'স্পেন ১- ০ আর্জেন্টিনা' এই প্রেডিকশন দিয়ে গতকালকে খেলা দেখা শুরু করছিলাম। ফলাফল তাই ই হলো কিন্তু খেলার মধ্যে দিয়ে ইতিহাসের যেমন পুনরাবৃত্তি ঘটলো, ঘটলো বেশ কিছু নতুন ইতিহাসের উত্থান।
স্পেন ২০০৮ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়েই ২০১০ এ বিশ্বকাপ নিয়েছিলো। এবারো তাই হলো। স্পেন আবারো ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েই বিশ্বকাপ জিতে নিলো।
সেবার ও ১০৮ মিনিটে ইনিয়েস্তার একটা গোল থেকে স্পেনে জয় পায়, এবার সেটা ঘটলো ১০৬ মিনিটে ফেরান টোরেসের পা থেকে। সেবার ও স্পেন সেমিফাইনালে দুর্ধর্ষ জার্মানিকে হারায়ে ফাইনালে উঠছিলো এবং নেদারল্যান্ডসের ডার্টি প্লের মুখে পড়েও বিশ্বকাপ জেতা তার থেমে থাকেনি। এবারো একই ঘটনা। সেমিফাইনালে 'কে থামাবে এই ফ্রান্সকে' হারিয়ে, ফাইনালে আর্জেন্টিনার সুপার-ক্লাসিকাল হারামবল ও আলট্রা ফিজিকাল ডিফেন্সিভ ট্যাকটিক্সকে হারায়ে বিশ্বকাপ জিতলো।
আর্জেন্টিনা ২০১৪ সালের মতোই ফাইনাল হারলো। পার্থক্য একটাই, সেবার এটেম্পট ছিলো ১০ টা কিন্তু অন টার্গেট শট শূণ্য। এবার এটেম্পট ৩ টা এবং অন টার্গেট শূণ্য ই। What an ironic repetition!
নতুন ঘটনা কি ঘটলো?
স্পেন একদম সলিড স্ট্রাইকার ছাড়া বিশ্বকাপ জিতে নিলো। বিশ্বকাপের ফাইনালের মতো রুদ্ধশ্বাস ও উত্তেজনাপূর্ন ম্যাচে, আর্জেন্টিনার হারামবলের বিরুদ্ধে একটা কার্ড না খেয়ে ম্যাচ শেষ করলো (১২৫ মিনিট)। স্পেন তাদের ইতিহাসে দুই বার ফাইনালে উঠে, দুই বার ই জিতে নিলো বিশ্বকাপ। লামিন ইয়ামাল প্রথম অনূর্ধ্ব বিশ হিসাবে ইউরো ও বিশ্বকাপ জিতে নিলো। রদ্রি (ট্রায়াঙ্গুলেশন মাস্টার) একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসাবে সব ব্যক্তিগত অর্জন পেয়ে গেলো(জিদান, রোনালদিনহোদের নামের পাশে তার নাম থাকবে যদিও সে ডিফেন্সিভ মিড)।
আর্জেন্টিনা প্রথম দল হিসাবে ফাইনাল ম্যাচ শেষ করলো শূণ্য শট অন টার্গেট দিয়ে। অনেকে এটাকে ফুটবলের ডিসগ্রেস বলতেছেন। আমিও উত্তেজনার বশে বলছি কিন্তু এটা আসলে ডিসগ্রেস না বরং একটা টিমের ফুটবলিং ফিলসফির যে কতোটা ভয়ংকর অভাব সেটার ই রুক্ষ প্রকাশ। হারামবল খেলে একটা দল আর যাই করুক বিশ্বকাপ জিততে পারে না। স্কালোনি অসামান্য চেষ্টা করছে। এই রকম একটা মিডিয়োকর দল উইথ নো ক্রিয়েটিভিটি এন্ড ফরওয়ার্ড মেকানিজম, কে এতদূর টেনে আনা। স্কালোনি এই দলের শক্তির জায়গা যেটা সেটাকেই মবিলাইজ করছে কিন্তু দুর্বল জায়গা গুলোতে কিছু করতে পারে নাই। পারবেও না। কারণ ওটা তার আয়ত্তের বাইরে। সেই জায়গাটার অভাব পূরণ করে আসছে ঐ সাধু লিও। কিন্তু সব সাধনার সমাপ্তি আছে। আছে মার্জিন। ফলে, যা হওয়ার তাই হয়েছে। সামনে কি অস্বাভাবিক সময় আসতেছে আলবিসেলেস্তেদে, সেটা নিয়ে ভাবার সাহস ও করতে চাই না।
