজে হাতে আপনাকে মারতে পারি, আপনি সমাজের চোখে একজন পলাতক আসামী, যে কোর্ট থেকে পালিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে আপনি আজীবন সেটাই থাকবেন কেউ জানবে না আপনার কি হয়েছে, ঠিক যেভাবে এই শহরে আমাদের নিরুদ্দেশ করে দিয়েছিলেন, আপনি পিছন থেকে আমার বাবাকে পিঠে গুলি করেছিলেন কিন্তু আমি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আপনার চোখে চোখ রেখে আপনার কপালে গুলি করবো" অভয় নিজের ডান হাতের তর্জনী নিজের কপালে ঠেকায়।
"তুই ঠিক বলেছিস আজ আমি একা আমার সাথে কেউ নেই সারাজীবন যে ক্ষমতার পিছনে ছুটেছি আজ সেই ক্ষমতাও হারিয়েছি, আমার মেয়ে আমার সাথে নেই যে ভাই সবসময় আমার পাশে থাকতো সে আজ নেই, আমার দিদিও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, আমার সিএম হবার স্বপ্ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, আর এইসব তোর জন্য তোকে আমি ছাড়বো না" বলে বীরেন বাবু অভয়ের দিকে তেড়ে এলেন এবং এসেই অভয়ের চোয়ালে একটা ঘুষি মারলেন তারপর একটু ঝুঁকে গুঁতোনোর মতো অভয়ের কোমর ধরে ঠেলে পিছনে নিয়ে যেতে লাগলেন,পিছনের দেয়ালে অভয়কে ফেলে দেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে অভয়ও বেশ কয়েকপা পিছিয়ে গেল কিন্তু তারপর নিজেকে সামলে নিল বীরেন বাবু আর ঠেলে ওকে নড়াতে পারছেন না, অভয় দুহাতের কনুই দিয়ে বীরেন বাবুর পিঠে সজোড়ে আঘাত করতে থাকে কিন্তু তবুও বীরেন বাবু ওকে ছাড়েন না শেষে নীচ থেকে হাঁটু উপরে তুলে বীরেন বাবুর পেটে আঘাত করতে থাকে এর ফলে বীরেন বাবুর হাত অভয়ের কোমর থেকে একটু আলগা হয় আর অভয় তৎক্ষণাৎ বীরেন বাবুর কোমর ধরে আলুর বস্তা তোলার মতো দুহাতে মাথার উপরে তুলে মাটিতে আছাড় মারে, বীরেন বাবুর মুখ থেকে একটা "আঃ" আর্তনাদ বেরিয়ে আসে, কিন্তু তিনি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ান একসময়ে তিনি তার নিজের এলাকার নাম করা মস্তান ছিলেন মারামারিতে যথেষ্ট পটু ছিলেন এবং এলাকায় যথেষ্ট আতঙ্ক ছিল তার আজ বয়স হলেও এখনো শরীরে যথেষ্ট শক্তি ধরেন তিনি আবার অভয়কে আঘাত করতে উদ্যত হন, এদিকে অভয়ও যেন এরকমই একটা কিছুর প্রত্যাশা করছিল সেইজন্য সে পিস্তল বার না করে খালি হাতেই লড়াই করছে। বীরেন বাবু এগিয়ে এসে অভয়ের চোয়ালে আঘাত করেন ,অভয় এক পা পিছিয়ে যায় আবার বীরেন বাবু এগিয়ে আসেন তবে এবার আঘাতটা অভয়ের বাহাতের বাহুতে করেন তিনি জানেন ওখানেই তার চালানো গুলি লেগেছিল, আঘাতের ফলে অভয়ের ওই অংশের শার্ট রক্তে ভিজে যায় বীরেন বাবু আবার ওখানে আঘাত করেন এবার কিছুটা রক্ত শার্টের গোটানো স্লিভেল থেকে বেরিয়ে কবজিতে পৌঁছায় কিন্তু ইঞ্জেকশনের জন্যই হোক বা নিজের ইচ্ছাশক্তির জন্যই হোক অভয় ব্যাথাটা সহ্য করে নেয়, বীরেন বাবু তৃতীয় বার আঘাত করতে এলে সে বাহাতে আটকে ডান হাতে বীরেন বাবুর চোয়ালে আঘাত করে হ বীরেন বাবু কয়েকপা পিছিয়ে যান, কিন্তু পরক্ষনেই আবার অগ্ৰসর হলে অভয় ডান পা তুলে ওনার বুকে সজোড়ে একটা লাথি মারেন, বীরেন বাবু আঘাতটা সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে যান।
"বললাম তো যতক্ষণ না ওই অভয়কে শেষ করতে পারছি ততক্ষণ আমি শান্তি পাবো না" দেয়ালে একটা চাপড় মেরে কথাটা বললেন বীরেন বাবু, কোর্ট থেকে পালিয়ে এসেছেন বলা ভালো তাকে নিয়ে আসা হয়েছে কিন্তু আসার আগে ওই অভয়ের সামনে ওর মাকে মারবেন বলে গুলি চালিয়েছিলেন কিন্তু অভয় এবারও ঝর মাকে বাঁচিয়ে নেয় যদিও ও নিজে আহত হয়, আবার রিভলভার চালিয়েছিলেন কিন্তু গুলি শেষ হয়ে যাওয়ায় আর কিছু হয়নি। বীরেন বাবু খুব ভালো করেই জানেন যে এতক্ষণে একদিকে পুলিশ আর অপরদিকে অভয়ের দলের লোক পুরো শহরে তাকে খুঁজতে শুরু করেছে, কি অবস্থা হয়েছে তার এই কদিন আগেও এই শহরের বেতাজ বাদশা ছিলেন তিনি তার সামনে দাঁড়ানোর সাহস হতো না কারো আর আজ তাকে এই শহরেই লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে, যারা তাকে কোর্ট থেকে নিয়ে এসেছে তারা শহরের একা অনামী হোটেলে রেখেছে, এরকম হোটেলে থাকার কথা তিনি কোনোদিন ভাবতেও পারেননি আর আজ... সব ওই অভয়ের জন্য, এখানে এসেই তিনি একজন ঢ্যাঙা মতো একটা লোককে দেখেন যে নিজেকে বাপ্পা বলে পরিচয় দেয়, বীরেন বাবুর যদিও মনে পড়ে না যে উনি ওকে আগে দেখেছেন কি না কিন্তু এইমুহূর্তে ওর উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই, ওকেই বললেন যেভাবেই হোক ওই অভয়কে মারতে চান তার ব্যবস্থা করে দিতে, উত্তরে বাপ্পা বললো "আপাতত কিছুদিন শান্ত হয়ে থাকতে, পরে সুযোগ আসবেই" কিন্তু বীরেন বাবু জানান যতক্ষণ না উনি অভয়কে শেষ করছেন ততক্ষণ উনি শান্ত হতে পারবেন না। শেষমেশ বাপ্পা জানায় "ঠিক আছে স্যার, আমি চেষ্টা করছি"
আরেকটা কথা বাপ্পা।
বলুন।
অভয়ের আগে ওর মাকে মারতে চাই।
কিন্তু স্যার।
কোনো কিন্তু নয়, ওর চোখের সামনে ওর মাকে মারবো তারপর ওকে, ওর বাবাকে মেরেছিলাম বলে আমার উপর প্রতিশোধ নিতে ফিরে এসেছে এবার দেখি ওর মাকে মারার পরে ও কি করে?।
ঠিক আছে স্যার, আমি দলের যারা বেঁচে আছে তাদের সাথে যোগাযোগ করছি।
কর তবে বেশি সময় নিস না।
সেই রাতেই বাপ্পা এসে বীরেন বাবুকে নিয়ে চললো, বীরেন বাবু "কোথায় যাচ্ছি" জিজ্ঞেস করায় বললো "একজনের সঙ্গে দেখা করতে"
কার সঙ্গে?
ওই অভয়ের একজন শত্রু, বাণিজ্যনগরী থেকে এসেছেন।
কে তিনি?
নাম এখনো জানিনা তবে ওই অভয় তারও অনেক ক্ষতি করেছে।
তুই কিভাবে জানলি?
উনি নিজে আপনার খোঁজ করতে লোক লাগিয়েছিলেন।
এত তাড়াতাড়ি খোঁজ পেয়ে গেলেন? বীরেন বাবুর গলায় সন্দেহ।
তাড়াতাড়ি নয়তো অনেকদিন থেকেই সত্যি বলতে উনিই আপনাকে পালাতে সাহায্য করেছেন ওনার সাহায্য ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারতাম না আমাদের দলের প্রায় সবাইকেই শেষ করে দেওয়া হয়েছে।
কি বলছিস তুই?
ঠিকই বলছি স্যার, কাউকে পুলিশ দিয়ে এনকাউন্টার করিয়ে দেওয়া হয়েছে তো কাউকে নিজেই গুম করে দিয়েছে ওই অভয়।
বীরেন বাবু আর অবিশ্বাস করতে পারলেন না, এতদিনে তিনি বুঝতে পেরেছেন এই অভয়ের ক্ষমতা কতটা তিনি জিজ্ঞেস করলেন "এখন তো আমার আর ক্ষমতা নেই তাহলে তোর এই ইনি আমাকে ডেকেছেন কেন?"
সেটা উনিই ভালো বলতে পারবেন তবে আমার যতটুকু মনে হচ্ছে উনি আপনার সাথে কোনো ডিল করতে চাইছেন যেটাতে আপনার এবং ওনার দুজনেরই লাভ হবে।
কিন্তু আমার এখন ক্ষমতা নেই তাহলে?
উনি দেখা করতে চেয়েছেন করুন তারপর দেখা যাবে, এইতো আমরা প্রায় এসেই গেছি।
বাপ্পার কথাটা বীরেন বাবু মেনে নিলেন মনে মনে বললেন "ঠিকই তো দেখাই যাক না কি চান, তারপর ব্যবস্থা করা যাবে"। বীরেন বাবু দেখলেন বাপ্পা একটা বন্ধ কারখানার সামনে এসে গাড়ি থামালো, এই কারখানাটার আশেপাশের অনেকটা জায়গা খালি জনশূন্য এলাকায় এবং এই কারখানাটা তিনি চেনেন তিনি জানেন কারণ এটা তারই ছিল এখান থেকেই তার ড্রাগসের চালান হতো পরে নারকোটিকস্ ডিপার্টমেন্টের অফিসাররা বন্ধ করে দেয়, যদিও বীরেন বাবুর নাম জড়ায়নি, তার ভাই ধীরেন বাবু সব সামলে নিয়েছিলেন, বীরেন বাবু প্রথমে না বুঝলেও এখন তিনি বুঝেছেন যে এটা বন্ধ করার পিছনে অভয়ের হাত আছে, তিনি একটু অবাক হয়ে বাপ্পাকে জিজ্ঞেস করেন "এখানে?"
