একটি সত্যি রূপকথার গল্প দিয়ে বিষয়টির অবতারণা করা যাক। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে মোহো ব্র্যাকাটার্স নামে এক প্রজাতির পাখি ছিল। হ্যাঁ, কোনো একসময় ছিল, এখন আর নেই। বাঁশির সুরের মত বিষণ্ণভাবে ডাকে বলে এদের চলতি নাম কোয়াই ও-ও। এই বিরলতম প্রজাতির পাখি কমতে কমতে আটের দশকে গোটা পৃথিবীতে মাত্র দুটি কোয়াই ও-ও বেঁচে থাকে, একটি পুরুষ, আরেকটি নারী।
পরিবেশবিদদের আশা ছিল এই জুটি থেকেই ধীরে ধীরে আবার প্রজাতিটির বংশবৃদ্ধি হবে, বিলুপ্তির দোরগোড়া থেকে ফিরে আসবে প্রাণচঞ্চল প্রকৃতির মাঝে। কিন্তু বিধাতা বোধহয় অলক্ষ্যে ক্রূর হাসি হাসছিলেন। এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা যায় একমাত্র জীবিত নারী পাখিটি। সঙ্গিনীকে হারিয়ে পুরুষ কোয়াই শুধুই ও-ও করে করুন সুরে ডেকে চলে। বৃষ্টির মধ্যে, বাজের শব্দের মধ্যেও তার আকুলি বিকুলি ধ্বনিত হয়েছে এক গাছ থেকে আরেক গাছে। ছড়িয়ে পড়েছে পুনর্মিলনের বিফল আকুতি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাঁশির বিষন্ন সুর হাওয়াই দ্বীপের ঘন জঙ্গলের প্রান্তরে প্রান্তরে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে ফিরে এসেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য কোয়াই ও-ও প্রজাতির শেষ সদস্যটিও একদিন মারা গেলেন সঙ্গিনীকে খুঁজে পাওয়ার নিষ্ফল আশা নিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি, পাখিদের ধ্বনি-সুর-গান নিয়ে একটি অপূর্ব সুন্দর ছবি (সাউন্ড ৩২) বানিয়েছেন আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা স্যাম গ্রিন। প্রজাতির শেষ সদস্যের মৃত্যুর তিন দশক পর এই ছবিতে কান্নার সুর ধ্বনিত হলে প্রেক্ষাগৃহে শ্রোতা দর্শকদের হৃদয়ও যেন দুমড়ে মুচড়ে ওঠে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের এই যুগে প্রতি ঘণ্টায় হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রজাতি। বাংলাদেশের মতো জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ দেশে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এখনই সময় পদক্ষেপ নেওয়ার।
বায়োব্লিটজ এমনই একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যার মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রকৃতির সঠিক তথ্য পেতে পারি - জানতে পারি কী আছে, কী হারাচ্ছি, আর কী রক্ষা করা জরুরি।
প্রথমেই আসি এই বায়োব্লিটজ জিনিসটা মূলত কি।
বায়োব্লিটজ হলো একটি নির্দিষ্ট স্থানে ও একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যত বেশি সম্ভব প্রজাতির সন্ধান, শনাক্তকরণ ও তালিকাভুক্ত করার একটি নিবিড়, সম্মিলিত এবং দ্রুতগতির বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম। একে " বায়োলজিকাল ম্যারাথন"ও বলা চলে। এটির মূল উদ্দেশ্য কোনো এলাকার জীববৈচিত্র্যের একটি তাৎক্ষণিক "স্ন্যাপশট" বা ছবি তুলে ধরা।
এটি কোনো আনুষ্ঠানিক বা শুধু বিশেষজ্ঞদের গবেষণা নয়; বরং এতে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রকৃতিপ্রেমীরা বিশেষজ্ঞদের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করেন। এটি বিজ্ঞানকে জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত করে এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহে সকলের অংশগ্রহণকে বাড়িয়ে তোলে।
বায়োব্লিটজের ইতিহাস:
"বায়োব্লিটজ" শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন মার্কিন ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের প্রকৃতিবিদ সুসান রুডি। ১৯৯৬ সালে ওয়াশিংটন ডি.সি.-র কেনিলওর্থ অ্যাকুয়াটিক গার্ডেনে প্রথম বায়োব্লিটজের আয়োজন করা হয়। স্যাম ড্রোজ এবং ড্যান রডি ছিলেন এর আয়োজনে এবং এতে প্রায় ১,০০০ প্রজাতি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।
প্রথম থেকেই এই কার্যক্রমে সাধারণ মানুষ ও মিডিয়াকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এটিই পরবর্তীতে বায়োব্লিটজের একটি প্রধান দিক হয়ে ওঠে—বিজ্ঞানকে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
১৯৯৮ সালে হার্ভার্ডের জীববিজ্ঞানী ই. ও. উইলসন এবং পিটার অ্যালডেন ওয়ালডেন পন্ডের চারপাশের জীবজগৎ ক্যাটালগ করার জন্য একটি প্রোগ্রাম তৈরি করেছিলেন, যা পরে স্টেটওয়াইড "বায়োডাইভার্সিটি ডেস"-এ রূপ নেয়। এই ধারণাটি বায়োব্লিটজের সাথে খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ।
বায়োব্লিটজের একটি ভিন্নরূপ হলো "ব্লগার ব্লিটজ", যেখানে সবাই এক স্থানে জড়ো হওয়ার বদলে ব্লগাররা তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে জরিপ চালিয়ে তার ফলাফল একটি মানচিত্রে জমা দিত। এর মূল লক্ষ্য ছিল ব্যাপকভাবে সচেতনতা তৈরি করা।
বায়োব্লিটজ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
১. একটি অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের একটি দ্রুত ও মূল্যবান "তথ্যভাণ্ডার" তৈরি করে, যা ভবিষ্যতের গবেষণা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবেশগত নীতি নির্ধারণে সাহায্য করে।
২.বায়োব্লিটজ সাধারণ মানুষকে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি যুক্ত হতে দেয়। এটি বিজ্ঞানকে গণমুখী ও সহজবোধ্য করে তোলে।
৩. মানুষ যখন নিজ হাতে প্রজাপতি, পাখি বা গাছ শনাক্ত করে, তখন তারা প্রকৃতির সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত হয়। এটি জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে।
৪. স্থানীয় মানুষদের তাদের নিজস্ব পরিবেশের সম্পদ সম্পর্কে জানতে এবং তা সংরক্ষণের দায়িত্ব নিতে উৎসাহিত করে।
৫. এটি একটি মজাদার, শিক্ষণীয় এবং সামাজিক অভিজ্ঞতা, যা অংশগ্রহণকারীদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
একটি বাস্তবমুখী ঘটনা দিয়ে ইতি টানতে চাই।