ঘন ঘন ভূমিকম্প? ⚠️
ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঘন ঘন ভূমিকম্প হওয়াকে কিয়ামতের অন্যতম একটি বড় নিদর্শন এবং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হয়। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর বিস্তারিত আলোচনা নিচে দেওয়া হলো:
১. কিয়ামতের আলামত হিসেবে ভূমিকম্প
রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে বলে গেছেন যে, কিয়ামতের আগে ভূমিকম্পের হার অনেক বেড়ে যাবে।
সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: "আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) কায়িম হবে না, যে পর্যন্ত না ইল্ম উঠিয়ে নেয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে এবং হারজ বৃদ্ধি পাবে। হারজ খুন-খারাবী। তোমাদের ধন-সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, উপচে পড়বে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ১০৩৬)
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, শেষ জামানায় পৃথিবীর ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক অবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে, যার একটি বহিঃপ্রকাশ হলো ঘন ঘন ভূমিকম্প।
২. মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা
কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মানুষের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে পাঠান, যাতে তারা পাপাচার ছেড়ে সত্যের পথে ফিরে আসে।
সতর্ক করা: আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর পূর্ববর্তীগণ কর্তৃক নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করাই আমাকে তা (নিদর্শনাবলী) প্রেরণ করা হতে বিরত রেখেছে। আর আমি শিক্ষাপ্রদ নিদর্শনস্বরূপ সামূদ জাতিকে উষ্ট্রী দিয়েছিলাম, অতঃপর তারা তার উপর যুলম করেছিল। আমি কেবল ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নিদর্শনসমূহ পাঠাই।" (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৫৯)
আগের জাতির শিক্ষা: সূরা আল-আনকাবূতে আল্লাহ বিভিন্ন অবাধ্য জাতির ধ্বংসের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, "অতঃপর এদের প্রত্যেককে নিজ নিজ পাপের কারণে আমি পাকড়াও করেছিলাম; তাদের কারো উপর আমি পাথরকুচির ঝড় পাঠিয়েছি, কাউকে পাকড়াও করেছে বিকট আওয়াজ, কাউকে আবার মাটিতে দাবিয়ে দিয়েছি আর কাউকে পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছি। আল্লাহ এমন নন যে, তাদের উপর যুলম করবেন বরং তারা নিজেরা নিজদের ওপর যুল্ম করত।" (সূরা আল-আনকাবূত, আয়াত: ৪০)
৩. মুমিনের জন্য রহমত ও পাপের কাফফারা
হাদীসে ভূমিকম্পকে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য দুনিয়াতে একটি পরীক্ষা এবং আখেরাতের আজাব লাঘবের মাধ্যম হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
নবীজী (সা.) বলেছেন:
"আমার এ উম্মত দয়াপ্রাপ্ত, পরকালে এদের কোনো শাস্তি হবে না, আর ইহকালে তাদের শাস্তি হলো ফিত্বনাসমূহ, ভূমিকম্প ও যুদ্ধ বিগ্রহ।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৪২৭৮)
অর্থাৎ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাধ্যমে আল্লাহ মুমিনদের গুনাহ ক্ষমা করে দেন অথবা তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। এছাড়া যদি কোনো ঈমানদার ব্যক্তি ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি ধসে মারা যান, তবে তাকে 'শহীদ' হিসেবে গণ্য করা হয়।
আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, পাঁচ প্রকার মৃত শহীদঃ মহামারীতে মৃত, পেটের পীড়ায় মৃত, পানিতে ডুবে মৃত, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত এবং যে আল্লাহর পথে শহীদ হলো। (সহীহ বুখারী: ২৮২৯)।
৪. কিয়ামত দিবসের মহাপ্রলয়
কুরআনে 'যিলযাল' বা ভূমিকম্প নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা রয়েছে। সেখানে কিয়ামত দিবসের ভয়াবহ কম্পনের কথা বলা হয়েছে।
সূরা আয-যিলযাল: "যখন প্রচন্ড কম্পনে যমীন প্রকম্পিত হবে।" (আয়াত: ১)
এটি মূলত নির্দেশ করে যে, বর্তমানে আমরা যে ছোট ছোট কম্পন দেখছি, তা সেই ভয়াবহ মহাপ্রলয়ের একটি আগাম সতর্ক সংকেত মাত্র।
৫. ভূমিকম্পের সময় আমাদের করণীয়
সালাফে সালেহীন বা ইসলামের পূর্বসূরিরা ভূমিকম্প হলে দ্রুত তওবা ও দান-সদকার পরামর্শ দিতেন।
তওবা ও ইস্তিগফার: মহান আল্লাহর কাছে নিজের পাপের জন্য ক্ষমা চাওয়া।
সদকা করা: খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.) ভূমিকম্পের সময় জনগণকে সদকা করার নির্দেশ দিতেন।
দোয়া করা: যদিও ভূমিকম্পের জন্য নির্দিষ্ট কোনো মাসনুন দোয়া নেই, তবে সাধারণ বিপদ-আপদ থেকে মুক্তির দোয়া (যেমন: লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমীন) পড়া যেতে পারে।
সারকথা: ঘন ঘন ভূমিকম্প আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবী চিরস্থায়ী নয় এবং আল্লাহর শক্তির সামনে মানুষ অত্যন্ত অসহায়। এটি আমাদের আত্মশুদ্ধি এবং পরকালের প্রস্তুতির একটি জোরালো তাগিদ।