হ্যাঁ স্যার আসুন।
দুজনে ভিতরে ঢোকেন একটা বড়ো হলঘর টাইপের জায়গায় আসেন এখানে ড্রাগস চালান হবার জন্য প্যাকিং হতো কিন্তু সেখানে প্রথমে কাউকে না দেখতে পেয়ে বীরেন বাবু একটু অবাক হন সন্দিগ্ধ স্বরে জিজ্ঞেস করেন "কি রে এখানে তো কেউ নেই, এখানে কেন আনলি আমাকে?"
"কারণ ওকে আমি বলেছি তাই।" তৃতীয় ব্যক্তির আওয়াজ শুনে চমকে ওঠেন বীরেন বাবু, আওয়াজটা পরিচিত গলার হলেও তিনি এখানে সেটা আশা করেননি আওয়াজটা যেদিক থেকে এসেছে তিনি সেদিকে ফিরলেন, এতক্ষণ অত বড়ো হলঘরে অল্প আলোর দু-তিনটে বাল্ব জ্বলছিল ফলে বেশিরভাগই অন্ধকার হয়ে ছিল এখন হটাৎ পরপর বেশ কয়েকটা হ্যাজাক লাইট জ্বলে উঠলো, বীরেন বাবু তাকিয়ে দেখলেন হলঘরের একটা দিকে একটা টেবিলের উপরে বসে আছে তার জাতশত্রু এআরসি ওরফে অভয় রায় চৌধুরী।
বীরেন বাবু সঙ্গে সঙ্গে পিছনে ফিরে বাপ্পার দিকে ফেরেন কিন্তু ততক্ষণে সে নিঃশব্দে আরো।পিছনে সরে গিয়েছে, বীরেন বাবু এটাও লক্ষ্য করলেন যে এখানে তিনি বাপ্পা আর এআরসি ছাড়া আরও লোক আছে অর্থাৎ তার পালাবার রাস্তা বন্ধ, তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে।
"এখন আবার দুইজন কোথায় যাচ্ছিস?" রাতে অভয় আর আমির বেরোনোর উদ্যোগ করছিল, এমন সময় অমৃতাদেবী ঘরে এসে ব্যাপারটা দেখে কথাটা বললেন।
মা, একটা কাজ এসে গেছে সেটাই সারতে যাচ্ছি।
কোথাও যাবি না তুই এখন, সকালে যা ফাড়া গেছে তারপর এখন বেরোনোর নাম নিবি না।
মা..
বললাম তো না, কিছু বলা হয়না বলে যা খুশি তাই শুরু করেছিস।
মা, আমি ঠিক আছি, খানিকক্ষণের কাজ সেরেই চলে আসবো আর আমিরও তো থাকছে আমার সাথে।
অমৃতাদেবী এবার আমিরের দিকে তাকান বলেন "আমির, তোরই বা এখন বেরোবার কি দরকার?"
আম্মি, মানে মানে...
মানে মানে কি করছিস...
মা আমি ওকে ডেকেছি তুমি চিন্তা কোরো না, আমি চলে আসবো।
তুই শুনবি না আমার কথা, তোর হাতে এখনো ব্যাণ্ডেজ কত রক্ত বেরিয়েছে আর তুই
অভয় মাকে জড়িয়ে ধরলো বললো: তুমি চিন্তা কোরো না, যাও ঘুমিয়ে পড়ো ওষুধ খেয়েছো?
তুমি আবার কোথায় যাচ্ছো এখন? দরজার কাছে এবার তাথৈএর আওয়াজ শোনা গেল।
এবার তুমিও? শোনো আমার একটা কাজ আছে সেটা সারতে যাচ্ছি।
কিন্তু তোমার হাতে..
দেখনা মা, তুই ওকে আটকা এত রাতে এই অবস্থায় কোথায় যাচ্ছে আবার। তাথৈএর কথা মাঝখানে আটকে বলে ওঠেন অমৃতাদেবী। তাথৈ কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই অভয় বলে "মা বললাম তো একটা কাজে যাচ্ছি"। অমৃতাদেবী গজগজ করতে থাকেন "শুনবি না আমার কথা, পুরো বাপের মতো হয়েছে"। অভয় মাকে ধরে বিছানায় বসায় তারপর পায়ের কাছে বসে বলে "মা, আজকে ছেড়ে দাও এরপর তুমি যা বলবে শুনবো"
তোর কিছু হয়ে গেলে আমি..
আম্মি আমি থাকতে ওর কিচ্ছু হবে না, কোর্টে আমি ছিলাম না কিন্তু এখন আমি থাকবো ওর সাথে। এবার আমিরও অমৃতাদেবীর পায়ের কাছে বসে কথাটা বলে।
মা, যাও তুমি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কথাটা বলে অভয় উঠে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই তাথৈএর দিকে চোখ পড়ে, ওর মুখ দেখে বোঝা যায় ও চায়না অভয় এখন কোথাও বেরোক কিন্তু বলতে পারছে না, অভয় সেটা বোঝে তাথৈএর একটা গালে আলতো করে হাত দিয়ে বলে "মায়ের খেয়াল রেখো, আমি চলে আসবো"। বলে আর কোনো কথা বলার অবকাশ না দিয়ে অভয় আর আমির বেরিয়ে যায়, গাড়িতে উঠে অভয় আমিরকে জিজ্ঞেস করে "ইঞ্জেকশনটা এনেছো?"
হ্যাঁ, এই নাও। বলে আমির একটা ইঞ্জেকশন আর একটা অ্যাম্পুল দিয়ে বলে "এটাতে বেশ কিছুক্ষণের জন্য তোমার ব্যাথা কম ফিল হবে", অভয় সিরিঞ্জে ওষুধ নিয়ে শার্টের হাতাটা গুটিয়ে ইঞ্জেকশনের সুঁইটা নার্ভে ঢুকিয়ে দেয়, গাড়ি স্টার্ট দেয় আমির বলে "আর দুদিন রেস্ট নিয়ে কাজটা করলে হতোনা?"
হয়তো হতো কিন্তু আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজটা শেষ করতে চাই তারপর একটা স্বাভাবিক সুস্থ জীবন কাটাতে চাই।
কাজটা নাহয় আমি করে দিতাম।
না আমির ঋণটা আমার উপর তাই শোধও আমিই করবো।
আমির আর কোনো কথা না বলে গাড়ি চালাতে থাকে।
তাথৈ চুপ করে অভয়ের বুকে মাথা রেখে বসে থাকে, অভয় বলে চলে "আমাদের সাথে যা হয়েছিল সেটা তোমার জন্য হয়নি, তুমি আমার জীবনে অভিশাপ নয় তাথৈ আর কখনো এরকম বলবে না, আমি আগেও বলেছি আজ আবার বলছি তোমার জ্যেঠু যা করেছেন তার জন্য আমি কখনো তোমাকে দায়ী করিনি, আমি তোমাকে ভালোবাসি তাথৈ"
তাহলে ওই ববিতাকে বিয়ের জন্য দেখতে গিয়েছিলে কেন?
বললাম তো মা বলেছিল।
"মাকে বলতে পারলে না তুমি আমাকে ভালোবাসো, যদি সত্যিই বিয়ে করতে বলতেন তখন?" তাথৈএর কথা শুনে অভয় হেসে ওঠে।
"হাসছো কেন?" জিজ্ঞেস করে তাথৈ।
কারণ ওসব কিচ্ছু নয়।
তারমানে মা বলেননি?
না, হ্যাঁ মা মেয়ে দেখছিলেন এটা ঠিক তবে ওদের সবাইকেই আমি মানা করে দিয়েছিলাম।
আর ববিতা?
ওনার সাথে দেখা হওয়া আর তার পরের ঘটনা পুরোটাই সত্যি তবে আমি হোটেলে ওনার সাথে দেখা করতে যাইনি গিয়েছিলাম আমার একটা মিটিংয়ে, কোইন্সিডেন্টলি উনিও ওখানে ছিলেন।
আর তুমি ওনাকে ওইভাবে দেখলে?
ইচ্ছাকৃতভাবে নয়, হয়ে গেছে।
তোমাকে আমি.. বলে তাথৈ একটু ছটফট করতেই অভয় "আঃ" করে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে তাথৈ ভয়ার্ত গলায় "অভয়.. কোথায় লাগলো?"বলে ওঠে।
আমি ঠিক আছি। অভয় আবার তাথৈএর মাথাটা ধরে নিজের বুকে টেনে নেয়।
আমার ভীষণ ভয় করছে অভয়? একটু পরে তাথৈ বলে।
কেন?
জ্যেঠু পালিয়ে গেছেন, উনি আবার তোমার ক্ষতি করতে চাইবেন, কোর্টের সামনেই তো মাকে মারতে চাইলেন, আমার সত্যিই খুব ভয় করছে।
আমার উপর বিশ্বাস আছে?
নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করি তোমাকে।
তাহলে ভয় পেয়ো না।
কিন্তু উনি যদি..
উনি আর কোনো ক্ষতি করতে পারবেন না, চিন্তা কোরো না।
আসবো অভয়। হটাত দরজার সামনে বৃষ্টির আওয়াজ শুনে অভয় আর তাথৈ আলাদা হয়ে বসে।
আসো।
বৃষ্টি ভিতরে ঢোকে ওর চোখেও জল। "কি হয়েছে তুমি আবার কাঁদছো কেন?" জিজ্ঞেস করে অভয়।
আমি বুঝতে পারছি না কি বলবো, তুমি সেদিন আমাকে বাঁচালে আর আজ আমার বাবা আমার তোমাকে..আমি হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছি।
বৃষ্টি তোমার বাবা যা করেছেন তার জন্য তুমি দায়ী নও তবে আমি আশা করবো তুমি নিজেকে পাল্টেছো, তোমার ইগো তোমার অহংকার কমেছে।
বৃষ্টি চুপ করে শুনতে থাকে অভয় বলে চলে "ভেবোনা তোমাকে কথা শোনাচ্ছি কিন্তু এটাই সত্যি তোমার মধ্যে আগে খুব অহংকার ছিল, তবে এখন সেটা না থাকলেই ভালো, যাইহোক অমিয় কোথায়?"
ও বাইরে ওই কি যেন নাম আমিরের সাথে আছেহ ডাকবো?
না থাক,অমিয় তোমাকে খুব ভালোবাসে পারলে ওকে..
তোমার বন্ধু তোমাকে বেশি ভালোবাসে সেইজন্য এত বছর পরে আমি যখন ওকে পাল্টা প্রপোজ করি তখন ও রিফিউজ করে।
তবুও তোমাকে বিপদে দেখে এসেছিল তো?
হ্যাঁ।
তাহলে?
অভয় তুমি সত্যিই আমার ড্যাডির জন্য আমার উপরে রেগে নেই?