অন্যদিকে, দে লা ফুয়েন্তের কথা অল্পশব্দে বিবৃত করা না-মুমকিন। অন্য একদিন, অন্য কোনো সময়ে লিখবো। এটুক বলি, এই লোক নতুন ফুটবল ইন্ট্রুডিউস করাইছে এই স্পেন দলের ফুটবল বিশ্বকাপ জেতানোর মধ্যে দিয়ে। ফুটবলের নিউ-কনভেনশনের আবির্ভাব হইছে। এই কথা যারা ফুটবল নিয়ে সারাবছর পড়ে থাকেন তারা বুঝবেন, যে দে লা ফুয়েন্তে খোদ ফুটবল খেলায় কি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসছে। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে দানবীয় দলকে যেদিন এই লোকের শিষ্যরা চোর-চোর স্টাইলে খেলে বেইজ্জতি করছে, ঐদিন ই বুঝছি এই দলের কাবিলিয়ত কি। সেই সাথে সবচেয়ে হাই প্রেসিং-হারামবল খেলা একটা দল (সাথে চ্যাম্পিয়ন মেন্টালিটি ও ভয়ানক রকমের টাইট শিফ্টের দল) এর সাথে কাম এন্ড কুল হেডে খেলা শেষ করার মধ্যে দিয়ে স্পেন ফুটবলকে আসলে রক্ষা করছে।
একদিকে অতি-আক্রমনাত্মক দানবীয় খেলা এবং আরেকদিকের অতি-রক্ষণাত্মক হারামবল-বেইজড্ খেলার, চাপাচাপি থেকে স্পেন ফুটবলকে রক্ষা করলো এক নতুন উদ্ভাবনী রীতির খেলা ইন্ট্রুডিউস করে। অর্থাৎ, গোলকিপার ও একজন সেন্টার ব্যাক বাদে দলের প্রতিটা খেলোয়াড়ের পজিশন ফলস্। ফ্রিকোয়েন্ট ফলস্ পজিশনিং উইথ ওয়ান টাচ ফুটবলের চেয়ে ভয়াবহ আর কি হতে পারে! সেই সাথে দে লা ফুয়েন্তের শক্ত ট্রেনিং, অর্থাৎ যত কিছুই হয়ে যাক ম্যাচের টেম্পো লুজ করা যাবে না। স্কালোনি সবসময়ই ঐ সুযোগেই থাকতেন। ইংল্যান্ডের সাথে তাই করছে। ৬৫ মিনিট পর, অটোমেটিক বল আর্জেন্টিনার পায়ে যাবেই।
ফুয়েন্তে এই গণিত করেই মাঠে নামছেন। যার প্রমাণ, ম্যাচের প্রথম দশ মিনিটে স্পেন যে মেজাজ ও গতিতে খেলছে, ম্যাচের ১০০ মিনিটেও স্পেন একই মেজাজ ও গতিতে খেলছে। কি সেই মেজাজ? দা বিজিয়েস্ট মিডফিল্ডিং! আর সেখানে মায়েস্ত্রো রদ্রির সাথে কুকুয়েরা, রুইজ/পেদ্রি, পেদ্রো পরো'৷ স্কালোনির যে মেন্টাল চান্স, সেটাও ফুয়েন্তে জাস্ট কেড়ে নিছে। ফলাফল - 'কিংকর্তব্যবিমূঢ় ডিফেন্সিভ আর্জেন্টিনা'।
কথায় আছে একটা বিশ্বকাপ জেতার জন্য দলের এগারো জনের ই সময়ে সময়ে জ্বলে উঠতে হয়। স্পেনের সবাই জ্বলে উঠছিলো। একজন বাদে। সেটা হলো ফেরান টোরেস। আমি সবসময়ই বলতাম যে ওর মডেলিং করা উচিৎ। ফুটবল কেন খেলে সে৷ ফুটবল যায় ই না ওর সাথে। অথচ, স্পেনের উইনিং গোলটা করে ফুটবলের ইতিহাসে সারাজীবনের জন্য নাম লেখায়ে নিলো সে। এখন সে মডেলিং করুক কিংবা খেলা চালু