যারা সান জু-র "দ্য আর্ট অফ ওয়ার" পড়েছেন, তারা এই কৌশলটি ধরতে পারবেন।
সান জু বলেছেন, যেকোনো যুদ্ধের মূল ভিত্তি হলো প্রতারণা।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রতারণা হলো আমাদের নিজেদের দুর্বলতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা।
আমাদের বারবার "দুর্ঘটনায়" আগুন লাগার ইতিহাসকে কৌশলে আড়াল করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক অপারেশন বা PSYOPS। তারা আমাদের মনে এমন সন্দেহ সৃষ্টি করেছে যে, এগুলো কি পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ, নাকি আমাদের নিজেদের অবহেলা? এই বিভ্রান্তিই হলো আসল আক্রমণ।
সান জু এটাকে বলেছেন "অগ্নি-আক্রমণ"। এটা শুধু আগুন জ্বালানো নয়, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ধ্বংস করা, যেমন আমাদের গুদাম (গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি) এবং সরবরাহ লাইন (এয়ারপোর্ট কার্গো)।
এগুলো কোনো এলোমেলো অগ্নিকাণ্ড নয়; এগুলো শত্রুর অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক সম্পদের উপর নির্দিষ্ট আঘাত।
এর উদ্দেশ্য একটাই: যুদ্ধ ছাড়াই শত্রুকে পরাজিত করা। তারা কোনো সৈন্য পাঠায়নি। তারা কেবল আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড পুড়িয়ে, আতঙ্ক ছড়িয়ে, ভেতর থেকে দেশকে অকার্যকর করে দিচ্ছে। যুদ্ধ ঘোষণার আগেই জয় ছিনিয়ে নিচ্ছে।
এই অপারেশন সফল হচ্ছে কারণ ৫ই আগস্টের পর থেকে ডিজিএফআই, এনএসআই-এর মতো গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে না, বা করতে পারছে না।
মনে হচ্ছে ভেতরে দুটি গ্রুপ সক্রিয়: একটি গ্রুপ জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, আর অন্য গ্রুপ হয়তো এই ধ্বংসযজ্ঞ নিরপেক্ষ করার চেষ্টা করছে।
অন্য কোনো গ্রুপও থাকতে পারে, যারা হয়তো ভিন্ন কারো উদ্দেশ্য পূরণ করছে। এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এভাবে একটি রাষ্ট্র চলতে পারে না।
দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারের শুরুতেই এই সিস্টেমগুলোতে প্রয়োজনীয় "পরিশোধন" অভিযান চালানো উচিত ছিল।
এবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেওয়া যাক:
১. যখন বাংলাদেশ শক্তিশালী হতে চাইছে, যেমন চীন ও ইতালি থেকে যুদ্ধবিমান কেনার ঘোষণা দেয়, তখনই দেশে আগুন লাগা শুরু হয়। (গতদিন এয়ারপোর্টে পোড়া রাসায়নিক পদার্থ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৮ টন গুরুত্বপূর্ণ আমদানিকৃত সরঞ্জাম ছিল।)
যখন বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে প্রতিযোগীদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখনই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে আগুন।
২. যখন বাংলাদেশ ভারতের একচেটিয়া লাভজনক প্রকল্প "মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল" ও মোংলা বন্দরের চুক্তি বাতিল করে, ঠিক তার পরদিনই ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগে।
৩. সম্প্রতি আমেরিকা প্রতিযোগীদের পণ্যের উপর ৫০% শুল্ক আরোপ করে। বাংলাদেশের জন্য ৩৭% শুল্কে আমেরিকায় পণ্য রপ্তানির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশ তাতে রাজি হয়নি।
৪. যখন সামরিক বাহিনীর কিছু খুনির বিচার নিয়ে পুরো দেশ উদ্বিগ্ন, গুম ও খুনের বিচার নিয়ে মানুষ গুরুতর, তখনই আগুন। সামরিক বাহিনী ও আদালতের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা। সামরিক বাহিনী চায় অপরাধীরা তাদের হেফাজতে থাকুক, কিন্তু বিচার বিভাগ চায় আদালতের বিচারের মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশের কারাগারে রাখা হোক। ২২ তারিখে ১৫ জন খুনিকে আদালতে পাঠানোর কথা।
৫. যখন জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে, তখনই আগুন। এখন আর জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। স্বাক্ষর নিয়ে বিতর্কেরও কোনো সমাধান হচ্ছে না। সবাই এখন আগুন নিয়ে ব্যস্ত।
৬. যখন হাসিনার ১৫ বছরের দুঃশাসনের ভয়াবহ ঘটনাগুলো একের পর এক প্রকাশ পাচ্ছে, একের পর এক রায় হচ্ছে, হয়তো ফাঁসির রায় আসবে, তখনই আগুন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এখন বিচার নিয়ে ভাবছে না, ভাবছে আগুন নিয়ে।
একটি ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটানোর সংস্কৃতি এ দেশে নতুন নয়।
তবে যে কোনো মূল্যে এই অগ্নি-সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে। নয়তো দেশ বড় বিপদের মুখে পড়বে!