না, আর যদি কিছু মনে না করো এখন আমাকে আর তাথৈকে একটু একা ছেড়ে দেবে প্লিজ।
বৃষ্টি একটু হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। অভয় আবার তাথৈকে কাছে টেনে নেয়।
অভয়কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, আমির ওখানেই ছিল ও তো পাগলের মতো করতে থাকে, কিছুক্ষণ পরে ডাক্তার জানায় গুলিটা অভয়ের বাহুর অনেকটা মাংস খুবলে নিয়ে বেরিয়ে গেছে, অনেকটা রক্ত বেরিয়ে যাওয়ায় একটু দুর্বলতা আসতে পারে, তবে চিন্তা নেই ওয়াশ করে স্টিচ করে ব্যাণ্ডেজ করে দিয়েছেন, এবং ব্যাথার ওষুধও দিয়ে দিয়েছেন, সবাই গিয়ে দেখা করতে পারেন। সবার আগে অমৃতাদেবী ভিতরে ঢুকলেন দেখেন তার ছেলে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে, খালি গায়ে বাহুতে অনেকটা জায়গা জুড়ে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা, তিনি ছেলের মাথায় হাত বোলান, অভয় চোখ খুলে মায়ের চোখে জল দেখেই বলে "মা আমি ঠিক আছি তুমি কেঁদোনা"। কিন্তু তবুও অমৃতাদেবী কেঁদেই চলেন, অমৃতাদেবীর পিছনে একে একে ঢোকে আমির, তাথৈ এবং বাকিরা এর মধ্যে আমির আর তাথৈএর চোখেও জল তাই দেখে অভয় বলে "আরে সবাই কাঁদছো কেন আমি এখনো বেঁচে আছি, মরিনি"
এক থাপ্পড় মারবো। অমৃতাদেবী রেগে যান, অভয় হাসতে থাকে "মা, আমি ঠিক আছি"
তুই কেন আমাকে ঠেলতে গেলি, গুলি লাগতো আমার লাগতো।
মা, আমি থাকতে তোমার গায়ে আমি লাগতে দিতাম এটা তুমি ভাবলে কিভাবে?
আর তোর যে লেগেছে?
আমার কিছু হয়নি, বাড়ি চলো ক্ষিদে পেয়েছে।
ডাক্তার যদিও ছাড়তে চাইছিলেন না কিন্তু অভয়ের জিদের কাছে শেষপর্যন্ত ছাড়তে বাধ্য হন, বাড়িতে আসতেই বিন্দু মাসিও তাকে জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করেন তাকেও অনেক কষ্টে সামলাতে হয়। খাওয়ার পরে নিজের রুমে একা একটু বিশ্রাম করছে অভয় ওষুধের প্রভাবে ব্যাথাটা কিছুটা কম হটাৎ দরজায় নক করার আওয়াজ শুনে দেখে তাথৈ।
"আরে তাথৈ আসো" বলে তাড়াতাড়ি একহাতে ভর দিয়ে উঠতে যায় কিন্তু অপর হাতে ব্যাথায় "আঃ" করে ওঠে তাথৈ তাড়াতাড়ি এসে ওকে ধরে ওর চোখে জল।
তাথৈ তুমি কাঁদছো কেন?
তাথৈ দুহাত জোড় করে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে কাঁদতে কাঁদতে বলে " আমার পরিবারের জন্য তোমার বাবা আজ বেঁচে নেই, তোমাকে না জানি কত কষ্ট করতে হয়েছে, আজ সেই আমার জ্যেঠুই মাকে মারতে চাইছিলেন আর এখন তোমার.... আমি যতই অস্বীকার করি কিন্তু এটা তো সত্যি যে আমি ওই বীরেন ভট্টাচার্যের পরিবারের মেয়ে"
তাথৈ.. এসব কি বলছো?
আমি হয়তো তোমার জীবনে অভিশাপ।
তুমি কি চলে যেতে চাইছো?
এতেই বোধহয় তোমার জন্য ভালো হবে।
এদিকে এসো, বসো। অভয় তাথৈকে কাছে ডাকে, তাথৈ বিছানায় অভয়ের ডানদিকে বসে, ও এখনো কেঁদে চলেছে, অভয় বলে "সত্যি বলোতো তুমি চলে যেতে চাইছো অন্য কাউকে পছন্দ হয়েছে নাকি?"
কথাটা শুনে তাথৈ অভয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই বোঝে সে মজা করছে সে চুপ করে থাকে, অভয় আবার বলে "বেশ তুমি যখন চলে যেতে চাইছো তখন তোমাকে আটকাবো না ভালোই হলো আমিও ববিতার কাছে যেতে পারবো"
ববিতা কে? এবার ধীরে ধীরে আসল তাথৈ বেরিয়ে আসছে যে অভয়ের আশেপাশে কোনো মেয়েকে সহ্য করতে পারে না। অভয় বোঝে সেটা, মনে মনে বলে "এইতো এটাই তো চাইছিলাম" মুখে বলে "ববিতা একজন হিরোইন"
হিরোইন?
হ্যাঁ, মা ওকে ঠিক করেছিলেন আমার সাথে বিয়ের জন্য, একটা হোটেলে দেখা করতে গিয়েছিলাম।
তাথৈএর বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস পড়ছে সে বলে "তুমি দেখাও করতে গিয়েছিলে?"
হ্যাঁ, ওহহ কি দেখেছিলাম আজও চোখে ভাসে।
কি দেখেছিলে?
দুজনে ফোনে কথা বলেই ঠিক করেছিলাম যে হোটেলে দেখা করবো তারপর লাঞ্চ একসাথে সারবো, তা সেখানে গিয়ে শুনি উনি সুইমিং পুলে গেছেন স্নান করতে আমাকেও যেতে বলেছেন, গেলাম গিয়ে দেখি উনি সাঁতার কাটছেন আমাকে দেখে জল থেকে উঠে এলেন কি বলবো তোমাকে মাত্র একটা টু-পিস মনোকিনি পড়েছিলেন পুরো শরীর থেকে জল চুঁইয়ে পড়ছে শরীরের প্রতিটা কার্ভ দেখতে পাচ্ছি উফফফফ, জল থেকে উঠে ধীরে ধীরে আমার কাছে এলেন হ্যালো বললেন আমি তখনও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি মুখে কথাই বেরোচ্ছে না।
অভয় রায় চৌধুরী। তাথৈ ঝাঁপিয়ে পড়ে অভয়ের উপর কিন্তু অভয় ডানহাত দিয়ে তাথৈকে নিজের বুকে চেপে ধরে, তাথৈ অভয়ের জামা খামচে ধরে বলতে থাকে "আমি জানতাম তোমার চরিত্র খারাপ, অসভ্য ছোটোলোক ছেলে খালি অন্য মেয়ের দিকে নজর ঘোচাচ্ছি অসভ্যতামি"
বা রে তুমিই তো বললে তুমি চলে যাচ্ছো তো আমি সারাজীবন একা থাকবো নাকি?
আমি কোথাও যাবো না, দেখি তুমি কোন হিরোইনের কাছে যাও।
তার মানে তুমি যাবে না?
না। আবার টু পিস দেখছিলেন উনি
শুধু টু পিস কেন ডিনারটা একসাথে সারলে হয়তো..
আবার ডিনার?
হ্যাঁ আমাকে ইনভাইট করেছিলেন তো ডিনারে নেহাত আমার একটা ইম্পরট্যান্ট কাজ চলে এসেছিল তাই নাহলে।
তাথৈ আর সহ্য করতে পারে না, এক ঝটকায় নিজেকে অভয়ের বুক থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে "বেশ যাও তুমি তোমার ববিতা হিরোইনের কাছে আমি চললাম" বলে বিছানা থেকে নামতে যেতেই অভয় আবার তাথৈএর হাত ধরে নিজের বুকে টেনে নেয়।
ছাড়ো আমাকে, যাও তোমার হিরোইনের কাছে। তাথৈ মুখে একথা বললেও নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টাও করে না।
অভয় শান্ত স্বরে ওকে বলে "এই তো বললে তুমি যাবে না, আমাকে হিরোইনের কাছে যেতে দেবে না"
অভয় পিছনে ফিরে গেল পুলিশ আবার বীরেন বাবুকে নিয়ে পুলিশ ভ্যানের দিকে এগোতে থাকে যখন তারা পুলিশ ভ্যানটার প্রায় কাছেই চলে এসেছেন জাস্ট একটু দূরে তখনই আচমকা ঘটে গেল ব্যাপারটা একটা ছোটো বিস্ফোরণের শব্দে পুলিশ ভ্যানটা মাটি থেকে ছিটকে উপরে উঠে তারপর আবার নীচে আছড়ে পড়লো এবং তাতে আগুন লেগে গেল ঘটনায় আকস্মিকতায় বীরেন বাবু এবং তার সঙ্গের পাঁচজন পুলিশও ছিটকে কয়েকপা পিছনে পড়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে পরপর আরো কয়েকটা গাড়িতে বিস্ফোরণ এবং একইভাবে গাড়িগুলোতে আগুন লেগে গেল সঙ্গে সঙ্গে কোর্ট চত্ত্বরে হুড়োহুড়ি লেগে গেল যারা এতক্ষণ বীরেন ভট্টাচার্যের শাস্তির দাবিতে সোচ্চার ছিল এবং রায় ঘোষণার পরে উল্লাসে ফেটে পড়েছিল তারাই এখন প্রাণভয়ে পালানোর জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে শুরু করে দিল, এরইমধ্যে বীরেন দুজন লোক মুখ ঢেকে দৌড়ে বীরেন বাবুর কাছে গিয়ে তাকে ধরে তুললো পুলিশগুলো তাকে ধরার জন্য রিভলবার বার করলে লোকগুলো লাথি মেরে বীরেন বাবুকে ছাড়িয়ে নেয়, কিন্তু বীরেন বাবুর দুহাতে তখনও হাতকড়া তবুও তিনি একটা রিভলবার তুলে নেন তারপর সঙ্গের পুলিশগুলোর উদ্দেশ্যে চালিয়ে দেন, পুলিশগুলোকে মেরে বীরেন বাবু লোকদুটোর সাথে দৌড়াতে থাকেন।
বীরেন বাবুর সাথে কথা বলে অভয় ফিরে এসেছে, অমৃতাদেবী জিজ্ঞেস করলেন "তুই ওনার কাছে গিয়েছিলি কেন?"
এমনি চলো। সবাই গাড়িতে উঠতে যাবে এমন সময় পরপর বিস্ফোরণ অমৃতাদেবী, সরমা দেবী সহ তাথৈ এবং বৃষ্টিও হতবাক হয়ে যায়, এরপর হঠাৎই পরপর গুলির শব্দ, কোর্ট চত্ত্বরে সবাই হুড়োহুড়ি করছে অভয় তাড়াতাড়ি সবাইকে গাড়িতে উঠতে বলে। একটা গাড়ির আওয়াজ পেয়ে অভয় দেখে একটা গাড়ি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে কোর্ট চত্ত্বর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, হটাৎ গাড়িটার একটা জানালার কাঁচ নীচে নেমে যায় এবং সেটা থেকে একটা রিভলভার ধরা হাত বার হয় সাথে বীরেন বাবুর মুখ, অভয় সভয়ে দেখে বীরেন বাবু গুলি চালাতে উদ্যত তবে তার লক্ষ্য সে নয় তার লক্ষ্য তার মা সঙ্গে ঈ সে বা হাত দিয়ে মাকে ঠেলে সরিয়ে দেয় কিন্তু গুলিটা তার বা হাতের বাহুতে লাগে রক্ত বেরোতে থাকে, অমৃতাদেবী সহ বাকিরা ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করে ওঠেন "অভয়"। অভয় মাটিতে পড়ে যায় সে ডানহাতে বাহু চেপে বীরেন বাবুর দিকে তাকায় দেখে গাড়িটা বেরিয়ে যাচ্ছে বীরেন বাবু আরও কয়েকবার ট্রিগার চাপলেন কিন্তু গুলি বেরোচ্ছে না দেখে রিভলভার ফেলে দিলেন গাড়িটাও তাকে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
অমৃতাদেবী তাড়াতাড়ি ছেলের কাছে এসে কাঁদতে শুরু করেন অভয় কোনোমতে বলে "মা, তুমি ঠিক আছো?"
হ্যাঁ, বাবু, তোর কিচ্ছু হবে না।
আমি ঠিক আছি মা। এটুকু বলেই অভয় জ্ঞান হারায়।
বাপ্পা? এই নামে তো কাউকে চিনি না।
মুখ দেখলে হয়তো চিনতে পারবেন বাবু।
তা সে আসেনি কেন?
সে জোগাড় করতে ব্যাস্ত।
জোগাড়? কিসের জোগাড়?
আপনাকে বার করে নিয়ে যাওয়ার। শেষের কথাটা অবশ্য বলেন কনস্টেবল আর সেটা গলার আওয়াজ অনেকটা নামিয়ে। চমকে ওঠেন বীরেন বাবু সোজা তাকান কনস্টেবলের দিকে, কনস্টেবল একবার চারিদিকে তাকিয়ে কেউ লক্ষ্য করছে কি না দেখে গলাটা আরও নামিয়ে বলে "স্যার একদম ভিতরের খবর পেয়েছি আপনার বিরুদ্ধে সব প্রমাণ তৈরি, সেইজন্যই কেউ আপনাকে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করছে না নেহাত ফর্মালিটির জন্য জেল হেফাজতে রেখেছে, একজন উঁচু পজিশনের প্রচণ্ড ক্ষমতাধর কেউ একজন সব প্রমাণ তুলে দিয়েছে, সেই নাকি কমিশনারের সাথে মিটিং করে সব ব্যবস্থা করেছে"।
বীরেন বাবুর বুঝতে বাকি রইলো না সে কে, এটা অভয় ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না, তিনি কনস্টেবলকে জিজ্ঞেস করেন: কিন্তু আমাকে কিভাবে বার করবেন?
এখন নয় স্যার আপনাকে ঠিক সময়ে জানাবো এখন আপনি খেয়ে নিন। বীরেন বাবু আর দ্বিরুক্তি না করে খাবারটা খেয়ে নেন, পরের দিন আবার খাবার এলো পরের দিন আবার তবে এবার খাবারের সাথে একটা ছোটো চিরকুট পেলেন তিনি তাতে লেখা "সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে, আগামীকাল কোর্টের রায় যাই হোক বেরোনোর পরে কাজটা করা হবে, তৈরী থাকবেন"। বীরেন বাবু পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও তিনি তৈরী থাকেন দেখাই যাক না যদি সত্যিই পালানোর সুযোগ আসে তাহলে ক্ষতি কোথায়? এখন তার একটাই লক্ষ্য যেভাবেই হোক অভয়কে শেষ করা।
কোর্টে ঢুকে শান্তভাবে আসামীর কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ান বীরেন ভট্টাচার্য বাইরে তখনও ক্ষিপ্ত জনতা তার ফাঁসির দাবিতে সোচ্চার। বীরেন বাবু চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে থাকেন, একবারে প্রথমেই চোখে পড়ে বৃষ্টিকে, একেবারে প্রথম সারিতে বসে আছে সে সোজা বীরেন বাবুর দিকে তাকিয়ে চোখেমুখে অসম্ভব ঘৃণা,তার এক পাশে একটা ছেলেকে দেখেন সে বৃষ্টির একটা হাত চেপে ধরে আছে অপর পাশেই বসে থাকতে দেখেন সরমাদেবীকে এবং তার পাশে বসে ওটা কে? বীরেন বাবু অবাক হয়ে দেখেন বিদিশা বসে তার পাশে তাথৈ, তার পরিবারের যারা আছে তারা সবাই আছে এবং তারা প্রত্যেকেই ঘৃণাভরে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এবার কোর্টরুমের দরজার দিকে চোখ পড়তেই তিনি হতবাক হয়ে যান এ কাকে দেখছেন তিনি ও কে দাঁড়িয়ে আছে? এত বছর পরে দেখেও ঠিক চিনতে পেরেছেন তিনি, ষোলো বছর আগের সেইরাতে তিনি শেষ দেখেছিলেন যে রাতে তিনি রুদ্র আর তার পরিবারকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু সেইরাতে তার চোখে মুখে ছিল আতঙ্ক বেঁচে থাকার নিজের ছেলে আর স্বামীকে বাঁচানোর আকুতি আর আজ তার চোখেও ঘৃণা, অমৃতা.. অমৃতা রায় চৌধুরী ,রুদ্রের স্ত্রী অভয়ের মা, অমৃতা যে বেঁচে আছে বা বেঁচে থাকতে পারে এটা তার একমুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি এমনকি অভয় বেঁচে আছে এটা জানার পরেও নয়।
অমৃতাদেবী এগিয়ে এসে তাথৈএর পাশে বসেন তখনও তার দৃষ্টি সোজা বীরেন বাবুর দিকে, বীরেন বাবু মনে মনে খুশীই হন অভয় তার থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে এবার তার পালা প্রথমে অভয়ের চোখের সামনে ওর মাকে মারবেন তারপর ওকে আজই অমৃতাদেবীকে শেষ করবেন তিনি। এবার দরজা দিয়ে যাকে ঢুকতে দেখেন বীরেন বাবু তাকে দেখে তার হাত নিশপিশ করতে থাকে, অভয় ঢুকছে বহুকাল হয়ে গেল নিজের হাতে কাউকে মারেননি তিনি তার হয়ে জগা এবং অন্যান্য লোকেরাই কাজটা করে দিত কিন্তু আজ তার সেই কাজটাই নিজের হাতে করতে ইচ্ছে করছে, ইচ্ছা করছে এখনই গিয়ে অভয়ের গলা টিপে ধরেন অতিকষ্টে নিজেকে সংবরণ করেন তিনি, না আগে ওর সামনে ওর মাকে শেষ করবেন তারপর ওকে, অভয় ঢুকতে ঢুকতে চোখ থেকে চশমাটা খুললে তিনি দেখেন সেও তা দিকে তাকিয়ে আছে, তার ঠোঁটের কোণে একটা মুচকি হাসি সেও এসে অমৃতাদেবীর পাশে বসলো তার দৃষ্টিও সোজা বীরেন বাবুর দিকে।
বিচার শুরু হলে একে একে প্রায় সব সাক্ষ্যই তার বিরুদ্ধে আসতে থাকে বলাইবাহুল্য তার পক্ষে শহরের কোনো উকিলই না দাঁড়াতে চাওয়ায় নিয়মমাফিক সরকারের তরফ থেকে একজনকে ঠিক করা হয় কিন্তু তিনি টিকতেই পারছেন না, আর সবশেষে যখন বহুবছর আগে করা খুনের ভিডিওটা আর তার সত্যতার প্রমাণ দেওয়া হলো তখন অবশ্য আর কিছু করার ছিলও না, স্বভাবতই বিচারক তার মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেন তার এত ক্রাইম এবং এত প্রমাণ যে এটাই হওয়ার ছিল।
কোর্ট থেকে বেরোতেই জনতার উল্লাস দেখতে পান বীরেন বাবু, একটু দূরে অভয়, অমৃতা আর বাকীদের দেখেন তিনি। তাকে দেখে অভয় তার কাছে এগিয়ে আসে বলে "বলেছিলাম না আপনাকে বাঁচতে দেবো না, আমি সবসময় আমার কথা রাখি"। কোর্টের ভিতরে তাকে বেশি কথা বলতে হয়নি, বলেনওনি তিনি, চুপ করেই দাঁড়িয়েছিলেন বলা যায় কিন্তু এবার তিনি মুখ খোলেন "আজ আমিও তোকে বলছি ঠিক যেমনভাবে তোর বাপকে মেরেছিলাম ঠিক সেভাবেই তোকে মারবো তবে তার আগে...."
তাহলে দেখাই যাক।
বেশ, দেখাই যাক।
থমথমে মুখ নিয়ে কোর্টে ঢুকলেন বীরেন বাবু তিনি ভালো করেই জানেন তার বিরুদ্ধে যা প্রমাণ আছে তাতে হয়তো আজই কোর্ট তার রায় দিয়ে দিতে পারে। পার্টি তাকে বরখাস্ত করেছে, পুরো শহরের লোক তার কুশপুত্তলিকা পোড়াচ্ছে, তাকে গালাগালি দিচ্ছে ,শাপশাপান্ত করছে এতদিন যারা তার সামনে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেতো না তারা এখন তার সামনে গলা তুলে কথা বলার সাহস পাচ্ছে, কোর্ট চত্ত্বরে অজস্র লোকের ভিড় সবাই তার ফাঁসির দাবি জানাচ্ছে, বেশ কয়েকজন তো জুতো ছুঁড়ে মারছে তার উদ্দেশ্যে, এছাড়া টমেটো, পচা ডিম তো আছেই। পাবলিকের এত রোষের কারণ প্রায় তার সব কুকীর্তি ফাঁস হয়ে গেছে শুধু যে ওই একটা পরিবারকে খুন তাই নয়, আরও অনেকেই যারা এতদিন তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পেতো, তার থেকে পালিয়ে লুকিয়ে আত্মগোপন করে ছিল তারাও এখন গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে, মিডিয়ায় লোকও কিভাবে যেন তাদের খোঁজ পেয়ে গেছে, অবশ্য বীরেন বাবু খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন এসবের পিছনে কে, শুধু একবার এখান থেকে বেরোতে পারলেই হলো অভয়কে তিনি শেষ করবেনই দাঁতে দাঁত চেপে নিজের মনেই প্রতিজ্ঞা করেন তিনি, তিনি চারিদিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকাতে থাকেন যেন ভিড়ের মধ্যে কাউকে খুঁজছেন, হটাৎ একজন কনস্টেবলের সাথে চোখাচোখি হয় তার, কনস্টেবলটি ঘাড় ঘুরিয়ে ইশারা করে একদিকে তাকায় বীরেন বাবু সেদিকে তাকিয়ে একজনকে দেখতে পান তারপর পরপর আরো কয়েকজনকে তার ঠোঁটের কোণে একটা মুচকি হাসি দেখা যায় ত র মানে সব ব্যবস্থা কমপ্লিট এখন সুযোগ ও সময়ের অপেক্ষা।
গ্ৰেপ্তারের পরে প্রথমে পুলিশ তাকে ১৪ দিনের হেফাজতে রাখে যদিও তার উপরে কোনোরকম শারীরিক বা মানসিক টর্চার করা হয়নি, তাকে কোনোকিছু জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি যেন সবকিছুই আগে থেকে সাজানো ছিল ,একটা নাটকের উপস্থাপনার জন্য শুরুতে যেমন একটু সময় লাগে সেই সময়টাই হলো ওই ১৪ দিন, জেলে খুব সাধারণভাবেই দিন কাটছিল তার শুধু খাওয়া দাওয়ায় একটু অসুবিধা হচ্ছিল, যদিও এর আগে কয়েকদিন জেলের খাবার খেতে হয়েছিল কিন্তু সেটা বহুবছর আগে তারপর আর তাকে জেলে ঢোকানো তো দূরের কথা তার গায়ে হাত দেওয়ার সাহস হয়নি কারো। তবুও তিনি চুপচাপ সব সহ্য করে দিন কাটাচ্ছিলেন আর একটাই কথা বারবার জপে যাচ্ছিলেন মনে মনে "অভয় তোকে আমি ছাড়বো না"। গার্ড থেকে শুরু করে অন্যান্য কয়েদিরা সবাই তাকে একপ্রকার পাগল বলেই ধরে নিয়েছে, তিনদিন আগে প্রতিদিনের থালায় জেলের খাবারের বদলে একটা টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার এলো একজন কনস্টেবল আর তার সাথে একটা গ্ৰাম্য মহিলা এল খাবারটা নিয়ে, নিজের সেলে তখন একাই ছিলেন তিনি প্রথমে অবাকই হয়েছিলেন বীরেন বাবু কারণ তিনি এটা আশা করেননি খেতে সংকোচ করছিলেন তিনি যদি বিষ মেশানো থাকে, কিন্তু মহিলার "খেয়ে লিন বাবু, আমি অনেক কষ্ট করে বানিয়ে এনেছি" শুনে টিফিন ক্যারিয়ার খুলতে থাকেন, জিজ্ঞেস করেন "তুই কে?আমার জন্য খাবার এনেছিস যে, তোকে তো চিনতে পারছি না?"
আমাকে আপনি চেনেন না বাবু, কিন্তু আমার মরদকে চেনেন হয়তো আপনি ওর অনেক উপকার করেছেন।
কি নাম তোর মরদের?
বাপ্পা বাবু?
ফোনটা রাখার পরেও বীরেন বাবুর রাগ কমে না, তিনি পরপর অনেকগুলো নিউজ চ্যানেল ঘুরিয়ে দেখেন প্রতিটা চ্যানেলেই একই দৃশ্য।
বেশ কয়েকবছর আগে তখন তিনি সদ্য ইলেকশনে দাঁড়িয়েছেন সেইসময় প্রোমোটিংএর জন্য একটা জমি পছন্দ হয় সেই জমিতে একটা পরিবার বাস করতো স্বামী-স্ত্রী, বৃদ্ধ বাবা, বৃদ্ধা মা আর ১২-১৩ বছরের একটা কিশোর, তাদের কাছে জমিটা চেয়েছিলেন কিন্তু তারা অস্বীকার করে পরে তাদের ভয় দেখালে হুমকি দিলে তারা পুলিশের কাছে গিয়ে ডায়রী করে আসে এদিকে সেইসময় তার নামে কোনো খারাপ কিছু রটলে তার পলিটিক্যাল কেরিয়ার ওখানেই ইতি হয়ে যেত তাই তিনি ওই পরিবারের সবাইকে নিজের হাতে খুন করেন কিন্তু বুঝতে পারেন নি সেইখানে উপস্থিত তার দলের একজন লুকোনো ক্যামেরায় পুরো ঘটনাটা রেকর্ড করে যেটার সাহায্যে সে পরে বীরেন বাবুকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করে ফলে তাকেও সরিয়ে দেন তিনি কিন্তু ভিডিওটা উদ্ধার করতে পারেন না, পরে কিভাবে যেন সেটা শিউলীর হাতে আসে যেটা দিয়ে সেও তাকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে শিউলীকেও শেষ করে দিতেন কিন্তু শিউলীর কাছে ভিডিও কিভাবে এলো এটা খোঁজ করতে গিয়ে জানতে পারেন যে লোকটা প্রথম ভিডিওটা রেকর্ড করেছিল সে তার এক বন্ধুর কাছে ভিডিওটা রেখেছিল সেই বন্ধু আবার শিউলীর পরিচিত ছিল ভিডিওটা সেই শিউলীকে দেয়, বীরেন বাবু অনেক চেষ্টা করেও সেই বন্ধুটির খোঁজ পাননি এদিকে শিউলীকে মারলে সে যদি ভিডিওটা ছড়িয়ে দেয়, সেই ভয়ে শিউলীকে মারতে পারেননি উল্টে তাকে এবং তার ভরনপোষণের দায়িত্ব নিতে হয়। সেই ভিডিওটাই এখন ভাইরাল হয়েছে এবং তিনি নিশ্চিত এর পিছনেও অভয়ের হাত, অভয়ই যে শিউলীকে তার কবল থেকে মুক্ত করে নিয়ে গিয়েছিল এটা তিনি জানেন এবং শিউলীই যে অভয়কে ভিডিওটা দিয়ে গিয়েছে এব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ নেই যেটা অভয় এখন সুযোগ বুঝে প্রকাশ করেছে, টিভি বন্ধ করে বীরেন বাবু ফোনটা হাতে তুলে নেন তিনি একটা নাম্বার ডায়াল করেন একটু পরেই ওপার থেকে আওয়াজ আসে "হ্যালো"
হ্যালো চ্যাটার্জী?
বলুন। মিস্টার চ্যাটার্জির কণ্ঠে তাচ্ছিল্য এবং ব্যাঙ্গ।
আমি কেন ফোন করেছি সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।
আপনি কি চান?
আপনার সাহায্য বিনিময়ে আমি আপনাকে..
শুনুন বীরেন ভট্টাচার্য বীরেন বাবুকে থামিয়ে মাঝপথে বলে ওঠেন মিস্টার চ্যাটার্জী, আপনি এখন কাউকে কিছু দেবার অবস্থায় নেই, পুলিশ আপনার পিছনে, এআরসি আপনার পিছনে এখন তো পুরো শহরের লোক আপনার পিছনে পড়বে, আমি আপনাকে সাহায্য করে নিজের জন্য বিপদ ঢেকে আনতে পারবো না আর তাছাড়া হবু সিএমের পক্ষে একজন ক্রিমিনালকে সাহায্য করাটা উচিত হবে না।
হ্যালো, চ্যাটার্জী, হ্যালো.. বীরেন বাবু কিছু বলতে পারেন না তার আগেই মিস্টার চ্যাটার্জী ফোন কেটে দিয়েছেন। বীরেন বাবু বুঝতে পারছেন এখনি তাকে পালাতে হবে নাহলে তিনি বাঁচতে পারবেন না, ধরা পড়ে যাবেন তখনই ড্রাইভারকে ডেকে গাড়ি স্টার্ট দিতে বলেন, যখন তার গাড়িটা ভট্টাচার্য ম্যানসনের গেট ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে তখন বীরেন বাবু খেয়াল করলেন উল্টোদিক থেকে একটা পুলিশের জিপ তার বাড়ির দিকেই আসছে তিনি ড্রাইভারকে দ্রুত গাড়ি চালাতে হুকুম দেন, ড্রাইভার তৎক্ষণাৎ সে হুকুম তামিল করে, এদিকে বীরেন বাবুকে অ্যারেস্ট করতে আসা পুলিশরাও খেয়াল করেছে বীরেন বাবুর গাড়িটা দ্রুত চলে যাচ্ছে তারাও স্পিড বাড়িয়ে পিছনে ধাওয়া করতে থাকে, একজন পুলিশ ওয়াকিটকিতে খবর পাঠিয়ে দেন যে বীরেন ভট্টাচার্য পালানোর চেষ্টা করছেন।
বীরেন বাবু অবশ্য বেশীদূর পালাতে পারেন না একটু পরেই তিনি যেদিকে যাচ্ছেন সেদিক থেকে একটা পুলিশের জিপ এসে তার পথ আটকে দাঁড়ায়, নিজের গাড়িটাকে পিছনে নিতে বলে দেখেন পিছন থেকেও আরেকটা পুলিশের গাড়ি এসে পড়েছে, এবার একটা গাবি থেকে একজন পুলিশ মাইকে বীরেন বাবুকে উদ্দেশ্য করে বলেন স্যারেণ্ডার করতে, কিন্তু বীরেন ভট্টাচার্য যে সহজে স্যারেণ্ডার করবেন না সেটা বুঝতে তাদের একটু দেরি হয়, মাইকের আওয়াজের উত্তরে বীরেন বাবুর গাড়ি থেকে সামনে পুলিশের গাড়ি এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চলতে থাকে, ফলে কয়েকজন পুলিশ গুরুতর আহত হন ,এবং বাকিরা নিজেদের আড়াল করেন এইটুকু সময়ে বীরেন বাবুর ড্রাইভার সামনের পুলিশের গাড়িটাকে কোনোমতে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যায় কিন্তু পিছনের গাড়িটা পিছনে ধাওয়া করতে থাকে এবার বীরেন বাবু পিছনের গাড়িটার উদ্দেশ্যে গুলি চালাতে থাকেন, প্রত্যুত্তরে সেখান থেকেও গুলি চলতে থাকে, বীরেন বাবু হয়তো পালাতে সক্ষম হতেন কিন্তু পারলেন না কারণ ঠিক এইসময় একটা গুলি তার গাড়ির টায়ারে লেগে টায়ার ফেটে যায়, ড্রাইভার কোনোমতে গাড়িটা উল্টে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়, বীরেন বাবু বোঝেন আর উপায় নেই কারণ তার পিস্তলেও গুলি নেই যে তিনি পুলিশের উপরে চালাবেন তিনি গাড়ি থেকে নেমে দুহাত উপরে তুলে স্যারেণ্ডার করেন।
বীরেন ভট্টাচার্যকে মারতে হবে?
ওর কথা শুনে অভয় তো বটেই এমনকি পাশে দাঁড়ানো অমিয় থেকে শুরু করে তাথৈ এবং সরমাদেবী পর্যন্ত অবাক হয়ে যায়।
বৃষ্টি আপাতত একথা থাক।
না অভয়, তুমি হেজিটেট কোরো না, ওই লোকটা আমাকে মারার জন্য লোক পাঠিয়েছিল তার থেকেও বড়ো আমার মাকে মেরেছে এর প্রতিশোধ তো আমি নেবোই, তুমি ওনাকে না মারলে আমি মারবো।
বৃষ্টি আমার কথা শোনো, এখন বাড়ি চলো, এসব কথা পরে ভাবা যাবে তবে তোমাকে এতটা আশ্বস্ত করছি যে উনি ওনার কাজের উপযুক্ত শাস্তি পাবেন আর সেটা খুব তাড়াতাড়ি।
আমি এখনই ওনাকে মারতে চাই। বলে বৃষ্টি চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই অমিয় আর তাথৈ এসে ওকে ধরে, বৃষ্টি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলে: ছাড়ো আমাকে আমি..
বৃষ্টি বৃষ্টি আমার কথা শোনো। অমিয় বৃষ্টিকে নিজের কাছে টেনে ধরে বলে, আপাতত শান্ত হয়ে যাও পরে যদি অভয় কিছু না করে তখন তুমি যা করার কোরো আমি যাবো তোমার সাথে। বৃষ্টি অমিয়র দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে অমিয় ওকে নিজের বুকে টেনে নেয়। গাড়িতে ওঠার সময় অভয় আমিরকে বলে: আমির তুমি ওদের সবাইকে নিয়ে বাড়িতে যাও আমি একটু পরে আসছি
তুমি এখন কোথায় যাচ্ছো। আমির অবাক হয়।
কাজ আছে এসে বলবো।
একা যাবে?
হ্যাঁ, চিন্তা কোরো না আমার কিছু হবে না আর অমিয় তোকেও এখন তোর বাড়ি ফিরতে হবে না তুই বৃষ্টির সাথে থাক।
কিন্তু অভয়।
তোর কোম্পানির এমডিকে আমি ফোন করে দেবো, চিন্তা নেই তোর চাকরী যাবে না, দরকার হলে ওয়ার্ক ফ্রম হোম করবি।
সাবধানে যাও আর তাড়াতাড়ি ফিরো। তাথৈ বলে অভয়কে, উত্তরে অভয় সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে। আমির ওদের নিয়ে চলে যেতেই অভয় একটা ক্যাব বুক করে তাতে উঠে পড়ে ওর গন্তব্য শহরের পুলিশের হেড কোয়ার্টার, সেখানে পুলিশ কমিশনারের অফিস।
ফাঁকা বাড়িতে এখন মাঝে মাঝে সত্যি সত্যিই বীরেন ভট্টাচার্যের ভয় করে, বাড়িটা যেন এক কালান্তক রাক্ষসের মতো তাকে গিলে নিচ্ছে, পুরো বাড়িটায় এখন তিনি একা অবশ্য শুধু বাড়িতেই তার জীবনও এখন একা সবসময়ের ছায়াসঙ্গী যে দুজন ছিল তার ভাই আর জগা তারা গেছে, দিদি গেছে, ভাগ্নে গেছে, স্ত্রী গেছে একটু আগে লোক খবর দিল যারা তাদের র মেয়েকে তাড়া করছিল রাস্তায় তাদের কয়েকজনের লাশ পাওয়া গেছে কিন্তু তার মেয়ের কোনো পাত্তা নেই মেয়েও তাকে ছেড়ে চলে গেছে, আরেকজন খবর দিল তার নিজের অফিস আগুনে পুড়ে গেছে কিছু অবশিষ্ট নেই বেঁচে থেকে কি করবেন তিনি, নিজের পিস্তলটা মাথায় ঠেকিয়েও নামিয়ে নেন তিনি, না এখন মরলে চলবে না তিনি বীরেন ভট্টাচার্য একসময় তার নামে পুরো শহরের লোক ভয়ে কাঁপতো তিনি তার কোনো শত্রুকেই পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখেন নি তাই শেষ শত্রুকেও না মেরে তিনি মরবেন না ,অভয়.. হ্যাঁ অভয় রায় চৌধুরী ওই রুদ্রের ছেলে ওকে না মেরে তিনি মরবেন না যেভাবেই হোক ওকে তিনি মারবেনই ওর জন্যই তার সব গেছে কি কুক্ষণেই যে ওকে হাতে পেয়েও সঙ্গে সঙ্গে না মেরে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন নিজের গালেই চড় মারতে থাকেন বীরেন বাবু, সেই তার থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে এমনকি তার অফিসে আগুন যে এই অভয় লাগিয়েছে এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত, তিনি ঠিক করেন যেভাবেই হোক তিনি অভয়কে শেষ করবেন।
এইসব ভাবছেন এমন সময় তার ফোনটা বেজে উঠলো নাম্বারটা দেখে বুঝলেন পুলিশ ডিপার্টমেন্টের একজন ফোন করেছে
হ্যালো, বীরেন বাবু?
বলছি।
একটা খারাপ খবর আছে স্যার।
বীরেন বাবু ভাবেন তার জীবনে আর কি খারাপ খবর বাকি থাকতে পারে? জিজ্ঞেস করেন: কি খবর?
আপনার নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে, আপনাকে অ্যারেস্ট করার জন্য পুলিশ আপনার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিয়েছে।
হোয়াট?
হ্যাঁ, স্যার।
কিন্তু কেন?
আপনি খবর দেখছেন না?
খবর?
হ্যাঁ, দেখুন।
বীরেন বাবু ড্রয়িংরুমে টিভিটা অন করে একটা নিউজ চ্যানেল চালান এবং যেটা দেখলেন সেটা দেখার পর তার মুখে প্রথমে ভয় তারপর রাগের অভিব্যক্তি প্রকাশ পেলো এবং অবশেষে ঘৃণা, তিনি অনুচ্চস্বরে প্রথমে শিউলী দেবী ও পরে অভয়ের উদ্দেশ্যে অশ্রাব্য গালি দেন।
স্যার আপনি কোথাও গা ঢাকা দিন। ফোনের ওপাশের আওয়াজে চমক ভাঙে।
আসো। অভয় শান্ত স্বরে উত্তর দেয়, মর্গের ভিতরে ঢোকে সবাই সেখানে একজন কর্মী ৎঅভয়কে দেখেই এগিয়ে আসে বলে "এদিকে আসুন স্যার" বলে ওদের একটা ডেডবডির কাছে নিয়ে যায় তারপর বডির মুখের ঢাকাটা খুলে দেয়, বৃষ্টি প্রথমে চমকে ওঠে তারপর নিজের মায়ের মৃতদেহের উপরে কান্নায় ভেঙে পড়ে, অমিয় কিছু বুঝতে না পেরে অভয়ের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই আমির কথা বলে: বীরেন বাবু ওনাকে শ্মশানে গুলি করে ফেলে চলে যান, ওখানের কয়েকজন লোক ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন কিন্তু বাঁচাতে পারেন নি। তারপর যে কর্মীটা ওদের নিয়ে এসেছে তাকে দেখিয়ে বলে ইনি আমাদের পরিচিত উনি চিনতে পেরেছিলেন এটা কে তখনই উনি আমাদের জানান আমরা শেফালী দেবীর বডি রেখে দিতে বলি যাতে বৃষ্টি ম্যাডামকে নিয়ে আসতে পারি।
আমাদের কিভাবে খুঁজলে?
উপায় আছে, অভয় বলে, তোকে তো ফোনও করেছিলাম তুই ধরিসনি তোর ভাগ্য ভালো ওই ক্রসিংটায় আসতে আসতে তোদের দেখতে পেয়েছিলাম যাইহোক আপাতত ওর কাছে যা, ওকে সামলা। বলে অমিয়কে বৃষ্টির কাছে যেতে ইঙ্গিত করে।
সকালে শ্মশানে নিজের মায়ের অন্তিম সংস্কার করে বৃষ্টি সোজা একটু দূরে দাঁড়ানো অভয়ের সামনে এসে দাঁড়ায় ওর মুখে এখন কান্নার বদলে একটা কাঠিন্য এসেছে, এসে সটান বলে: অভয় তুমি আমার একটা কাজ করবে?
কি?
হ্যাঁ, যেতেই হবে, সত্যি মিথ্যা যাই হোক অমিয় এখন বৃষ্টির সাথে আছে আর দুজনের পিছনেই লোক তাড়া করছে।
ঠিক আছে আমিও যাবো তোমার সাথে।
আমিও যাবো। তাথৈ বলে ওঠে।
না, তুমি এখানে থাকবে।
অভয় আমি যাবো, প্লিজ আমাকে নিয়ে চলো।
তাথৈ আমার উপরে ভরসা রাখো।
তাথৈ আর কিছু না বলে চুপ করে যায়।
দুই বন্ধু বেরিয়ে আসে গাড়িতে উঠতে উঠতে অভয় আমিরকে বলে আমির নিকুঞ্জকে ফোন করো।
একটু ফাঁকা রাস্তা পেয়ে অমিয় বাইকের স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছে পিছনে বৃষ্টি দুহাতে ওকে আঁকড়ে ধরে আছে হটাৎ একটা কানফাটানো আওয়াজ আর ওদের মাথার পাশ থেকে কি যেন বেরিয়ে গেল বুঝতে অসুবিধা হলো না যে পিছনে যারা তাড়া করছে এতক্ষণ অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল আসছিল এখন তারা এখন গুলি চালাচ্ছে, পরপর আরও কয়েকটা গুলি চললো কিন্তু বাইরের স্পিডের জন্যই হোক বা সৌভাগ্যের জন্য গুলিগুলো ওদের লাগেনি নাহলে... সামনে একটা সিগন্যাল অমিয় লক্ষ্য করে হলুদ হয়ে আছে এক্ষুনি লাল বাতি জ্বলবে কিন্তু এখন থামলে অবধারিত মৃত্যু সে বাইকের স্পিড আরো কিছুটা বাড়িয়ে দেয়।
বেশ কিছুদূর পর্যন্ত পিছনে কাউকে ওদের তাড়া করতে না দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হয় অমিয় এবং বৃষ্টি দুজনেই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। "তুমি তো আমাকে পছন্দ করো না তাহলে আমাকে বাঁচাতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিলে কেন? বৃষ্টি জিজ্ঞেস করে।
তুমি আমাকে না কোনোদিন বুঝেছো না বুঝবে।
তাহলে বুঝিয়ে দাও।
তুমিও তো আমাকে পছন্দ করো না তাহলে আমার কাছে এলে কেন?
ভেবেছিলাম তুমি জানো তাথৈ কোথায় আছে।
ওহ।
বৃষ্টি আরও জোরে আঁকড়ে ধরে অমিয়কে, বলে: জানিনা কেন যখন ওরা আমাকে তাড়া করছিল তখন যে দুজনের কথা মনে পড়েছে তাদের একজন তাথৈ আর অপরজন তুমি, আমার মা আমাকে বাঁচাতে নিজে..... আমি শেষবারের মতো দেখতেও পেলাম না।
আয়্যাম সরি।
বৃষ্টি অমিয়র পিঠে মাথা রাখে, অমিয় বোঝে বৃষ্টি কাঁদছে সে বাঁধা দেয় না সে একমনে বাইক চালাতে থাকে কিন্তু আর কতদূর, ইসস যদি শুরুতেই অভয়ের বাড়ির দিকে আসার কথাটা মনে পড়তো তাহলে হয়তো এতক্ষণে ওর সাথে দেখাও হয়ে যেত তাড়াহুড়োয় সে বৃষ্টিকে নিয়ে উল্টো দিকে চলে গিয়েছিল তারপর অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরে আসছে, অভয়ও আসছে বললো কিন্তু ও খুঁজে পাবে ওদের? অমিয়র মনে একটু শঙ্কা দেখা দিতেই নিজেই সেটা উড়িয়ে দিল, অভয় যখন বলেছে ও আপছে তখন ও ঠিক খুঁজে নেবে ও ছোটো থেকেই নিজের কথা রাখে।
বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই হটাৎ একটা ক্রসিং পার হবার সময় সাইড থেকে একটা মারুতি এসে ওদের প্রায় ধাক্কা মারছিল কিন্তু অল্পের জন্য অমিয়রা বেঁচে যায়, বাইকটা একটু থামিয়ে পিছনে ঘুরে কিছু বলতে যাচ্ছিল সে কিন্তু পিছন ঘুরতেই তার হৃৎকম্প শুরু হয়ে গেল, যারা তাদের তাড়া করছিল তারা যেভাবেই হোক ওরা ঠিক অমিয়দের খুঁজে পেয়েছে, অমিয় তাড়াতাড়ি সামনে ঘুরে আবার বাইকে স্পিড তোলে সঙ্গে সঙ্গে পিছনের গাড়িটাও ওদের ধাওয়া করে, অমিয়র বাইকের খুব কাছেই চলে এসেছে গাড়িটা ওটার উদ্দেশ্যে বাইকটাকে ধাক্কা মারা, মেরেই দিচ্ছিল কিন্তু মোক্ষম সময়ে একটা গুলির আওয়াজ আর তারসাথে টায়ার ফাটার কানফাটানো আওয়াজ এবং গাড়িটা একদিকে কেদরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো, কৌতূহলবশত ব্যাপারটা কি দেখার জন্য অমিয় বাইক থামিয়ে পিছনে ঘুরে তাকায় দেখে ওদের পিছনে যারা তাড়া করছিল সেটার পিছনে আরেকটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে, অমিয় দেখলো পিছনের গাড়িটা থেকে নেমে এলো অভয় আর আমির এবং যারা ওকে আর বৃষ্টিকে তাড়া করছিল তারা মোট পাঁচজন টায়ার ফাটা গাড়ি ছেড়ে অশ্রাব্য অশ্লীল গালাগালি দিতে দিতে বেরিয়ে আসতেই অভয় আর আমির ওদের দিকে গুলি চালাতে থাকে প্রত্যুত্তরে এরাও গুলি চালাতে থাকে, অমিয় বৃষ্টিকে নিয়ে বাইক ছেড়ে রাস্তার পাশে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে।
দুতরফ থেকেই অনবরত গুলি চলতে থাকে একদিকে আমির আর অভয় গাড়ির দরজার আড়াল থেকে চালাচ্ছে অপরদিকে এই পাঁচজনও তাই, একসময় হটাৎ অভয় নিজের জায়গা ছেড়ে এগিয়ে এলো পিছন থেকে আমির ওকে কভার করছে, আসতে আসতে অভয় দুজনকে আর আমির দুজনকে স্পট ডেড করে দিল বাকি একজন ওর বিরুদ্ধে দুজন পিস্তলধারীকে দেখে নিজের পিস্তল ফেলে মাথার উপর দুটো হাত তুলে স্যারেণ্ডার করলো সাহস পেয়ে অমিয় আর বৃষ্টি বেরিয়ে এল। অভয় জিজ্ঞেস করলো: তোরা ঠিক আছিস?
হ্যাঁ।
অভয়.. তুই মানে আপনি। বৃষ্টি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে তবে সেটা অভয়কে জীবিত দেখে না আগে রেস্টুরেন্টের ঘটনা মনে করে বোঝা যায় না। অভয় এবার স্যারেণ্ডার করা লোকটাকে বলে: তোরা ওদেরতাড়া করছিলি ধরতে পারলে মেরে দিতি এখন তোর সাথে কি করবো? লোকটা চুপ করে থাকে সে বোঝে তাকে জ্যান্ত ছেড়ে দেবে না, অভয় পিস্তল লোকটার কপাল লক্ষ্য করে চালিয়ে দেয়।
বৃষ্টি এবং অমিয়র নিয়ে অভয় আর আমির বাড়ির বদলে একটা হাসপাতালে এসে মর্গের সামনে দাঁড়াতেই বৃষ্টি অবাক হয়ে যায়, অভয় নামতেই সে জিজ্ঞেস করে: এখানে?
বীরেন ভট্টাচার্যের হেড অফিসে আগুন, কিন্তু কেন? কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে অভয়কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্নটা করে আমির ,মাহমুদ আর উসমানকে ওদের বিশ্বাসঘাতকতার চরম শাস্তি দিয়েছে এরপর রকির দেহ যাতে ওর পরিবারের হাতে পৌঁছে যেতে পারে তার ব্যবস্থা করে ফিরে এসে দুই বন্ধু বাগানে বসে নিজেদের পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করছে তখনই অভয় বলে কথাটা যে সে এখন বীরেন ভট্টাচার্যের অফিসে অর্থাৎ যেখান থেকে উনি নিজের সব কাজ কারবার কন্ট্রোল করেন সেখানে আগুন লাগাতে চায়, তারই উত্তরে আমির প্রশ্নটা করে।
দরকার আছে আমির আর আমিও তোমাদের সাথে যাবো।
সে নাহয় আগুন লাগানো গেল কিন্তু হটাৎ ওখানে কেন? মানে কোনো বিশেষ কারণ কি?
হ্যাঁ।
ওহ্ ঠিক আছে কখন করতে হবে?
আজ রাতেই।
ঠিক আছে। আমির উঠতে যায় কিন্তু অভয় বসতে বলে, আমির আবার বসে পড়ে, একটু চুপ করে থেকে অভয় বলতে থাকে: তুমি হয়তো ভাবছো আমি কি পাগলামি শুরু করেছি, কিন্তু ওখানে আগুন লাগাতে চাওয়ার একটা উদ্দেশ্য আছে।
আমির চুপ করে শুনতে থাকে অভয় বলতে থাকে: তুমি হয়তো ভুলে গেছো যে জমিটায় বীরেন ভট্টাচার্য নিজের সমস্ত পাপের কন্ট্রোল রুম বানিয়েছেন সেটা একসময় আমাদের ছিল, আমার বাবা খুব কষ্ট করে ওইটুকু জমি কিনে একটা ছোটো বাড়ি বানিয়েছিলেন, আমাদের কাছে সাক্ষাৎ স্বর্গ ছিল ওটা কিন্তু একরাতে বীরেন ভট্টাচার্য আমাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে আমাদের স্বর্গকে নরকে পরিণত করেছেন, আমার বাবার স্মৃতিধন্য জমি ওটা আমার কাছে পরম পবিত্র কিন্তু বীরেন ভট্টাচার্য ওখানে বসে অজস্র পাপ করেছেন ফলে ওটা অপবিত্র হয়ে গেছে তাই ওটাকে আবার পবিত্র করতে হবে, আগুন দিয়েই ওই জমিকে অপবিত্র করার সূচনা করেছিলেন বীরেন ভট্টাচার্য আর আমি আগুন লাগিয়েই আমি আবার ওই জমিকে পবিত্র করবো।
তুমি চিন্তা কোরো না হয়ে যাবে। অভয়ের কথা শেষ হতেই বলে ওঠে আমির।
আরেকটা কাজ করতে হবে।
কি?
শিউলী দেবীর দেওয়া ব্রহ্মাস্ত্রটা প্রয়োগ করার সময় এসে গেছে।
আমিরের মুখে হাসি দেখা দেয় বলে: তাহলে তো ওনার খেল খতম।
হ্যাঁ, এবার সময় হয়েছে শেষ আঘাতটা করার, রকির মৃত্যুর পর উনি আর চুপ করে থাকবেন না, এখন উনি আমাকে শেষ করার জন্য যা করা সম্ভব তাই করবেন আমার পরিচিত কাছের মানুষদের মারার চেষ্টা করবেন সাথে ক্ষমতা অর্জনের জন্য ভোটে জিতে সিএমের গদিতে বসতে চাইবেন কিন্তু ওনার ইচ্ছা অপূর্ণ রয়ে যাবে, আমি পূরণ হতে দেবো না।
দুই বন্ধু আলোচনা করছে এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে তাথৈ এসে দাঁড়ায় ওকে দেখে দুজনেই একটু অবাক হয় অভয় জিজ্ঞেস করে: কিছু বলবে?
হ্যাঁ, মানে।
কি হয়েছে? কিছু দরকার?
একটা কথা ছিল, কিন্তু বুঝতে পারছি না কিভাবে বলবো?
তুমি কবে থেকে আমাকে কিছু বলার আগে ভাবতে শুরু করলে?
একটু ভেবে তাথৈ বলেই ফেলে "এক্ষুনি বৃষ্টির ফোন এসেছিল"
ও, তা কি বললো?। অভয়ের গলা নিস্পৃহ।
কিসব উল্টোপাল্টা বকছিল, বললো কারা জ্যেঠিমাকে মেরেছে এখন ওকে মারতে চায়।
তো তুমি কি চাও আমি ওর খোঁজ করি?
হ্যাঁ, আমি জানি ও তোমাকে অপমান করেছিল কিন্তু আজ ওর কথাবার্তা কেমন শোনাচ্ছিল তুমি যদি একবার..
এটা তুমি কি বলছো তাথৈ? পিছন থেকে কখন যেন বিদিশা এসে দাঁড়িয়েছে, কথাটাও সেই বললো।
বৌদি বিশ্বাস করো আজ বৃষ্টির আওয়াজ নরমাল ছিল না।
হতে পারে আবার এটাও হতে পারে এটা বীরেন ভট্টাচার্যের নতুন প্ল্যান।
মানে? কথাটা তাথৈকে বেশ অবাক করে বোঝা যায়।
বীরেন ভট্টাচার্য খুব ভালো করেই জানেন যে তোমাদের দুই বোনের পরস্পরের মধ্যে খুব মিল, তাই একজনের বিপদের কথা শুনে অপরজন ঠিক থাকতে পারবে না যেখানেই থাকুক সে আসবেই।
তাতে কি হলো?
তুমি এখনো বুঝতে পারছো না, বীরেন বাবু এখন যেনতেনভাবে রয়কে মারতে চাইবেন আর উনি এটা ভালো করেই জানেন যে রয়কে মারা তো দূর এখন ওর অবধি পৌঁছানো ওনার পক্ষে ইমপসিবল, কিন্তু যদি কোনোভাবে রয়ের কোনো দুর্বলতা হাতে পান তাহলে সহজেই রয়কে পেয়ে যাবেন ঠিক যেমন আগের বার আমিরকে ব্যবহার করেছিলেন।
তাথৈ বুঝলো ব্যাপারটা সে বলে:কিন্তু কেন জানিনা আজ বৃষ্টির গলা অন্যরকম শোনালো, এখন ওর ফোনটাও বন্ধ, বারবার বলছিল ওকে বাঁচাতে। বলে অভয়ের দিকে তাকালো, কভয় বুঝলো তাথৈ কি বলতে চাইছে কিন্তু বিদিশা যেটা বলছে সেটাও যুক্তিযুক্ত আবার যদি সত্যিই বৃষ্টির কোনো বিপদ হয় তাহলে অভয়ের উচিত ওকে বাঁচানো, বিপন্নকে বাঁচানোর শিক্ষাই সে পেয়েছে তার বাবা এবং গুরুর কাছ থেকে।
আমার মনে হয় বিদিশা ঠিক বলছে এটা প্ল্যান হতে পারে। বলে আমির। অভয় উত্তর দেওয়ার আগেই ওর মোবাইলটা বাজতে শুরু করে, ফোনটা রিসিভ করে সে "বল"
ভাই, আই নিড ইওর হেল্প। ফোনের ওপাশ থেকে অমিয়র গলা শোনা যায়।
তোর আবার কি হয়েছে?
বীরেন ভট্টাচার্যের লোকজন বৃষ্টিকে তাড়া করছে, আর আমি ওকে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করছি কিন্তু জানিনা কতক্ষণ পারবো?
তোরা কোথায়?
বাইকে করে পালাচ্ছি, কিন্তু যেখানেই যাচ্ছি যেদিকেই যাচ্ছি ওরা ঠিক খোঁজ পেয়ে যাচ্ছে।
গাঁড়ল কোথাকার, আমার বাড়ির দিকে আয়, আমিও বেরোচ্ছি।
থ্যাংকস ভাই।
তুমি যাবে? ফোন রেখে অভয় বেরোনোর উদ্যোগ করতেই জিজ্ঞেস করে আমির।
বৃষ্টি একে একে সব বলতে থাকে এমনকি ওকে পালাতে বলে মায়ের ওদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার কথাও, অমিয় চুপ করে শুনতে থাকে হটাৎ রাস্তায় একটা বাঁক নেওয়ার সময় বৃষ্টি ওদের পিছনে তাকায় আর তাকাতেই ওর বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তাড়াতাড়ি অমিয়কে বলে "আরো জোরে চালাও ওরা আমাদের পিছু নিয়েছে" অমিয় বাইকের স্পিড বাড়িয়ে দেয় কিন্তু এখন মাঝরাত নয় যে রাস্তা ফাঁকা থাকবে তাই না চাইলেও মাঝে মাঝে ওকে স্পিড কমাতে হচ্ছে। বৃষ্টি ভয়ার্ত গলায় বলে "ওরা আমার পিছনে আছে তুমি এক কাজ করো"। অমিয় বুঝতে পারে বৃষ্টি কি বলতে চাইছে সে বলে "চুপ করে বসে থাকো"। বৃষ্টি আবার বলে "তুমি আমাকে কোথাও নামিয়ে চলে যাও ওরা ধরতে পারলে তোমাকে ছাড়বে না"। অমিয় এবার ধমক দেয় "বললাম তো চুপ করে থাকতে, আমাকে ভাবতে দাও", বৃষ্টি চুপ করে যায় কিন্তু অমিয় একহাতে পকেট থেকে মোবালটা বার করে কাকে যেন ফোন করে তারপর আবার পকেটে রেখে দেয় বৃষ্টি বোঝে অমিয় হেডফোন লাগিয়ে রেখেছে।
আর কিছু করার নেই বৃষ্টির, ওর সব রাস্তা বন্ধ কিন্তু তবুও শেষ চেষ্টা হিসেবে তাথৈকে আরেকবার ফোন করে যদিও ওর মনে আর বেশি আশা নেই, তবুও যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ এইভেবে ফোন করেছে যদি তাথৈএর ফোন চালু হয় এবং তাথৈ ফোন ধরে তাহলে তাথৈর কাছে সাহায্য না চাইলেও অন্তত ক্ষমা চেয়ে নেবে কারণ এইভাবে একা বেশীক্ষণ সে তার ড্যাডির লোকেদের থেকে পালাতে পারবে না ধরা পড়বেই। ফোনটা কানে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে এবার অবশ্য তাথৈএর ফোন চালু হয়েছে কিন্তু রিং হয়ে যাচ্ছে তাথৈ ধরছে না, বৃষ্টি ভাবছে ফোন কেটে দেবে এমন সময় ওপাশ থেকে ভেসে এলো "কি হয়েছে বল"।
হ্যালো, হ্যালো তাথৈ
বল কি হয়েছে?
তাথৈ আমাকে বাঁচা, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।
কারা? কি হয়েছে তোর?
তাথৈ ওরা মাকেও মেরেছে এবার আমার পিছনে ধাওয়া করছে।
কারা? তুই শান্ত হ আগে তারপর বল কি হয়েছে?
হ্যালো হ্যালো। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না বৃষ্টি কারণ ঠিক তখনই ফোনের চার্জ শেষ হয়ে ফোনটা বন্ধ হয়ে গেল, ফোনটা রেখে কিছুক্ষণ দুচোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে বৃষ্টি, তার বন্ধ চোখ দিয়েও জল ঝড়ছে সে জানে আর কোনো উপায় নেই সে একবার চারিদিকে তাকায় অনেক পথচারীদের দেখলেও একটু আগের দেখা নিজের ড্যাডির লোকদের দেখতে পায় না। বৃষ্টি হাঁটতে থাকে কোথায় যাচ্ছে কার কাছে যাচ্ছে কোনো ঠিক নেই ফোন বন্ধ থাকায় তাথৈকে জানাতে পারেনি কোথায় আছে কাজেই ওর থেকে সাহায্য পাওয়ার আশাও নেই, অন্য কারো থেকে ফোন করে লোকেশন দিতে পারে কিন্তু ও আসার আগেই যে ওর ড্যাডির লোকগুলো ওকে ধরে ফেলবে না তার গ্যারান্টি নেই, এদিকে তৃষ্ণায় গলা কাঠ, ক্ষিদেতে পেটে মোচড় দিচ্ছে, একটু এগিয়ে একটা ফাস্টফুডের দোকান দেখতে পেলো বৃষ্টি সেখানে ঢুকে আগে অনেকটা জল খেয়ে তেষ্টা মেটালো, তারপর খাবার খাবে বলে অর্ডার দিতে গিয়ে মনে পড়ে ওর কাছে বেশি ক্যাশ নেই যা ছিল সেটা গাড়ি ভাড়ায় খরচ হয়ে গেছে আর অল্প যা আছে সেটায় এখানে খাওয়া হবে না, অন্য কোনো কমদামি খাবারের দোকান খুঁজতে হবে বেশী ক্যাশ কখনোই সঙ্গে রাখার অভ্যাস নেই, বেশিরভাগ সময় মোবাইল থেকেই পেমেন্ট করে দেয় কিন্তু এখন সে উপায়ও নেই, আরও কিছুটা জল খেয়ে দোকান থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে ও খেয়ালও করে না যে দোকানে ঢোকা ইস্তক একজোড়া চোখ অবাক দৃষ্টিতে ওর কার্যকলাপ লক্ষ্য করছে।
সবে দোকানের বাইরে পা দিয়েছে এমন সময় বৃষ্টি শুনতে পেলো "ওই যে ওখানে ধর ওকে", তাকিয়ে দেখে লোকগুলো ফিরে এসেছে, সে আবার দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড় লাগায় পিছনে লোকগুলো দৌড়াতে থাকে কিন্তু কজন শক্ত সমর্থ জোয়ান লোকের সাথে সে পারবে কেন লোকগুলো ওর অনেক কাছে চলে এসেছে ওকে প্রায় ধরেই ফেলবে এমন সময় বৃষ্টির সামনে এক বাইক এসে থামে আর চালক বলে: তাড়াতাড়ি উঠে এসো। বাইক চালক হেলমেট করে থাকায় প্রথমে চিনতে পারে না বৃষ্টি তাই একটু হকচকিয়ে যায়, চালক আবার বলে "কি হলো উঠে আসো" শুনে তাড়াতাড়ি বাইকের পিছনের সীটে উঠে বসে আর সঙ্গে সঙ্গে বাইক দ্রুত গতিতে বেরিয়ে যায়।
ওই লোকগুলো তোমার পিছনে পড়েছিল কেন? জিজ্ঞেস করে বাইক চালক, কিন্তু বৃষ্টি চুপ করে থাকে তার এখন হতবিহ্বল অবস্থা এই চালক একজন ছেলে এবং সবথেকে বড়ো ব্যাপার একে সে চেনে, মুখ না দেখলেও গলার আওয়াজে চিনেছে, অমিয়... যার সাথে দেখা করার জন্য এতক্ষণ ধরে সে পাগলের মতো ছুটছে কিন্তু সবজায়গায় শোনে সে চলে গেছে কিন্তু ওর সৌভাগ্য ঠিক সময় ওর সামনে চলে এলো। বৃষ্টি পিছন থেকে দুহাতে অমিয়কে আঁকড়ে জড়িয়ে ধরে পিঠে মাথা রাখে কিন্তু চালকের প্রশ্নের উত্তরের বদলে বলে "ওরা কিন্তু এখন তোমারও পিছনে পড়বে"
কিন্তু ওরা কারা? আর বীরেন ভট্টাচার্যের মেয়ের পিছনে পড়েছেই বা কেন? এত সাহস এই শহরে কার?
ওরা বীরেন ভট্টাচার্যেরই লোক।
অবাক হয় অমিয় বলে "তোমার ড্যাডি তোমাকে ধরতে লোক পাঠিয়েছেন কেন?"
অনেক লম্বা ঘটনা।
তুমি আমাকে খুঁজছিলে কেন?
কারণ তোমার কাছে আসতেই আমার মন চেয়েছে তাই, তোমাকে তো ফোনও করেছিলাম তুমি ধরোনি।
হ্যাঁ মিটিংয়ে ছিলাম পরে কাজের চাপে কলব্যাক করতে ভুলে গেছি, এবার বলোতো কি হয়েছে? ও এই নাও এটা খেয়ে নাও আর তারপর হেলমেট পড়ে নাও। কথাটা বলে অমিয় একটা প্যাকেট বৃষ্টির হাতে দেয়।
বৃষ্টি সেটা নিতেই অমিয় আবার বলে: আপাতত এটাই খেয়ে নাও, কি আর করবো বলো তোমার পছন্দের খাবার এইমুহূর্তে আনতে পারলাম না তার জন্য দুঃখিত।
বৃষ্টি বোঝে অমিয় এখনো ওর উপরে রেগে আছে সে চুপ করে প্যাকেট খোলে তাতে একটা রোল আছে, বৃষ্টি চুপচাপ খেতে থাকে, মাঝে একবার জিজ্ঞেস করে: তুমি খেয়েছো?
হুম।
সত্যি বলছো?
তুমি যে দোকান থেকে জল খেলে ওখানেই আমি খাচ্ছিলাম তুমি খেয়াল করোনি।্ও আচ্ছা।
এবার সব খুলে বলোতো।
